default-image

ডারবানের সকালে একটি দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো চক্রে আটকা পড়েছে সবাই। এক একজন বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান ড্রেসিংরুমমুখী হচ্ছেন আর মহারাজ আকাশের দিকে মুখ তুলে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন। শুরুটা মুশফিকে, শেষটা তাসকিনে। মাঝে আরও তিন—৫৫ মিনিটে পাঁচ বার উদ্‌যাপনে মেতেছেন মহারাজ।

অথচ চতুর্থ দিন দিনের খেলা শেষেও জয়েই দৃষ্টি ছিল বাংলাদেশের। অন্তত টিম ডিরেক্টর খালেদ মাহমুদ এমনই বলেছিলেন, ‘আমরা এখনো মনে করি, এই টেস্ট জেতা সম্ভব। ব্যাটসম্যান যারা আছে তারাও অনেক ভালো। কাল (আজ) আমাদের ধৈর্য ধরে লম্বা সময় ব্যাট করতে হবে।’

ধৈর্য ধরে লম্বা সময় ব্যাট করার পরিকল্পনা ছিল দলের। কিন্তু পরিকল্পনা তো প্রতিপক্ষেরও থাকে। আর পাগলাটে এক সকালে আজ দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনাররাই সফল। বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ বেশ লম্বা। মেহেদী হাসান মিরাজের মতো অলরাউন্ডার নামেন আটে। ইয়াসির আলী ও লিটন দাসের মতো ব্যাটসম্যানও ছিলেন অপেক্ষায়। কিন্তু বাংলাদেশের মূল ভরসা তো মুশফিকুর রহিম। গত এক যুগ দলকে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, এই টেস্টে তাদের একমাত্র প্রতিনিধি। সেই মুশফিকই প্রতীক হয়ে ছিলেন বাংলাদেশের আশা–ভরসার।

default-image

দিনের পঞ্চম বল সেটা কেড়ে নিল। আগের বলগুলোয় বলে স্পিন করে বাইরে নিয়েছেন মহারাজ। পঞ্চম বলটা ছিল আর্মার, বাড়তি গতিতে সেটা আঘাত হেনেছে প্যাডে। আম্পায়ারিং নিয়ে অনেক কথা হয়েছে চতুর্থ দিনে, মুশফিক শেষ চেষ্টা হিসেবে রিভিউ নিলেন। কিন্তু লাভ হয়নি কোনো, বরং নষ্ট হয়েছে একটি রিভিউ।

এ নিয়ে হতাশা কিংবা হাপিত্যেশ করার সময় কই! কিছুক্ষণের মধ্যেই যে আরেকটি উইকেট নেই! খালেদ মাহমুদ যে ধৈর্য দেখানোর ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন, সেটার চূড়ান্ত ঘাটতি দেখিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরেছেন লিটন দাস। মহারাজের বলে তুলে মারতে চেয়েছিলেন, দোনোমনা করে মারা সে শট মিড অনে থাকা হারমারের হাতে ধরা পড়ল।

পরের ওভারেও মহারাজের আঘাত। এবার মুশফিকের আউটের উল্টো। মিডল স্টাম্পে পড়া বলে ব্যাটসম্যানকে ফরোয়ার্ড ডিফেন্স করতে বাধ্য করেছেন। ইয়াসির ব্যাট-প্যাড এগিয়ে বল আটকানোর চেষ্টাও করেছেন, কিন্তু বাঁহাতি স্পিনারের স্বপ্নের সে ডেলিভারি ইয়াসিরে ব্যাট ঘেঁষে বেরিয়ে ভেঙে দিয়েছে ইয়াসিরের স্টাম্প।

default-image

পঞ্চম দিনে নিজের প্রথম তিন ওভারেই পঞ্চম বলে আঘাত মহারাজের, আর তাতেই বাংলাদেশের স্কোর ২৬/৬। মহারাজের বোলিং ফিগার তখন অবিশ্বাস্য কিছুর অন্য রূপ: ৬-০-১৪-৫! আগের দিনই যে মাহমুদুল হাসান ও মুমিনুল হককে তুলে নিয়ে কাজটা এগিয়ে রেখেছিলেন।

নাজমুল হোসেন প্রতি আক্রমণ করে একটু ভরকে দিতে চেয়েছিলেন প্রতিপক্ষকে। তাঁর দায়িত্ব সাইমন হারমার নিলেন। বল ঝুলিয়ে দিলেন অনেকটা। সেটা ঠিকভাবে খেলতে না পারায় পেছনের পা একটু বেরিয়ে এল, কাইল ভেরেইনার জন্য ওটুকুই যথেষ্ট। স্টাম্প যখন ভাঙল, নাজমুলের পা তখনো লাইন পেরিয়ে নিরাপদ হতে পারেনি। ও হ্যাঁ, এর আগেই মেহেদী হাসান মিরাজের মাধ্যমে বাংলাদেশ সপ্তম উইকেট হারিয়ে ফেলেছে। হারমারের বল স্পিন করবে ভেবে ব্যাট পেতেছিলেন মিরাজ, কিন্তু বল সোজা ছুটে ব্যাটের স্পর্শ নিয়ে স্লিপে চলে গেছে।

default-image

শেষ দিনে ৭ উইকেটে ২৬৩ রান করার লক্ষ্যে নেমে ৩৯ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। টেস্ট জয়ের আশা তখন ড্র-এর পর্যায় পেরিয়ে শুধু হারের ক্ষণ গণনায় রূপ নিয়েছে। খালেদ আহমেদের এসব আনুষ্ঠানিকতা ভালো লাগছিল না, তাই আকাশে বল তুলে বিদায় তাঁর। ১৯তম ওভারের শেষ বলে তাসকিন আনুষ্ঠানিকতা শেষ করলেন ওই মহারাজের বলেই।

দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সব উইকেটই নিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার দুই স্পিনার। একদিকে ৩২ রানে ৭ উইকেট মহারাজের। তাঁর সঙ্গী হারমারের ৩ উইকেট ২১ রানে। ইতিহাসে এমন কিছু আর মাত্র দুবার দেখেছে দক্ষিণ আফ্রিকা, সর্বশেষ ১৯৫০ সালে। তবে সে দুবার দলের পেসাররা অন্তত কিছু ওভার হাত ঘোরানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। আর আজ স্পিনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের এমনই আসা–যাওয়ার মিছিল যে, ডিন এলগারকে বোলার পরিবর্তনের কথা ভাবতেই হয়নি।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

দক্ষিণ আফ্রিকা: ৩৬৭ ও ২০৪

বাংলাদেশ: ২৯৮ ও ১৯ ওভারে ৫৩ (মাহমুদুল ৪, সাদমান ২, নাজমুল ২৬, মুমিনুল ২, মুশফিক ০, লিটন ২, ইয়াসির ৫, মিরাজ ০, তাসকিন ১৪, খালেদ ০, ইবাদত ০*; মহারাজ ৭/৩২, হারমার ৩/২১)।

ফল: বাংলাদেশ ২২০ রানে পরাজিত।

ম্যাচসেরা: কেশব মহারাজ।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন