ওমানের বিপক্ষে আজকের দিনে সেঞ্চুরি করেছেন তামিম।
ওমানের বিপক্ষে আজকের দিনে সেঞ্চুরি করেছেন তামিম। ছবি: আইসিসি

‘আমি রেকর্ডগুলোকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, যে-ই ভাঙুক, তার যেন খুব কষ্ট করতে হয়’—কথাটা তামিম ইকবাল বলেছিলেন ২০১৬ সালের আজকের এই দিনে। ভারতের ধর্মশালায় ওমানের বিপক্ষে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সেঞ্চুরির পর। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সেটি এখনো কোনো বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানের প্রথম ও শেষ সেঞ্চুরি।

তামিম যা চেয়েছেন, তা–ই হচ্ছে। চেয়েছিলেন সতীর্থদের জন্য রেকর্ড ভাঙার কাজটা কঠিন করে তুলতে। এখন পর্যন্ত তামিমকে সফল বলতেই হয়। বাংলাদেশ ২০১৬ বিশ্বকাপে ওমানের বিপক্ষে সেই ম্যাচের পর ৩৮টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছে। তামিমের সেই ১০৩ রানের ইনিংস এখনো কেউই ছাড়িয়ে যেতে পারেননি।

কাছাকাছিও যেতে পারেননি কেউ। তামিমের সেই ইনিংসের পর টি-টোয়েন্টিতে কোনো বাংলাদেশির ৮০ রানের বেশি ইনিংস একটাই—২০১৯ সালে ভারতের বিপক্ষে মোহাম্মদ নাঈম ৮১।

বিজ্ঞাপন

সেই টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরি আবার তামিমকে তিন সংস্করণ মিলিয়ে ১১তম ক্রিকেটার হিসেবে সেঞ্চুরির মালিক বানায়। পাঁচ বছর হয় গেল। সংখ্যাটা এখন বেড়ে মাত্র ১৬-তে এসে ঠেকেছে। তিন সংস্করণের ক্রিকেটে সেঞ্চুরি যে চাট্টিখানি কথা না, এই রেকর্ডই তাঁর প্রমাণ।

default-image

তবে তামিমের প্রথম সেঞ্চুরি শুধু রেকর্ড সমৃদ্ধ করার ইনিংস নয়; সমৃদ্ধ করেছে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি মানসিকতা ও বিশ্বাসকে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের শুরুতে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। তখন বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল এলোপাতাড়ি। খেলাটা ২০ ওভারের বলেই প্রতি বলে মেরে খেলতে হবে, এটাই ছিল টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশি মানসিকতা। টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংও যে ছকে আঁকা পরিকল্পনায় সাজানো সম্ভব, তা যেন বাংলাদেশ ক্রিকেট জানতই না!

২০০৭-০৮–এর দিকে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং নিয়ে কিছুদিন আগে প্রথম আলোর সাক্ষাৎকারে তামিম বলেছিলেন, ‘আমরা অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে ফেলি ২০ ওভারের কথা চিন্তা করে। ২০০৮-০৯–এর দিকে এটা বুঝতাম না। তাড়াহুড়ো করে গিয়ে অনেকবার ৮০, ৯০, ১০০, ১১০ রানে আউট হয়েছি।’

বাংলাদেশ যত বেশি টি-টোয়েন্টি খেলেছে, ততই এই মারদাঙ্গা ব্যাটিংয়ের ধারণা বদলেছে। ১২০ বলের খেলাতেও যে ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ মেনে সফল হওয়া সম্ভব, সেটি বুঝতে সময় লেগেছে বাংলাদেশের। আর তামিমের সেই ১০৩ রানের ইনিংসটিই বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি পরীক্ষার প্রথম ধাপ পার করার উদাহরণ। অতীতের তাড়াহুড়ো থেকে আজকের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের স্থিতিশীলতার সঙ্গে সেতু গড়ে দিয়েছে তামিমের ওই সেঞ্চুরিই।

default-image

তরুণ বাংলাদেশি টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরা এখন জানেন, ৫০ থেকে ৬০ বল খেলতে পারলে টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি সম্ভব। পাওয়ার প্লের সফল ব্যবহারের পর মাঝের ওভারে স্ট্রাইক রেট নামতে না দিলেই হলো। আর শেষের দিকে উইকেটে থিতু ব্যাটসম্যান হিসেবে থাকতে পারলে দ্রুত রানের সীমানাটা তো আকাশছোঁয়া।

২০১৬ সালের আজকের এই দিনে তামিম বাংলাদেশ ক্রিকেটকে টি-টোয়েন্টি ইনিংস গড়ায় এই ‘নকশা’ই উপহার দিয়েছিলেন। একজন এক প্রান্ত আগলে রেখে খেলে যাবেন ইনিংসের সিংহভাগ ওভার, বাকিরা অন্যপ্রান্ত থেকে খেলবেন আগ্রাসী মেজাজের ক্রিকেট। দিন শেষে দলের রান অন্তত ১৮০ ছাড়াতে বাধ্য।

বিজ্ঞাপন

সেদিন যেমন ৩৫ বলে করেছেন প্রথম ফিফটি। ৭টি চার ও ১টি ছক্কা ছিল তামিমের প্রথম ফিফটিতে। পরের ফিফটি এসেছে আরও দ্রুত। ২৫ বলে পরের ফিফটি করেছেন ৩টি চার ও ৪টি ছক্কায়। টি-টোয়েন্টি ইনিংস গড়ার এই তত্ত্ব গত কয়েক বছরে ক্রিকেটারদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ২০১৬ সালে কিন্তু এমনটা ছিল না।

তখন শুধু ক্রিস গেইল বা ব্রেন্ডন ম্যাককালামরাই চার-ছক্কার বৃষ্টি নামিয়ে টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরি করতেন। কিন্তু তামিম, মাহেলা জয়াবর্ধনে, সুরেশ রায়নারা দেখিয়েছেন, গেইলদের মতো বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান না হয়েও টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি করা সম্ভব।

সামনে আবার সেই ভারতেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। পাঁচ বছর আগে তামিমের সেঞ্চুরি বাংলাদেশি টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংকে একটা পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এবারও নিশ্চয়ই তামিম বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ওপেনার থাকবেন। নিশ্চয়ই এবারও বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটাকে বাকিদের থেকে আরেকটু দূরে নিয়ে রাখতে চাইবেন, যেন বাকিদের রেকর্ড ভাঙতে কষ্ট হয়।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন