পঞ্চমবারের মতো আইপিএল জিতেছে মুম্বাই ইন্ডিয়ানস
পঞ্চমবারের মতো আইপিএল জিতেছে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসছবি: আইপিএল

আইপিএলের ইতিহাসে এবারই প্রথম গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি কমপক্ষে ছয়টি করে ম্যাচ জিতেছে। এক আসরে সবচেয়ে বেশি সুপার ওভারও হয়েছে এবার। এক ম্যাচে তো বিজয়ী খুঁজে বের করতে দুবার সুপার ওভার আয়োজন করতে হলো। এসব পরিসংখ্যান দেখে মনে হতেই পারে, খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে বুঝি এবারের আইপিএলে।

কিন্তু মরুর দেশে আট দলের এই লড়াইয়ের মধ্যে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের খেলা দেখে কি একটিবারের জন্যও মনে হয়নি, তারা অন্য সব দলের চেয়ে আলাদা? বাকি সাত দলের খেলা দেখে একটিবারের জন্যও কি মনে হয়েছে, তারা নিয়মিত রোহিত-বুমরাদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ক্রিকেট খেলতে পারে?

উত্তরটা ‘না’–ই হবে। ক্রিকেটীয় শক্তি প্রদর্শনের লড়াইয়ে মুম্বাই এবারও সবাইকে বুঝিয়েছে, টি-টোয়েন্টি ইতিহাসের সফলতম ফ্র্যাঞ্চাইজি দল তাদের এমনি এমনি বলা হয় না। প্রমাণ? টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে একটা দল ভালো করছে কি না, তার প্রায় প্রতিটি মাপকাঠিতে মুম্বাই বাকি দলগুলোর চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে ছিল।

বিজ্ঞাপন
মুম্বাই এবার ছক্কা মেরেছে ১৩৭টি। ছক্কায় দ্বিতীয় সেরা দলের চেয়ে ৩৪টি বেশি।

যেমন গোটা টুর্নামেন্টে মুম্বাই এবার ছক্কা মেরেছে ১৩৭টি। ছক্কায় দ্বিতীয় সেরা দলের চেয়ে ৩৪টি বেশি। সবচেয়ে কম ছক্কা মারা দলটার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। টি-টোয়েন্টি মানেই মারকাটারি খেলা, আর ঝড় তোলা এই খেলায় স্বাভাবিকভাবে ব্যাটিং ভালো হয় ছক্কা বেশি মারলে। সে কাজটা অন্য সবার চেয়ে অনেক ভালোভাবে করেছেন ঈশান কিষান, হার্দিক পান্ডিয়ারা।

মুম্বাই যে এই এক বছরই এত ভালো খেলল, তা কিন্তু নয়। গত আট মৌসুমের মধ্যে পাঁচবারই শিরোপা গেছে তাদের ঘরে। আইপিএলের ইতিহাসে শুধু তিনবার এমন হয়েছে, যখন গ্রুপপর্বে শীর্ষে থাকা দলের হাতেই উঠেছে শিরোপা। তিন উদাহরণের মধ্যে দুটিতেই মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের নাম লেখা। তাদের ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ বোধ হয় এটাই। তাদের ক্রমাগত সাফল্যের পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে—আসুন, একনজরে দেখে নেওয়া যাক।

দুর্দান্ত স্কাউটিং, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা

ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের মূল খেলাটা কিন্তু মাঠের ২০-২০ মোট ৪০ ওভারেই হয় না। হয় নিলামের টেবিলেও। আর সে লড়াইয়ে বহু বছর ধরেই সবাইকে টেক্কা দিয়ে আসছে মুম্বাই। ২০১৩ সালের আগে মুম্বাই একবারও শিরোপা জেতেনি। যদিও শিরোপা–খরা কাটানোর আশায় তারও বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই কাজ করা শুরু করে দিয়েছিল আম্বানি পরিবারের এই দলটা। সেবার দলের কোচ হিসেবে আসেন ভারতের সাবেক কোচ জন রাইট। এক মৌসুম কোচের দায়িত্বে থেকে শিরোপা জেতালেও আসল কাজটা তিনি করছিলেন সবার আড়ালে। যেসব তরুণ প্রতিভাবান ক্রিকেটার আলো ছড়ানোর সুযোগ পাচ্ছিলেন না, তাঁদের বেছে বেছে মুম্বাইয়ের স্কাউটিং নিয়ে আসে এই জন রাইটের নেতৃত্বে। এক মৌসুম পর জন রাইট দলের মূল স্কাউট হয়ে যান।

default-image

এক রোহিত শর্মা ছাড়া তেমন কোনো ভারতীয় ক্রিকেটারের ওপরেই মুম্বাই অত খরচ করেনি, গড়ে তুলেছে তরুণদের। ধীরে ধীরে দলে আসতে থাকেন যশপ্রীত বুমরা, হার্দিক পান্ডিয়া, ক্রুনাল পান্ডিয়া, সূর্যকুমার যাদবের মতো আনকোরা তরুণ। প্রায় অর্ধযুগ পর এখন প্রত্যেকেই মুম্বাইয়ের ‘শিরদাঁড়া’র একেক অংশ। ভারতীয় ক্রিকেটার দলে টানার ক্ষেত্রে স্কাউটদের ওপর ভরসা করা মুম্বাই বরং টাকা ঢেলেছে টি-টোয়েন্টির প্রতিষ্ঠিত পারফরমারদের দিকে—কাইরন পোলার্ড, লাসিথ মালিঙ্গা।

বিজ্ঞাপন

দেশি স্পিনার, বিদেশি পেসার

ভারত কখনোই তেমন দ্রুতগতির পেসার উপহার দিতে পারেনি ক্রিকেট বিশ্বকে। যদিও সাম্প্রতিক কালে বুমরা, মোহাম্মদ শামিরা সে ধারণাকে বদলে দিচ্ছেন ধীরে ধীরে। বরং ভারতের শক্তির জায়গা সব সময়ই ছিল স্পিন। সে কথা মাথায় রেখে কয়েক বছর ধরে দেশীয় স্পিনারদের ওপর ভরসা রেখে যাচ্ছে মুম্বাই। এবারের দলেই যেমন, বৈচিত্র্যময় তিনজন স্পিনার ছিলেন মুম্বাই দলে। রাহুল চাহার লেগ স্পিনার, ক্রুনাল বাঁহাতি অফ স্পিনার, আর ফাইনাল ম্যাচ খেলা জয়ন্ত যাদব ডানহাতি অফ স্পিনার। আর ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে রোহিতও বোলিং আক্রমণে কখনো ক্রুনাল, কখনো রাহুলকে আনতে পারছেন।

পেস বিভাগে মুম্বাইয়ের ভরসার জায়গা বরাবরই বিদেশের তারকারা। শ্রীলঙ্কার মালিঙ্গাকে টি-টোয়েন্টির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম বোলার বলা হলেও অত্যুক্তি করা হবে না। ইনিংসের শেষ ওভারগুলোয় কিপ্টে বোলিং করায় জুড়ি নেই এই মালিঙ্গা-বুমরার। এবার যদিও মালিঙ্গা ছিলেন না, কিন্তু তাতেও ভেঙে পড়েনি মুম্বাইয়ের বোলিং।

default-image

মালিঙ্গার অভাব ভাগাভাগি করে মিটিয়েছেন দুই ডানহাতি অস্ট্রেলীয় তারকা পেসার জেমস প্যাটিনসন ও নাথান কোল্টার-নাইল। বুমরা ‘ডেথ ওভার’গুলো সামলেছেন, ইনিংস শুরুর পাওয়ার প্লেতে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের গলায় ফাঁস পরিয়ে রাখতেন কিউই পেসার ট্রেন্ট বোল্ট। ওদিকে মালিঙ্গা-বুমরার মতো দুই ডানহাতি পেসার থাকার কারণে মুম্বাই বরাবরই বিদেশি বাঁহাতি পেসার কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে বিভিন্ন বছরে দলে এসেছেন বাংলাদেশের মোস্তাফিজুর রহমান, নিউজিল্যান্ডের মিচেল ম্যাকলেনাহান, অস্ট্রেলিয়ার মিচেল জনসন ও জেসন বেরেনডর্ফ। এবার ছিলেন বোল্ট।

ব্যক্তিনির্ভরতা নয়, দলগত প্রচেষ্টা

বোল্টের কথাই ধরুন। এর আগে দিল্লি ক্যাপিটালস কিংবা কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে তেমন সাফল্য দেখাতে না পারা সেই বোল্টই এবার মুম্বাইয়ের আইপিএল জয়ের অন্যতম নায়ক। কেন? কারণ, এর আগে যারাই তাঁকে দলে নিয়েছিল, সবাই তাঁর কাছে সবকিছু চাইত। ইনিংসের শুরু ও শেষে বল করো, ডট বল দাও, রান আটকাও, উইকেট নাও। এত কিছু করতে গিয়ে একটা কাজও ঠিকঠাক করতে পারতেন না বোল্ট।

মুম্বাইয়ে এসে তাঁর ভূমিকাই বদলে গেছে। বুমরা ছিলেন, তাই ডেথ ওভারে রান আটকানোর চিন্তা ছিল না। চাহার, ক্রুনাল, কোল্টার-নাইল কিংবা প্যাটিনসন, ক্ষেত্রবিশেষে হার্দিক, পোলার্ড—সবাই টুকটাক উইকেট নিতে পারেন। বোল্টকে বলাই হয়েছিল শুরুর পাওয়ার প্লেতে সুইংয়ের জাদুতে আক্রমণাত্মক বোলিং করার জন্য। সে কাজটা দুর্দান্তভাবে করেছেন ২৫ উইকেট নিয়ে, এই আসরে পাওয়ার প্লেতে তাঁর চেয়ে বেশি উইকেট আর কেউ পাননি। ওদিকে বুমরা নিয়েছেন ২৭টি। অর্থাৎ চাপ সবাই ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন।

default-image

ব্যাটিংয়েও একই অবস্থা। দলে রোহিত শর্মার মতো ব্যাটসম্যান আছেন বলে বাকিরা গা ছাড়া দিয়ে থাকবেন, তেমনটা হয়নি। বরং এবার রোহিতই নিষ্প্রভ ছিলেন। মিডল অর্ডারে সূর্যকুমার যাদব ও ঈশান কিষানের ব্যাটিং ছিল মুম্বাইয়ের মূল শক্তি। আইপিএলে সর্বোচ্চ রানের তালিকায় যদিও কুইন্টন ডি ককের নাম নেই, কিন্তু তাঁর কাছে দল প্রতি ম্যাচে চাইত একটা বিধ্বংসী সূচনা, যেটা তিনি উইকেট হারানোর ঝুঁকি নিয়েই এনে দিয়েছেন ম্যাচের পর ম্যাচ। যে কারণে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের তালিকায় ডি ককের নাম ওপরে না থাকলেও পাওয়ার প্লেতে সবচেয়ে বেশি রান দক্ষিণ আফ্রিকার এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানই তুলেছেন। রোহিত-ডি ককের পর সূর্যকুমার-ঈশান, শেষ দিকে হার্দিক-পোলার্ড—ব্যাটিংয়ে সবার কাজই ছিল নির্দিষ্ট।

পরিসংখ্যান-নির্ভরতা

এ যুগে জিততে হলে শুধু অনুশীলন নয়, মাথায় রাখতে হয় প্রতিপক্ষের দুর্বলতার বিষয়টাও। আর কীভাবে এই দুর্বলতা বের করা যায়? পরিসংখ্যান! মুম্বাই ইন্ডিয়ানস এই পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করেছে অনেক। ক্রীড়াবিশ্লেষক গৌরব সুন্দররমনের মতে, ‘আমি যখন আমার সাবেক কর্মক্ষেত্র স্পোর্টস মেকানিকসের হয়ে কাজ করতাম, মুম্বাই ইন্ডিয়ানস তখন আমাদের কাছ থেকে সাহায্য নিত। তারা খুবই জটিল ও কৌশলী তথ্যগুলো জানতে চাইত। দলের অধিনায়ক আর তথ্য বিশ্লেষকের মধ্যে ভালো সম্পর্ক থাকাও জরুরি। এটাই মুম্বাইকে সফল করে তুলেছে। তারা অসংখ্য তথ্য, উপাত্ত, পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।’

শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব পর্দার পেছনের মানুষদেরও দিতে হবে। যাঁদের অবদান অনেক সময় খোলা চোখে দেখা যায় না। আইপিএল শুরুর অনেক অনেক আগে আমাদের কাজ শুরু হয়।
রোহিত শর্মা, মুম্বাই ইন্ডিয়ানস অধিনায়ক

মুম্বাইয়ের সাফল্যের পেছনে যে শুধু মাঠের ১১ জন নন, বরং পর্দার পেছনের এসব বিশ্লেষকেরও অবদান রয়েছে, সেটা শিরোপা জয়ের পর দলের অধিনায়ক রোহিত শর্মাও স্বীকার করেছেন, ‘শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব পর্দার পেছনের মানুষদেরও দিতে হবে। যাঁদের অবদান অনেক সময় খোলা চোখে দেখা যায় না। আইপিএল শুরুর অনেক অনেক আগে আমাদের কাজ শুরু হয়। আমরা সব সময় নিজেদের ভুল বের করে সেগুলো শোধরানোর চেষ্টায় থাকি। আমাদের কোন কোন জায়গায় শক্তিশালী হতে হবে, কে কে আমাদের দলে আসলে ভালো করতে পারবে—এসব নিয়ে পরিকল্পনা করি।’

মুম্বাইয়ের কাছ থেকে আইপিএল–মুকুটটা নিতে আগামীবারও তাই কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ কিংবা পাঞ্জাব, রাজস্থানদের অনেক কষ্ট করতে হবে!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0