যে রেকর্ডে ডি ভিলিয়ার্সের পাশে জাভেদ ওমর!

শিরোনামে একটা ‘অন্যায়’ করা হলো। এবং এক দিক দিয়ে দেখলে, এই ‘অন্যায়’-এর শিকার তিনি হয়েছেন পুরো ক্যারিয়ারেই। শিরোনাম হওয়া উচিত ছিল, ‘যে রেকর্ডে জাভেদের পাশে ডি ভিলিয়ার্স’। এমন নয়, জাভেদ ওমরের একটা রেকর্ড গড়ে ডি ভিলিয়ার্সের পাশে বসলেন। বরং গতকাল ডি ভিলিয়ার্স এই রেকর্ডে এত দিন ধরে নিঃসঙ্গ জাভেদের সঙ্গী হলেন।
টেস্ট ক্রিকেটের এত দীর্ঘ ইতিহাসে কমপক্ষে ৩৪০ মিনিট ব্যাটিং করার পরও ফিফটি না-করার ইনিংস ছিল একটিই। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা টেস্টে ৩৪০ মিনিট ব্যাটিং করে ৪৩ করেছিলেন জাভেদ। গতকাল শেষ হওয়া দিল্লি টেস্টে ৩৪৫ মিনিট ব্যাটিং করে ঠিক ৪৩ রানই করলেন ডি ভিলিয়ার্স।
কাল ম্যাচটা বাঁচাতে না-পারলেও ডি ভিলিয়ার্সের সঙ্গী হচ্ছে রাশি রাশি প্রশংসা। কী টেম্পারামেন্ট! নিজেদের কী দুর্দান্তভাবেই বদলে ফেলা! অথচ জাভেদের কপালে খুব বেশি প্রশংসা জোটেনি। অথচ ডি ভিলিয়ার্স না-পারলেও জাভেদ পেরেছিলেন!
৩৪০ মিনিট ধরে ব্যাটিং করেও ফিফটি করতে না-পারাকে ব্যর্থতা হিসেবে ধরতে পারেন, যদি ম্যাচের পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকে। দিল্লি টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার মতোই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সেই ম্যাচে বাংলাদেশের লক্ষ্যও ছিল ম্যাচ বাঁচানো। বাংলাদেশের জন্য কাজটা দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে আরও কঠিনই ছিল। অনেকগুলো কারণে।
সেই টেস্ট ড্র করাতে পারলে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জিতবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ের অভিজ্ঞতাই হয়েছে এর মাত্র কয়েক দিন আগে।
জয় তো দূরের কথা, নিজের চেষ্টায় টেস্ট ম্যাচ ড্র করানোর অভিজ্ঞতাই বাংলাদেশের তখন সেই অর্থে ছিল না। ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের স্নায়ু চাপ ছিল কয়েক গুণ বেশি। বাংলাদেশের টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতাই ছিল মাত্র ৫ বছরের। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বয়সও খুব বেশি নয়।
সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই বাংলাদেশকে পাড়ি দিতে হতো ১৫০ ওভারের মতো দীর্ঘ একটা পথ। সেটিও ম্যাচের চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে—ক্লান্তি শরীরে ভাঙন ধরিয়েছে, ভাঙন ধরেছে উইকেটেও।
ওই পরিস্থিতিতে ২৫৮ বল খেলে ৪৩ করেছিলেন জাভেদ। ওপেনিংয়ে নাফিস ইকবালকে নিয়ে পার করে দিয়েছেন প্রায় ৮৬ ওভার। সময়ের হিসাবে যা কিনা প্রায় পুরো একটা দিনই! সেই টেস্টে অসাধারণ এক সেঞ্চুরি করেছিলেন নাফিস। এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ৫ উইকেট হাতে রেখে বাংলাদেশ যে ম্যাচটি ড্র করতে পেরেছিল, সে জন্য সবাই নাফিসকেই বাহবা দেয়। সেটি তাঁর প্রাপ্যও। কিন্তু একবারও উঠে আসে না জাভেদের নাম!
শুধু কি তাই? সেদিনের অমন দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাটিং করার ‘পুরস্কার’ বাংলাদেশ দল তাঁকে হাতেনাতে দিয়েছিল। পরের ওয়ানডে সিরিজেই তিনি বাদ পড়েছিলেন দল থেকে!
কাল সন্ধ্যায় যখন টেলিফোনে কথা হচ্ছিল জাভেদের সঙ্গে, খসখসে কণ্ঠস্বর, জ্বরে কাবু। তবুও প্রায় ১১ বছর আগের সেই দিনটায় তাঁকে ফিরিয়ে নিতেই যেন রোমাঞ্চের উত্তাপে ঘাম দিয়ে ছুটে গেল জ্বর। ‘কেন মনে থাকবে না ওই ইনিংসের কথা? স্পষ্ট মনে আছে। আজীবন মনে রাখব। দেখেন আমার ক্যারিয়ার হয়তো অতটা গ্ল্যামারাস নয়। কিন্তু তার পরও কিছু কিছু অর্জন তো আছেই। ব্যাট ক্যারি করার রেকর্ডও আমার নাম পাবেন। কিন্তু এটা কিছুই না, আমি সব সময়ই বলি, আমার জীবনের সেরা ইনিংস হচ্ছে ওই ৪৩। প্রথম আলো শিরোনামই করেছিল—আমার সেরা ওই ৪৩। বাসায় এলে দেখতে পাবেন, তা আমি দেয়ালে টানিয়ে রেখেছি।’
কেন সেরা? ক্রিকেটের বিবেচনায় মাত্র দুটো চার মারার ওই ইনিংসটা তো অনেকের কাছে ‘বিচ্ছিরি’ লাগতে পারে। যত যাই বলা হোক, দর্শকদের হাততালি কিন্তু চার-ছক্কাতেই বরাদ্দ। ওই ইনিংস বরং আরও বেশি করে
প্রতিষ্ঠিত করেছে ‘জাভেদ খুব ঠুকঠুক করে খেলে।’
জাভেদ হাসলেন, ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে, চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামার আগে আমাদের টিম মিটিং হয়েছিল। অনেকেই বলছিল, ওভারে তিন করেও লাগে না, আমাদের চেজ করার টার্গেট করা উচিত। আমি হাত তুলেছিলাম, বলেছিলাম, ওটা করতে গেলেই আমরা বিপদে পড়ব। দ্রুত প্রথম কয়েকটা উইকেট পড়ে গেলে আর কিছুতেই এই ম্যাচ বাঁচানো যাবে না। আমরা সিরিজটাই আর জিততে পারব না। চতুর্থ-পঞ্চম দিনে ব্যাটিং করা অত সহজ না।
আমাদের তো টেস্টের পঞ্চম দিনে ব্যাটিং করার অভিজ্ঞতা তখন এক রকম ছিলই না, তার আগেই শেষ হয়ে যেত ম্যাচ। ঘরোয়া ক্রিকেটেও আমরা টেস্টের মেজাজে ব্যাটিং করা শিখিনি। আমি বলেছিলাম, শুরুতে আক্রমণ নয়, বরং সাবধানে খেলতে হবে। সাবধানে খেলা মানে কিন্তু রান না-করা নয়। রান জিনিসটা তখন আপনার কাছে দ্বিতীয় গুরুত্ব পাবে। প্রথম গুরুত্ব পাবে, আমি আউট হব না।'

জিম্বাবুয়ে তখন খর্ব শক্তিরই। কিন্তু বাংলাদেশের কাছে টেস্ট ম্যাচ হারবে, টেস্ট সিরিজ হারবে—এটা তখনো তাদের পক্ষে মানা ছিল কষ্টকর। আরও স্পষ্ট করে বললে, অপমানজনক। জাভেদ বললেন, ‘চট্টগ্রামে বাংলাদেশ জেতার পর টাটেন্ডা টাইবু বলেছিল, “এখন হয়তো বাংলাদেশের পতাকা জিম্বাবুয়ের ওপরে আছে, কিন্তু ঢাকা টেস্টের পর জিম্বাবুয়ের পতাকা আবার ওপরে চলে যাবে। ” ওর কথাটা আমার খুব গায়ে লেগেছিল। খুব জেদ চেপে গিয়েছিল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, এই সিরিজ আমরা জিতবই। জিতবই।’
টাইবু নিজেও দুর্দান্ত খেলেছিলেন। পারলে যেন একাই হারিয়ে দেন বাংলাদেশকে। টাইবুর কথাও হয়তো মনে রেখেছে অনেকে। কিন্তু ভুলে গেছে জাভেদের অবদানের কথা। আশ্চর্য, জাভেদ দাবি করলেন, এ নিয়ে তাঁর মনে কোনো খেদ নেই! এবং এতটাই প্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন, অবিশ্বাস করতেও ইচ্ছে হলো না।
‘আমি জানি বাংলাদেশের দর্শকদের বেশির ভাগই আমার ব্যাটিং পছন্দ করত না। কিন্তু আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, কখনো নিজের জন্য খেলিনি, দলের জন্য খেলেছি। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমরা শুরুতে কী সংগ্রামই না করছিলাম। দ্রুতই আমাদের চার-পাঁচটা উইকেট পড়ে যেত। এর পর শেষের দিকে পাইলটরা যা একটু খেলে মোটামুটি কিছু একটা স্কোর করত। আমি সব সময়ই বিশ্বাস করে এসেছি, টেস্ট ক্রিকেট অন্য এক খেলা।
এখানে আপনি মেরে খেলে ৬০ বলে ৬০ করলে হাততালি পাবেন। পত্রিকায় ছবি ছাপা হবে, কিন্তু দলের লাভ হবে না। টেস্টে রানের চেয়ে বলের খেলা বেশি। এখানে সেশনের হিসাব আছে, প্রতি দিন ৯০ ওভারের হিসাব আছে। ওই ৬০ রানটাই যদি আপনি ১০০ বলে করে দিতে পারেন, তাতে বেশি উপকার।’
তার মানে এমন নয় জাভেদ আক্রমণাত্মক ক্রিকেটেরই বিপক্ষে। কিন্তু তার কথা, দলে এর একটা ভারসাম্য থাকতে হবে। তাঁর সময়কার বাংলাদেশের মূল সমস্যা ছিল, প্রায় বেশির ভাগ ব্যাটসম্যানই ছিলেন আক্রমণাত্মক।
সবাই মেরে খেলতেই ভালোবাসতেন। দ্রুত উইকেট পড়ে গেলে সেই চাপটা সামলানোর ‘আগলি জব’টা করতে হতো জাভেদ-রাজিন সালেহদের। ‘দশর্কদের নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু আমার কষ্ট হয়, যখন ক্রিকেট বোঝে এমন কেউ কেউ আমাকে নিয়ে নেতিবাচক কথা বলে। ঘরোয়া ক্রিকেটে কি আমি মেরে খেলেনি? আমি কি মেরে খেলতে পারতাম না? আমার স্ট্রাইক রেট সে সময়কার বাকিদের তুলনায় কতটা খারাপ? কিন্তু ঢাকা টেস্টের সেই ইনিংসটার কথাই বলি, অনেক হাফ ভলি, অনেক শর্ট পিচ বলও আমি মারিনি। মারলে চার পেতাম, দর্শকের তালি পেতাম। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, চারটা পাওয়ার চেয়ে একটা বল নিরাপদে পার করে দেওয়া বেশি জরুরি।’
ডি ভিলিয়ার্সও ২০১২ সালে অ্যাডিলেডে ম্যাচ বাঁচানোর একটা লড়াইয়ে ২২০ বল খেলে ৩৩ রান করেছিলেন, চার মারেননি একটিও। সেটি জানাতেই জাভেদ বললেন, ‘নিজেকে ডি ভিলিয়ার্সের সঙ্গে তুলনা করব না। কিন্তু দেখুন, তার মতো আক্রমণাত্মক ক্রিকেটারও দলের প্রয়োজনে কী রকম বদলে যায়। দলটাই আসল, নিজের জন্য হাততালিটা দিন শেষে কিছুই না।’
এ কারণেই জাভেদের আক্ষেপ নেই। তিনি জানেন, সবাই সম্রাট শাহজাহানের কথা বলে, কিন্তু তাজমহল বানিয়েছে আসলে নাম না-জানা কত হাজার-লক্ষ শ্রমিক, তাদের শ্রমে-ঘামে। জাভেদ, একজন শিল্পিত-শ্রমিক। কোনো দিন ডি ভিলিয়ার্সের সঙ্গে দেখা হলে এই রেকর্ডের প্রসঙ্গটা তুলবেন না? জাভেদের রসিকতা, ‘পিঠ চাপড়ে দেব। আমি ৩৪০ মিনিট খেলেছি, ও খেলেছে ৩৪৫ মিনিট, ৫ মিনিট বেশি! তবে বলব, শেষ পর্যন্ত তো পারলা না ম্যাচ বাঁচাইতে। টিপস লাগবে? হা হা হা...।’
জাভেদ তাই এখনো হাসতে পারেন তাঁর সেই সব ইনিংসগুলো নিয়েও। জাভেদ তাই এখনো গর্ব করে বলতে পারেন, ৩৪০ মিনিট ধরে খেলে ৪৩ রানই আমার সেরা। কারণ এই ‘৪৩’ এর দিকে তাকালে তিনি ‘৪’ আর ‘৩’ দেখেন না। দেখেন, জিম্বাবুয়ের ওপরেই পতপত করে উড়ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা!