বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের খুব বড় চাকুরে না হলেও মা–বাবার আশা ট্যালেন্ট মোটামুটি পূরণ করতে পেরেছেন বলেই মনে হয়। বোর্ডের গ্রাফিকস ডিজাইনের কাজ থেকে শুরু করে কম্পিউটারসংক্রান্ত যাবতীয় কাজের সঙ্গে সাংবাদিকদের দেখভালের দায়িত্বও তাঁর। মাঝখানে ক্রিকেট বোর্ডের চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু এক হাতে অনেক কাজ সামলাতে পারেন বলেই দুই বছর পর জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট আবারও তাঁকে নিয়ে আসে বোর্ডে। ট্যালেন্টের মেধা আবারও কাজে লাগাচ্ছে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট।

সবার জীবনেই যে নামের ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, তা অবশ্য নয়। নামের সঙ্গে ভালো কোনো শব্দ জুড়ে দিয়ে জিম্বাবুইয়ান মা-বাবারা আসলে আশা করেন, তাঁদের সন্তানের জীবনে ওই ভালোর প্রভাবটা পড়বে। আবার অনেক সময় সন্তানের জন্মের সময়টাকে ধরে রাখতেও নামের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় সেই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করা কোনো শব্দ।

জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটেই আরও কয়েকজন আছেন, যাঁদের নামের সঙ্গে ও রকম শব্দ খুঁজে পাবেন। মিডিয়া ম্যানেজার থেকে ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের বড় কর্মকর্তা হয়ে যাওয়া লাভমোর বান্দা যেমন। ‘লাভমোর’ মানে নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে, আরও বেশি ভালোবাসা, বেশি বেশি ভালোবাসা।

জিম্বাবুয়ে ফুটবল দলের বর্তমান অধিনায়কের নাম কী, জানেন? নলেজ মুসোনা। ফুটবল খেলার ‘নলেজ’টা (জ্ঞান) ভালো আছে বলেই তো জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি!

জিম্বাবুয়ে দলটার মধ্যেই আসলে ভালোবাসার ছড়াছড়ি। নইলে লাভমোরের ছেড়ে যাওয়া মিডিয়া ম্যানেজারের পদে কীভাবে আসেন ডার্লিংটন মাজোঙ্গা নামের একজন! ‘ডার্লিং’ শব্দের অর্থ নতুন করে বোঝানোর দরকার আছে বলে মনে করি না। তবে স্থানীয় ভাষায় ‘মাজোঙ্গা’ শব্দের অর্থটা জেনে নিতে পারেন। এর অর্থ জোড়া। এবার ডার্লিংয়ের সঙ্গে ‘জোড়া’ জোড়া লাগিয়ে পুরো নামের অর্থটা নিজেই ঠিক করে নিন।

জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশ দলের টিম লিডার হয়ে আসা বিসিবি পরিচালক আহমেদ সাজ্জাদুল আলম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এখানে দুই জন মানুষকে দুই পাশে রেখে তিনি একটা ছবি তুলবেনই তুলবেন। একজন হচ্ছেন হোটেলে বাংলাদেশ দলকে খাবার পরিবেশন করা এফোর্ট, আরেকজন এখানে দলের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা অ্যাডমায়ার। এফোর্ট নাকি কীভাবে দলের সবাইকে তাদের মনের মতো খাবার খাওয়ানো যায়, সে চেষ্টায় ত্রুটি রাখেন না। সকালের নাশতার সময় শেষ হয়ে গেলেও এফোর্টের চেষ্টায় সেটা কোনো না কোনোভাবে মিলেই যায়। অ্যাডমায়ার কথাবার্তা একটু কম বললেও তাঁর কাজেরও তারিফই শোনা গেছে বাংলাদেশ দলের কাছ থেকে।

বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজের আম্পায়ারদের একজনের নাম আইনো চাবি। প্রথম ওয়ানডেতে তিনি ছিলেন থার্ড আম্পায়ারের দায়িত্বে। ভদ্রলোকের নামের প্রথম অংশটা একটু খেয়াল করুন। আইনো, আলাদা করে বললে ‘আই নো’, অর্থাৎ ‘আমি জানি’। অবশ্যই তিনি জানেন, অন্তত ক্রিকেটের নিয়মকানুন তো বটেই। না জানলে আইনো আম্পায়ার হন কীভাবে!

default-image

আর প্রসপার উতসেয়া তো আছেনই। মা-বাবার দেওয়া ‘প্রসপার’ নামের সার্থকতা প্রমাণ করে উন্নতির পথেই এগিয়েছে তাঁর ক্যারিয়ার। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দলে খেলেছেন, পরে অধিনায়ক হয়েছেন। খেলোয়াড়জীবন শেষে এখন তিনি আছেন জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের নির্বাচকের দায়িত্বে।

খুঁজলে নিশ্চয়ই এখানকার ক্রিকেটেই এ রকম আরও অনেক নাম পাওয়া যাবে। তবে এবার ক্রিকেট ছেড়ে একটু ফুটবলে আসুন। জিম্বাবুয়ে ফুটবল দলের বর্তমান অধিনায়কের নাম কী, জানেন? নলেজ মুসোনা। ফুটবল খেলার ‘নলেজ’টা (জ্ঞান) ভালো আছে বলেই তো জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি! এই লেফট উইঙ্গার খেলেছেন সৌদি আরব, বেলজিয়াম এবং জার্মানির ঘরোয়া ফুটবলেও।

জিম্বাবুয়ের ফুটবলেরই আরেকজন মারভেলাস নাকামবা। যাঁরা ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন, তাঁদের কাছে নামটা পরিচিতই হওয়ার কথা। জিম্বাবুয়ে জাতীয় দলের মাঝমাঠের এই খেলোয়াড় খেলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল অ্যাস্টন ভিলায়। তাদের হয়ে ৪০টির ওপর ম্যাচ খেলেছেন তিনি। খেলায় নামের মতো চমৎকার কিছু নিশ্চয়ই আছে। নইলে জিম্বাবুয়ে থেকে হাতে গোনা যে তিন-চারজন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন, মারভেলাসের তো তাঁদের একজন হওয়ার কথা নয়।

শুরুতে হার্ডলাইফের কথা বলছিলাম। হার্ডলাইফের জন্মের সময়টা কঠিন সংগ্রামের মধ্যে কাটছিল তাঁর মা-বাবার। সে জন্যই সন্তানের ও রকম একটা নাম দিয়েছিলেন তাঁরা। পরে অবশ্য মা চেয়েছিলেন ছেলের নাম বদলে অন্য কিছু রাখতে। কিন্তু নানা কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। হার্ডলাইফ জভিরেকিউর নাম হার্ডলাইফই থেকে যায়।
তবে মা যদি তখন জানতেন, ‘হার্ডলাইফ’ নামটাই তাঁর সন্তানের জীবনে নির্মম বাস্তবতা হয়ে ধরা দেবে, তাহলে নিশ্চয়ই যে করেই হোক, সেটা বদলে ফেলতেন। মা–বাবা নিশ্চয়ই কখনোই ভাবেননি যে, তাঁদের সন্তানের জীবনটা সত্যি সত্যিই কঠিন এক যুদ্ধের মধ্যে পড়ে যাবে।

২০১৮ সালের মার্চের ঘটনা। হার্ডলাইফ একদিন নিজেই গাড়ি চালিয়ে অনুশীলন থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ একটা মিনি ভ্যান আরেক দিক থেকে এসে তাঁর গাড়িকে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়। দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হার্ডলাইফের বাঁ হাত। হাসপাতালে নেওয়ার পর কবজির ওপর থেকে হাতটা কেটেই ফেলতে হয়। ইচ্ছা ছিল তাঁর সঙ্গে দেখা করার। করোনার কারণে সেটি আর সম্ভব হয়নি। তবে আরো আগে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে হার্ডলাইফ বলেছেন, ‘আমার হাতটা মারাত্মকভাবে জখম হয়ে গিয়েছিল। আমি আঙুল নাড়াতে পারছিলাম না। হাতটা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না। আমি তখন ভেবেছিলাম ওখানেই বুঝি আমার সব শেষ।’

না, ওখানেই সব শেষ হয়ে যায়নি হার্ডলাইফের। বরং জীবনের কঠিন যুদ্ধে জয়ী হয়ে আবার তিনি ফিরেছেন মাঠে। জিম্বাবুয়ে জাতীয় দলের হয়ে ৩৮টি ম্যাচ খেলা হার্ডলাইফ বলছিলেন, ‘আমার মনের গভীরে ইচ্ছা ছিল, যদি আরেকবার সুযোগ পাই আমি আবার মাঠে খেলতে যাব।’

সেই ইচ্ছার জোরেই সত্যি সত্যি মাঠে ফিরেছেন তিনি। একটা হাতের অর্ধেক নেই তো কী হয়েছে! পারফরম্যান্সে কারও চেয়ে পিছিয়ে নেই বলেই তো জিম্বাবুয়ের ঘরোয়া ফুটবলের দল কেপস ইউনাইটেডের নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁর কাঁধে।

নিজের কঠিন জীবন থেকে হার্ডলাইফ যে শিক্ষা নিয়েছেন, সেটা আসলে সবার জন্যই প্রযোজ্য। হার্ডলাইফ বলছিলেন, ‘দুঃসময়ে হাল না ছাড়লে দেখা যায়, কখনো কখনো ওটা আসলে নতুন কিছুরই শুরু। হতে পারে আরও বড় কিছুর শুরু। কোনো পরিস্থিতিতেই হাল ছাড়া উচিত নয়। যতক্ষণ না সৃষ্টিকর্তা বলছেন শেষ, ততক্ষণ পর্যন্ত আসলে কিছুই শেষ হয় না।’

হার্ডলাইফের নামের দ্বিতীয় অংশের অর্থটাও জেনে রাখতে পারেন। জভিরেকিউ— যার অর্থ, সীমাহীন। সীমাহীন জীবনযুদ্ধ জয় করেই তো আসলে টিকে আছেন আজকের হার্ডলাইফ!

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন