default-image

ভারতীয় ক্রিকেটে এমনটা খুব কম শোনা যায়। অঞ্চলভিত্তিক প্রাধান্যের কথা বলা হয়, পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের ক্রিকেটারদের জাতীয় দলে সুযোগ কম মেলে, এমন অভিযোগও শোনা যেত আগে। তাই বলে কোনো কোচ ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে দলে ক্রিকেটার নিচ্ছেন, এমন অভিযোগ এর আগে মেলেনি।

গত মঙ্গলবার রাজ্য দল উত্তরাখন্ডের কোচের দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছেন ওয়াসিম জাফর। ভারতের হয়ে ৩১ টেস্ট খেলা ও রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক এর পেছনে রাজ্য ক্রিকেটের বোর্ডকে দায়ী করেছিলেন। বলেছিলেন, অযোগ্য ক্রিকেটারদের দলে ঢোকানোর চেষ্টা করছে উত্তরাখন্ড ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (সিএইউ)।

পরদিনই কড়া জবাব দিয়েছে সিএইউ। সংস্থার দাবি, তাদের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে, দলে সাম্প্রদায়িকতা টেনে আনার চেষ্টা ছিল ওয়াসিম জাফরের মধ্যে। এ কথার কড়া জবাবও দিয়েছেন জাফর। এর মধ্যেই অনিল কুম্বলে এ ব্যাপারে সাবেক সতীর্থের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ভারতের সাবেক অধিনায়ক ও কোচ কুম্বলে বলেছেন, জাফর যা করেছেন, ঠিকই করেছেন।

বিজ্ঞাপন
default-image

গত মঙ্গলবার কোচের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া জাফর তাঁর পদত্যাগপত্রে লিখেছিলেন, রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার কর্মকর্তারা প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল অযোগ্য ক্রিকেটারদের দলে নেওয়ার জন্য। এর জবাবে কাল সংস্থার সচিব মাহিম ভার্মা অনেক বড় এক অভিযোগ তুলেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কাছে ভার্মা বলেছিলেন, দলে ইসলাম ধর্মের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন জাফর।

‘গতকাল (মঙ্গলবার) কয়েকজন খেলোয়াড় ও কর্মী আমার কাছে এসেছে। তারা যা বলেছে, সেটা চমকে দেওয়ার মতো। তারা বলেছে, জাফর নাকি সাম্প্রদায়িক আচরণ করছিলেন এবং মুসলমানদের বেশি সুবিধা দিচ্ছিলেন। কিছু খেলোয়াড় বলেছে, তারা দলের স্লোগান হিসেবে “রামভক্ত হনুমানের জয়” এটা বলতে চাইছিল, কিন্তু জাফর অন্য কিছু ঠিক করতে বলেছেন। এরপর আমাকে বলা হলো, দেরাদুনে জৈব সুরক্ষা বলয়ের মধ্যেই নাকি এক মৌলভি এসেছিলেন এবং মাঠে দুবার নামাজ পড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একটা জৈব সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে মৌলভি কীভাবে ঢোকেন? আমি খেলোয়াড়দের বলেছি, আমাকে আগেই এটা জানানো উচিত ছিল। আমি তখনই ব্যবস্থা নিতাম’—ভার্মার অভিযোগ।

এর জবাব দিতে অনলাইনকে বেছে নিয়েছেন জাফর। ভার্মার অভিযোগের কড়া জবাব দিয়েছেন। এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে বলেছেন, ‘তারা বলছে, আমি একজন মৌলভি ডেকে এনেছি এবং মাঠে নামাজ পড়ার আহ্বান জানিয়েছি। প্রথমত, আমি কোনো মৌলভিকে ডেকে পাঠাইনি। ইকবাল আবদুল্লাহ তাঁকে ডেকেছিলেন। শুক্রবারের নামাজের জন্য মৌলভি দরকার হয়। ইকবাল আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় আমি হ্যাঁ বলেছি। অনুশীলন শেষে আমরা ড্রেসিংরুমে নামাজ পড়েছি। এটা দুবার বা তিনবার হয়েছে এবং সেটাও জৈব সুরক্ষা বলয় শুরু হওয়ার আগে।’

দলের ধর্মীয় স্লোগানের ব্যাপারেও পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন জাফর। তাঁর দাবি, এর সঙ্গে ধর্মকে জড়ানোটাই ভুল, ‘আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে, আমি “জয় হনুমান, জয়” বলতে দিইনি। কোনো খেলোয়াড়ই স্লোগান দিত না। আমাদের কিছু খেলোয়াড় আছে, যারা শিখ। আর তারা “রানি মাতা সাচি দরবার কি জয়” বলে অভ্যস্ত। আমি তাই একবার বলেছিলাম, ‘আমাদের “জয় উত্তরাখন্ড” বা “চলো উত্তরাখন্ড” এমন কিছু থাকা উচিত।” আমি যখন বিধর্ভে ছিলাম, ওই দলে “চলো বিধর্ভ” স্লোগান ছিল। আর আমি স্লোগান ঠিক করিনি, এটা খেলোয়াড়দের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। যদি সাম্প্রদায়িক হতাম, তাহলে বলতাম, চল “আল্লাহু আকবার” বলি। যদি ও রকম হতাম, আমি অনুশীলন সকালে দিতাম, যাতে বিকেলে নামাজ পড়তে সমস্যা না হয়।’

গত বছর উত্তরাখণ্ডের দায়িত্ব পেয়েছিলেন জাফর। রাজ্যের বাইরে থেকে তিনজন খেলোয়াড় নিয়েছেন দলে। জয় বিস্ত, ইকবাল আবদুল্লা ও সামাদ ফাল্লাহর মধ্যে আবদুল্লাকে অধিনায়ক হিসেবে দেখা গেছে সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে ধর্ম কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন সিএইউর সচিব ভার্মা, ‘জাফর খুব বেশি নাক গলাচ্ছিলেন। নির্বাচক কমিটির কথাও শুনতেন না। আমাকে এক মিটিংয়ে বলেছিলেন, আপনি ক্রিকেটের কিছু বোঝেন না। তাঁর আচরণগত সমস্যা ছিল। শুধু আমার সঙ্গে নয়, নির্বাচক কমিটির সঙ্গেও ঝামেলা হতো তাঁর। তাঁকে আমরা সব সুবিধা দিয়েছি, কিন্তু তাঁর সব নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল, যা কখনো মানা যায় না।’

বিজ্ঞাপন
default-image

ওদিকে জাফর বলেছেন, তাঁকে নিয়ে যদি সমস্যাই থাকত, তাহলে আগেই ব্যবস্থা নিত ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন। এখন পদত্যাগের পর মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে, ‘আমি পদত্যাগ করার পর এগুলো বলছে। তারা যদি জানতই আমি এসব করছি, তাহলে আমাকে চাকরিচ্যুত করত। আমিই বরং পদত্যাগ করেছি।’

তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ তোলা প্রসঙ্গে প্রায় ২০ হাজার প্রথম শ্রেণির রানের মালিক বলেছেন, ‘যে সাম্প্রদায়িক অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেটা খুবই, খুবই দুঃখজনক। তারা বলেছে, আমি ইকবাল আবদুল্লাকে প্রাধান্য দিয়েছি। আমিই নাকি ইকবাল আবদুল্লাকে অধিনায়ক বানাতে চেয়েছি। কিন্তু এটা ভুল।’ আরেক টুইটে জাফর দাবি করেছেন, জয় বিস্তকে অধিনায়ক বানানোর ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু অ্যাসোসিয়েশন কর্মকর্তারাই ইকবালকে অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

এমন গুরুতর অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের মধ্যে জাফরের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে এসেছেন অনিল কুম্বলে। সাবেক ভারত কোচ টুইটারে লিখেছেন, ‘ওয়াসিম তোমার সঙ্গে আছি। যা করেছ ঠিক করেছ। দুঃখজনক হলো, খেলোয়াড়েরা তোমার অভাব বোধ করবে।’

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন