ইনিংসের শেষ ওভার। বোলিংয়ে থাকা চামিন্দা ভাসের মাথায় তখন একটাই চিন্তা, জয়াসুরিয়া-মহানামারা যখন ব্যাট করতে নামবেন, তাঁদের লক্ষ্যটা যেন কোনোভাবেই দুই শ না ছাড়ায়। প্রথম তিন বলে এর মধ্যেই ছয় রান দিয়ে দিয়েছেন ভাস। বাকি আছে তিন বল। ব্যাটসম্যানের হাত পুরোপুরি খোলার আগেই লাগাম পরাতে হবে, হয়তো মনে মনে ভাবছিলেন এই বাঁহাতি পেসার।

উইকেটে থাকা ব্যাটসম্যান নির্বিকার। নিবিষ্ট মনে দুই হাতের গ্লাভস হাতের সঙ্গে আঁটসাঁট করে পরে নিচ্ছেন। শট খেলার ঠিক পরপর হাতের গ্লাভসের বাঁধনটা একটু ঢিলে হয়ে যায়। তখন আবার ব্যাট ধরতে বিড়ম্বনা। শট মারার পরপর তাই এক হাতের তালুতে আরেক হাত দিয়ে ছোট ছোট ঘুষি মেরে গ্লাভস জোড়া তালুর সঙ্গে ফিট করে নেন।

বিজ্ঞাপন

গ্লাভস ফিট করা শেষ, এবার ভাসের অপেক্ষা। ব্যাটসম্যানের মনে হলো, তাঁকে থামানোর জন্য ভাস ইয়র্কার দেবেন। যেই ভাবা, সেই কাজ। একটু নিচু হয়েই স্টান্স নিলেন যেন। যে কাজটা এর আগেও করেছেন একাধিকবার। একটু নিচু থাকলে ইয়র্কার বল পেটাতে সুবিধা। তাই এই বুদ্ধি।

ব্যাটসম্যানের ওই স্টান্স দেখেও কিছু বুঝলেন না ভাস। ইয়র্কারই মারলেন। একদম নিজের থালায় পছন্দের খাবারটি পেলেন যেন ব্যাটসম্যান। সজোরে মারলেন লং অন বাউন্ডারির দিকে। একবার ড্রপ খেয়ে বল চলে গেল সীমানার বাইরে।

শটটার পরেই ক্যামেরা তাক করা হলো প্রোটিয়াদের সাজঘরে। দেখা গেল, মাথা নাড়তে নাড়তে অবিশ্বাসের হাসি হাসছেন শন পোলক।

সতীর্থ, প্রতিপক্ষ থেকে শুরু করে দর্শক—গোটা ক্যারিয়ারে এভাবে কতবার যে ল্যান্স ক্লুজনার সবাইকে অভিভূত করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।

কথা হচ্ছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপ নিয়ে। স্কোরবোর্ডে সেবার কোনো রকমে ২০০ রান তোলা মানেই যথেষ্ট লড়াকু স্কোর। সে লড়াকু সংগ্রহটুকু তুলতেও ঘাম ছুটে যাচ্ছিল প্রোটিয়াদের। গ্রুপপর্বের ম্যাচে মুখোমুখি দক্ষিণ আফ্রিকা-শ্রীলঙ্কা। চামিন্দা ভাস, প্রমোদয়া বিক্রমাসিংহে ও মুত্তিয়া মুরালিধরনের আঁটসাঁট বোলিংয়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা আফ্রিকানদের। একে একে প্যাভিলিয়নের পথে পাড়ি জমিয়েছেন গ্যারি কারস্টেন, হার্শেল গিবস, মার্ক বাউচার, জ্যাক ক্যালিস, ড্যারিল কালিনান, জন্টি রোডস, শন পোলক—প্রত্যেকে। ১১৭ মিনিট মাঠে থেকে ৮২ বল খেলে মন্থরগতির এক ইনিংস খেললেন কালিনান, আউট হলেন ফিফটির এক রান আগে।

এর পরেই শুরু হলো ক্লুজনার-শো। সেই ‘শো’ দেখে জয়াসুরিয়া-মহানামারা এতটাই অভিভূত হলেন, পরে ব্যাট করতে নেমে নিজেরাই রান করা ভুলে গেলেন। উল্টো বোলিং করতে নেমে শ্রীলঙ্কার লেজটুকু গুটিয়ে দিলেন সেই ক্লুজনারই। সতীর্থদের প্রিয় ‘জুলু’।

বিজ্ঞাপন

ক্রিকেটারদের কতই-না নেশা থাকে। কারওর উইকেট আঁকড়ে পড়ে থাকার নেশা, কারওর দিগ্‌বিদিক জ্ঞানহীন হয়ে ছক্কা মারার নেশা, কারওর ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় বল ফেলে যাওয়ার নেশা। শেষ বলে চার-ছক্কা মেরে ম্যাচ জেতানোর নেশা থাকে কজনের?

ক্লুজনারের ছিল। টি-টোয়েন্টির আনুষ্ঠানিক আবির্ভাবের প্রায় এক দশক আগেই যিনি দুনিয়াকে দেখিয়েছিলেন, স্লগ ওভারে ধ্বংসলীলা কীভাবে চালাতে হয়। শেষ বলে সিঙ্গেল লাগবে দলের জেতার জন্য? নাকি লাগবে বাউন্ডারি বা ওভার বাউন্ডারি? ক্লুজনার সেই মুহূর্তে থাকতে চাইবেন ক্রিজে। জয়ের মুহূর্তকে আলিঙ্গন করতে চাইবেন সশরীরে। শেষ মুহূর্তে দলকে জেতানোই যেন ‘ড্রাগ’ ছিল তাঁর কাছে। দুনিয়ার সব ব্যাটসম্যান যেখানে ফিফটি-সেঞ্চুরির লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামেন, ক্লুজনারের লক্ষ্য ছিল ঝোড়ো ইনিংস খেলা। সেটা ৫ বলে ১৫ হোক বা ১৫ বলে ৩০। দলকে জেতানো ১৫ বলে ওই ৩০ রানই ছিল তাঁর কাছে সেঞ্চুরির সমান। একজন আদর্শ স্লগারের মনোভাব তো এমনই হওয়া উচিত!

শেষ ওভারে দলকে ম্যাচ জেতানো ছাড়া তেমন কিছুই তার মাথায় কখনো ঘোরাফেরা করত না। স্লগ ওভারগুলোয় যেসব বোলার বল করতে আসতেন, মনে মনে তাদের ‘শত্রু’ ভেবে নিতেন। ‘হয় তুমি জিতবে, নয় আমি!’ যত ভালো বোলারই হোক না কেন, ওভারে ছয়টা বলই ভালো কে করতে পারত তখন ওই চাপের মুহূর্তে? চাপের মুহূর্তে শতভাগ সময় মাথা ঠান্ডা রেখে ঠিক জায়গায় সব সময় বল ফেলা তো চাট্টিখানি কথা নয়!

আর সেই সুযোগটাই নিতেন ক্লুজনার। ওভারে দুটো বলও যদি খারাপ হয়, ওই দুই বলে দুই ছক্কা মারলেও বারো রান, ক্লুজনারের সোজাসাপ্টা হিসাব।

নেপিয়ারে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটার কথাই ধরুন। বোলিংয়ে নিউজিল্যান্ডের মূল পেসার ডিওন ন্যাশ। শেষ বলে দরকার চার রান। আশপাশে দেখে নিলেন ফিল্ডারদের অবস্থান, বল ব্যাটে আসার সঙ্গে সঙ্গে সপাটে হাঁকালেন শট। ম্যাচে তাঁর একমাত্র ছক্কাই হয়ে থাকল জয়সূচক শট!

এভাবেই ক্লুজনার যুগে যুগে অনুপ্রাণিত করে গেছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি, হার্দিক পান্ডিয়া, ক্রিস মরিস, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, মোহাম্মদ নবীদের। ভেবে দেখুন, ক্লুজনারের আমলে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের যুগ থাকলে কী করতেন তিনি!

ক্লুজনারকে নিয়ে এক শ জনকে জিজ্ঞেস করলে শতকরা নিরানব্বই জন প্রসঙ্গ টানবেন ১৯৯৯ বিশ্বকাপের ওই ম্যাচটা নিয়ে। ওই ম্যাচের প্রসঙ্গ বরং আজ তোলা থাক। স্লগ ওভারে ব্যাটিং করাকে যে মানুষ আধুনিক করেছেন, ম্যাচ জিততে চাওয়া হাজারো লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদের যে মানুষ পথ প্রদর্শক, সে মানুষের জন্মদিনে কেন ওই ঘটনা বারবার আলোচিত হবে যেটা তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ?
শুভ জন্মদিন, জুলু!

বিজ্ঞাপন
ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন