নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার সিরিজেই সাকিব সিরিজসেরা।
নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার সিরিজেই সাকিব সিরিজসেরা।ছবি: শামসুল হক

এক সাকিব আল হাসানেরই কত রূপ!

কখনো আইসিসির নিয়ম ভেঙে বহিষ্কৃত হয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘ব্যাড বয়।’ কখনো দর্শককে ব্যাট উঁচিয়ে সমালোচিত। আবার কখনো করোনার নিয়ম ভেঙে কালীপূজা উদ্বোধন করতে গিয়ে নেতিবাচক খবরের শিরোনাম।

এই সাকিবই আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘পোস্টার বয়’ বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হয়ে। তাঁর জন্য ভক্ত–সমর্থক হৃদয়ের আবেগ–ভালোবাসা উছলে পড়ে মাঠের অনবদ্য পারফরম্যান্সের সৌজন্যে। তাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ মনে হয় বাংলাদেশ দলটাকেই।

আইসিসির নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে এক বছরের বেশি সময় পর মাঠে ফিরে সাকিব যেন কিছুই হারাননি! তিনি টিকে আছেন তাঁর পারফরম্যান্সে, তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসায় এবং সমালোচনায়ও।

বিজ্ঞাপন

সাকিবের এবারের মাঠে ফেরা নিয়ে একটু খচখচানি, একটু অনিশ্চয়তা তো ছিলই। খেলা, অনুশীলন থেকে এত দিন দূরে। কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে!

default-image

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার আগে একটি ঘরোয়া টুর্নামেন্টে খেলেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু টি–টোয়েন্টি কাপে সাকিব যেন নিজেকে হারিয়ে খুঁজলেন! না ব্যাটে, না বলে হয়ে উঠতে পারলেন সত্যিকারের সাকিব আল হাসান। যেন আর দশজন সাধারণ খেলোয়াড়ের মতো। মাঠে না থাকার দীর্ঘদিনের অনভ্যস্ততায় কুঁকড়ে যাওয়া এক ক্রিকেটার।

জনমনে সাকিব সম্পর্কে যখন এমনই ভাবনা বিস্তার করতে থাকল, সাকিব বললেন অন্য কথা। বঙ্গবন্ধু টি–টোয়েন্টি কাপে ভালো খেলেননি বলেই সব শেষ হয়ে যায়নি। আবার এই টুর্নামেন্টে খুব ভালো খেললেও যে সপ্তম আকাশে উঠে যেতেন, তা নয়। এই টুর্নামেন্টে খেলাটা তাঁর কাছে ছিল মাঠে থাকার অভ্যস্ততা ফিরিয়ে আনার একটা সুযোগ। সাকিব খুব স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো খেলা নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের জন্য কিছু করাটাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এটা ঠিক যে করোনাকালে খেলা–অনুশীলনের বাইরে ছিলেন সবাই–ই। তবে এ–ও তো অস্বীকার করার উপায় নেই, ওই সময় ‘নিষিদ্ধ’ সাকিব মানসিকভাবেও ছিলেন খেলা থেকে দূরে। চাইলেও তাঁর পক্ষে তখন মাঠের চৌহদ্দিতে ঢোকা সম্ভব ছিল না।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কাল শেষ হওয়া তিন ওয়ানডের সিরিজে সেটিই তো করে দেখালেন সাকিব! যেন এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। প্রথম ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়ে শুরু, তিন ওয়ানডের সিরিজ শেষ করলেন ম্যান অব দ্য সিরিজ হয়ে।

বলতে পারেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজের এমন দুর্বল দলের বিপক্ষে বাঘ হয়ে ওঠায় আর এমন কী কৃতিত্ব! কথাটা ভুল নয়। ওয়ানডে সিরিজে খেলা জেসন মোহাম্মদের এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ এতটাই অনভিজ্ঞ আর দুর্বল যে প্রেসবক্সের আড্ডায় ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের দলের সঙ্গে পর্যন্ত তাদের তুলনা হয়েছে। এই সিরিজেই অভিষেক হয়েছে তাদের ছয় ক্রিকেটারের। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাস্তবতা মাথায় রাখলে কোনো প্রতিপক্ষই আসলে সহজ নয়। আর সাকিব তো এই পর্যায়ের ক্রিকেট থেকে দূরেই সরে গিয়েছিলেন লম্বা সময়ের জন্য।

এটা ঠিক যে করোনাকালে খেলা–অনুশীলনের বাইরে ছিলেন সবাই–ই। তবে এ–ও তো অস্বীকার করার উপায় নেই, ওই সময় ‘নিষিদ্ধ’ সাকিব মানসিকভাবেও ছিলেন খেলা থেকে দূরে। চাইলেও তাঁর পক্ষে তখন মাঠের চৌহদ্দিতে ঢোকা সম্ভব ছিল না। খেলা হলেই সম্ভব ছিল না খেলতে নামা। নিষিদ্ধ অবস্থায় সাকিব একবার বলেছিলেনও, ‘এখন খেলা হলেও আমি খেলত পারব না। এই কষ্টটাই বেশি।’

সেই সাকিব যখন ফিরলেন, ফিরলেন রাজার মতো। প্রথম সুযোগেই দেখালেন কেন তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা, কেন বিশ্বসেরা।

বিজ্ঞাপন

প্রথম ম্যাচে মাত্র ৮ রানে ৪ উইকেট—সাকিবের বাঁহাতি স্পিন–বিষেই নীল হয়ে ১২২ রানে অলআউট ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে অফ স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেও সাকিব থেমে থাকেননি। ৩০ রানে ২ উইকেটের সঙ্গে অপরাজিত ৪৩ রান করে দলকে জিতিয়েই ছাড়েন মাঠ। আর শেষ ম্যাচে তো অধরা ফিফটিটিও করে ফেললেন! ইনিংসটিকে আরও লম্বা করে তিন অঙ্কে নিয়ে গেলে সোনায় সোহাগা হতো। কিন্তু ভুল শট খেলতে গিয়ে আউট হয়ে এবং শেষ পর্যন্ত চোটে পড়ে সাকিব হয়তো দেখালেন, তিনিও মানুষ।

default-image

আর মানুষ বলেই সমালোচনাও ঘিরে থাকে তাঁকে। এই যে সিরিজ শুরুর আগে এবং প্রথম ওয়ানডে শেষেও বলে দিলেন, ঘরোয়া ক্রিকেট তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়; সাকিবের এই কথা অনেককেই আহত করেছে। সিরিজ চলছিল বলে এ নিয়ে তাঁর সমালোচনা হয়তো বেশি দূর গড়ায়নি, কিন্তু আড়ালে–আবডালে তির্যক মন্তব্য যে হয়নি, তা তো নয়!

তৃতীয় সন্তানের আগমনের সময়ে বলে আসন্ন নিউজিল্যান্ড সফর থেকে হয়তো ছুটি চাইবেন সাকিব, হয়তো এরই মধ্যে ছুটি চেয়েও ফেলেছেন। একজন স্বামী হিসেবে, একজন বাবা হিসেবে খুবই স্বাভাবিক চাওয়া। তবু এই খবরও যখন সংবাদমাধ্যমে এল, অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেননি।

এ নিয়ে সমালোচনার ছিপি এখনো খোলেনি সিদ্ধান্তটা বিসিবি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি বলে। কাল ম্যাচ শেষের প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রসঙ্গটা তোলা হলে সাকিব নিজেও যেন একটু বিব্রত হলেন। এ রকম একটা আলোচনা সিরিজের মাঝপথে ছড়িয়ে পড়লে কী হতে পারে, সেটি তো আর তাঁর অজানা নয়।

default-image

করোনার মধ্যে লম্বা সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়ে দেশে ফেরার পরপরই কিছু বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন সাকিব। ফেরার পরদিনই গেলেন এক সুপারস্টোর উদ্বোধন করতে। এরপর কলকাতায় গিয়ে উদ্বোধন করলেন কালীপূজা। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় দুটোর কোনোটিই হয়তো সাকিব ঠিক করেননি। তাঁকে নিয়ে আলোচনা–সমালোচনাও তাই স্বাভাবিকই ছিল তখন। একই সঙ্গে স্বাভাবিক ছিল সাকিবের কাছে একটা প্রত্যাশা—মাঠে ফিরেই দেখাবেন জাদু।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রত্যাবর্তন ওয়ানডে সিরিজে সেটা সাকিব দেখালেনও। ব্যাট–বল হাতে ঠিক যেন সেই সাকিব, যাঁর অপেক্ষায় ছিল বাংলাদেশ! সিরিজের আগে সাকিবও জানতেন, অনেকের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ‘ব্যাড বয়’ হলেও মাঠে তাঁকে ‘পোস্টার বয়’ হিসেবেই দেখতে চাইবে সবাই। জানতেন বলেই বলেছিলেন, ‘আমাকে তো মানুষ সময় দিবে না…।’

সাকিব সময় নেনওনি। এক সিরিজেই ফিরে পেলেন সব। ফিরে পেলেন হারানো সাম্রাজ্য।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন