মেহেদী হাসান মিরাজ দারুণ সেঞ্চুরি করেছেন আজ চট্টগ্রামে।
মেহেদী হাসান মিরাজ দারুণ সেঞ্চুরি করেছেন আজ চট্টগ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

ক্রিকেটাররা মাঠে নিজেদের উজাড় করে দেন দলের জন্য। কিন্তু মাঠে যখন খেলেন ক্রিকেটাররা, ওদিকে মাঠে না থেকেও একাগ্রতায় তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দেন পরিবারের সদস্যরা। ভিআইপি গ্যালারিতে হোক কিংবা টিভি পর্দার সামনে, প্রিয় মানুষের জন্য প্রার্থনায় বসেন তাঁরা।

জাতীয় পর্যায়ে খেলার জন্য ক্রিকেটাররা কতটা ত্যাগ স্বীকার করেন, সেটা ভালোই জানা আছে তাঁদের পরিবারের মানুষের। সে কষ্টটা যেন ব্যর্থ না হয়, এত দিনের কষ্টটা যেন অর্জনে রূপ নেয়, সেটা দেখার জন্যই তো এভাবে কায়মনোবাক্যে সাফল্য কামনা।

করোনাকাল বলে মাঠে এখন দর্শকের উপস্থিতি নেই। তাঁরা সাধারণ দর্শক নন, তবু ক্রিকেটারদের পরিবারের সদস্যদেরও এখন আর দেখা যায় না মাঠে। কিন্তু খেলোয়াড়ের জন্য চিন্তায় তো তাতে কোনো ঘাটতি হয় না। সাফল্য কামনারও কমতি নেই কোনো। মেহেদী হাসান মিরাজের জন্যও ঠিক এমনভাবে প্রার্থনা করেন তাঁর কাছের মানুষজন। প্রার্থনায় যেন কাজ হয়, সেটা নিশ্চিত করতেও মোক্ষম উপায় বেছে নেওয়া হয়েছে। কদিন আগেই পৃথিবীর আলো দেখা মিরাজের ছোট্ট ছেলের কাছেই বাবার জন্য দোয়া চাওয়া হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন
আমার স্ত্রী বাবুকে বলে, “বাবাকে দোয়া করে দাও।” এতটুকু বাচ্চা, সে কী বোঝে, তবু তাকে দোয়া করতে বলা হয়।
বাংলাদেশ অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ

টেস্টে ফিফটি আগেও করেছেন মিরাজ। আজও করেছেন। মিরাজ নিজেও ভাবেননি এই টেস্টে ফিফটি আর ফিফটি থাকবে না, পরিণত হবে সেঞ্চুরিতে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরি। সেটিও আবার দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে।

সে জন্যই হয়তো মিরাজ দিন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে নিজের অর্জনের ব্যাখ্যায় শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ভাঙা ভাঙা বাক্যে বলছিলেন, ‘খুব ভালো লাগছে। আসলে এ রকম একটা সেঞ্চুরি...খুব ভালো লাগছে। অবিশ্বাস্য। আমার নিজের কাছে অনেক ভালো লাগছে।’

স্মরণীয় সেঞ্চুরিটি মিরাজ উৎসর্গ করেছেন নিজের পরিবারকে। পরিবারকেই করার কথা। তাঁর জন্য যে দুশ্চিন্তার শেষ নেই তাঁদের। তাঁর ভালোর জন্য কী ধরনের পাগলামি চলে, সেটাও জানালেন মিরাজ, ‘উৎসর্গ অবশ্যই পরিবারের সকল সদস্যকে করতে চাই। মা-বাবা আমার জন্য দোয়া করেন। আমার স্ত্রী, ছোট্ট বাবু আছে। আমার স্ত্রী বাবুকে বলে, “বাবাকে দোয়া করে দাও।” এতটুকু বাচ্চা, সে কী বোঝে, তবু তাকে দোয়া করতে বলা হয়। পরিবার সব সময়ই আমার জন্য দোয়া করে।’

গত অক্টোবরেই প্রথমবারের মতো বাবা হয়েছেন মিরাজ। সন্তানের মুখ দেখার পর প্রথম সিরিজ খেলতে নেমেই ওয়ানডেতে বোলারদের র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দশে ঢুকে পড়েছেন। আর টেস্ট খেলতে নেমে পেয়ে গেছেন সেঞ্চুরির দেখাও। অলরাউন্ডার সত্তা হারিয়ে যেতে বসা মিরাজের জন্য সৌভাগ্য হয়ে এসেছে তাঁর পুত্র।

default-image

শুধু যে পরিবারের ভালোবাসাই মিরাজকে এত দূর এনেছে এমন নয়। আজ দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলার পথে জুটি গড়েছেন অনেকের সঙ্গে। প্রথমে সাবেক অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে সঙ্গ দিয়েছেন। এরপর তাইজুল ইসলাম ও নাঈম হাসানের সঙ্গে জুটি গড়েছেন। এ দুজনের সঙ্গেই যেভাবে ব্যাট করেছেন, সেটা অনেক দিন মনে রাখার মতো। টেলএন্ডারদের নিয়ে ইনিংস টানতে না পারার ব্যর্থতা বাংলাদেশকে বহুদিন বহুবার ভুগিয়েছে। মিরাজ আজ সে কাজটাই করেছেন দারুণ দক্ষতায়। প্রথমে থিতু হয়েছেন। পরে ধীরে ধীরে রানের গতি বাড়িয়েছেন।

এটাও অবশ্য যথেষ্ট হবে না বলেই মনে হচ্ছিল। বাংলাদেশ যখন নবম উইকেট হারিয়েছে, তখনো এক শ হয়নি মিরাজের। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির আশা নব্বইয়ে কাটা পড়ার দুশ্চিন্তায় পরিণত হয়েছিল। মিরাজ শান্তই ছিলেন। কিন্তু অন্য প্রান্তে যে মোস্তাফিজুর রহমান! একেবারে যে ব্যাট ধরতে পারেন না এই পেসার, এমন নয়। মাঝেমধ্যে ছক্কা মারতেও দেখা যায় তাঁকে। তাই বলে নার্ভাস নাইন্টিজে থাকার সময়টায় কোনো ব্যাটসম্যানের আদর্শ সঙ্গী মোস্তাফিজ নিশ্চয়ই নন।

বিজ্ঞাপন

মোস্তাফিজ নিজেও অনেক দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন। নিজের দক্ষতার অভাব যদি বন্ধুর অর্জনে বাধা হয়ে ওঠে! এমন অবস্থায় মিরাজই উল্টো সাহস দিয়েছেন, ‘মোস্তাফিজ আমাকে বলেছে, “দোস্ত, আমার খুব ভয় লাগছে তোর চিন্তায়। ৯০ হয়ে গেছে, ওখানে যদি আমি আউট হয়ে যাই।” কিন্তু আমি ওকে একটা কথাই বলেছি, “দোস্ত, এটা তোর হাতেও না, আমার হাতেও না। তুই তোর স্বাভাবিক ক্রিকেট খেল।”’

default-image

ব্যক্তিগত অর্জন থেকে তখন ৮ রান দূরে ছিলেন মিরাজ। শেষ উইকেট জুটিতে এই আট রান তোলাই পাহাড়সম হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু মিরাজ জানতেন, টেলএন্ডার ব্যাটসম্যানরা এমনিতেই চাপে থাকেন। এই অবস্থায় সঙ্গীর সেঞ্চুরি হওয়া না হওয়া নিয়ে ভাবতে গেলেই বরং উল্টো বিপদ ডেকে আনা হবে।

তাই মোস্তাফিজকে শান্ত রাখার জন্য অন্য এক পথ বেছে নিয়েছিলেন। বলেছিলেন সব ভবিতব্যের হাতে তুলে দিতে, ‘বলেছি, যদি আমার কপালে থাকে, আল্লাহ যদি চায়, তাহলে ১০০ হবে। এটা তো তোর হাতে নাই। তুই তোর মতো খেল। চেষ্টা কর ভালোমতো খেলার। আমার যদি কপালে থাকে, তাহলে ১০০ হবেই। আমি সে মানসিকতা নিয়ে খেলেছি। সেঞ্চুরি করতে হবে, এটা আমি কখনো চিন্তা করিনি।’

এমন চিন্তার ফল পেয়েছেন মিরাজ। শেষ উইকেট জুটি পাঁচ ওভারও টেকেনি। কিন্তু এর মধ্যে দল আরও ১৪ রান পেয়েছে। নিজেও এর মধ্যে জুটিয়ে নিয়েছেন আরও ১১ রান। ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির স্বাদ নিয়েই ড্রেসিংরুমে ফিরতে পেরেছেন মিরাজ।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন