সিডনি টেস্টের পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়বেন খাজা
সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এসসিজি) আগামী রোববার শুরু হবে অ্যাশেজের পঞ্চম ও শেষ টেস্ট। এই ম্যাচ শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানাবেন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যান উসমান খাজা। আজ এসসিজির সংবাদ সম্মেলনকক্ষে পরিবারের সামনে সিদ্ধান্তটি জানান তিনি। ৩৯ বছর বয়সী খাজা অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মুসলিম টেস্ট ক্রিকেটার। অবসর ঘোষণায় খাজা একটি গুরুতর অভিযোগও করেন। ১৫ বছরের এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বর্ণবাদী আচরণের শিকার হয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় স্থানীয় সময় আজ সকালে সতীর্থদের নিজের এই সিদ্ধান্ত জানান খাজা। ২০১১ সালে রিকি পন্টিং চোট পাওয়ায় এই সিডনিতেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়। একই মাঠে প্রথম শ্রেণি ও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতেও তাঁর অভিষেক ঘটেছে। চলতি অ্যাশেজে সেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই সিডনি টেস্টে খেলার সুযোগ পেলে চক্রপূরণের মাধ্যমে শেষ হবে খাজার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
৮৭ টেস্টে ৪৩.৩৯ গড়ে ১৬ সেঞ্চুরিসহ ৬২০৬ রান করেছেন খাজা। তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে বিতর্ক চলছিল কিছুদিন ধরেই। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক তাঁকে সিডনি টেস্টের পরই অবসর নেওয়ার পরামর্শ দেন। এবারের অ্যাশেজ শুরুর আগে গলফ খেলে পার্থ টেস্টে চোটের কারণে ওপেন করতে না পারার জন্যও সমালোচিত হন খাজা। পিঠের সমস্যাও তাঁকে ভোগাচ্ছে অনেক দিন ধরে। এর পাশাপাশি এবারের অ্যাশেজে ৩ ম্যাচে ৫ ইনিংসে ১৫৩ রান করা খাজার ফর্মটাও ভালো যাচ্ছে না।
পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া খাজা অবসর ঘোষণায় বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই এটা নিয়ে ভাবছিলাম। এই সিরিজের দিকে এগোতে এগোতে আমার মনে একটা ধারণা কাজ করছিল, এটাই হয়তো আমার শেষ সিরিজ। এ বিষয়ে আমি র্যাচেলের (খাজার স্ত্রী) সঙ্গে কথা বলেছি। জানতাম এটা বড় একটা সুযোগ। তবে একদমই সরে আসিনি; কারণ, জানতাম খেলা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড শেষ পর্যন্ত সঠিক—কিছুদিন আগে যখন তাঁকে জানালাম, তিনি তখনো ভাবছিলেন ভারতের (২০২৭) বিপক্ষে খেলতে পারি।’
খাজা বলে যান, ‘এসসিজি—যে মাঠটিকে আমি ভালোবাসি, সেখানে একটু মর্যাদার সঙ্গে নিজের ইচ্ছায় বিদায় নিতে পারছি, সে জন্য আমি খুশি। তবে সিরিজের শুরুটা আমার জন্য বেশ কঠিন ছিল। এরপর (শুরুতে) অ্যাডিলেডে দলে জায়গা না পাওয়াটা সম্ভবত আমার জন্য একটা ইঙ্গিত ছিল যে ঠিক আছে, এখন সরে দাঁড়ানোর সময়।’
এসসিজির পাশে কুক রোডে বসবাস করতেন খাজা। মাঠটি তাই এক অর্থে তাঁর ‘হোম গ্রাউন্ড’। গত দুই বছরে খাজা একাধিকবার অবসর নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। গত গ্রীষ্মে ভারতের বিপক্ষে বক্সিং ডে টেস্টের সময় ক্যারিয়ারের ইতি টানা নিয়ে কোচ ম্যাকডোনাল্ডের সঙ্গেও তিনি কথা বলেন। খাজার ভাষায়, ‘তাকে বলেছিলাম, এই মুহূর্তে যেকোনো পর্যায়ে যদি মনে হয় আমার অবসর নেওয়া উচিত, তাহলে সেটাই করব। আমি কোনো কিছু আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই না। এটা সবচেয়ে বিরক্তিকর। কারণ, আমার মনে হয়েছে, লোকে আমাকে আক্রমণ করছে। খেলে যাওয়ার জন্য তারা আমাকে স্বার্থপর বলছে বলে মনে হয়েছে। কিন্তু আমি নিজের জন্য খেলিনি। কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড সরাসরি “না” বলে দেন। বলেছিলেন, আমি চাই তুমি থাকো। শ্রীলঙ্কা ও বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে তোমাকে আমাদের প্রয়োজন। তাই থেকেছি।’
সিডনি টেস্টের পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়ার ঘোষণা দিলেও ব্রিসবেন হিটের হয়ে বিগ ব্যাশে খেলবেন খাজা। শেফিল্ড শিল্ডেও খেলতে চান কুইন্সল্যান্ডের হয়ে। এবার অ্যাশেজে অ্যাডিলেড টেস্টের দলে শুরুতে সুযোগ না পেলেও স্টিভেন স্মিথ অসুস্থ হয়ে পড়ায় শেষ মুহূর্তে কপাল খোলে খাজার। সেই টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৮২ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৪০ রান করেন খাজা। এরপর মেলবোর্নে চতুর্থ টেস্টেও দলে ছিলেন।
বর্ণবাদী আচরণের শিকার হওয়া নিয়েও ক্ষোভ উগরে দেন খাজা, ‘মিডিয়া এবং সাবেকরা আমাকে যেভাবে আক্রমণ করেছে, সেটা কয়েক দিন সহ্য করতে পারতাম। কিন্তু পাঁচ দিন ধরে চলল। আমার প্রস্তুতি নিয়ে সবাই যেভাবে আক্রমণ করেছে—দলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়, শুধু নিজের কথাই ভাবে। গলফ খেলে। স্বার্থপর। কঠোর অনুশীলন করে না। আলসে। এগুলো সেই একই রকম বর্ণবাদী স্টেরিওটাইপ (ভেবেছিলাম আমরা এগুলো পেছনে ফেলে এসেছি)। কিন্তু স্পষ্টতই আমরা এটা পুরোপুরি পেছনে ফেলতে পারিনি। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে এর আগে আমি কাউকে এমন আচরণের শিকার হতে দেখিনি।’
ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি বিমানের পাইলট হওয়ারও যোগ্যতা অর্জন করা খাজা আরও বলেন, ‘আমি পাকিস্তান থেকে আসা একজন গর্বিত মুসলিম “কালারড বয়”, যাকে বলা হয়েছিল যে কখনো অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে খেলতে পারবে না। কিন্তু এখন আমাকে দেখুন, ঠিক একই কাজ আপনিও করতে পারবেন।’ খুব ছোটবেলায় ইসলামাবাদ থেকে পরিবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় যান খাজা। একসময় তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা একমাত্র এশিয়ান। এই পথে বাকিদের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য তাঁকে রোল মডেল হিসেবেও দেখা হয়।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টড গ্রিনবার্গ বলেন, ‘১৫ বছর আগে টেস্ট অভিষেকের পর আমাদের অন্যতম স্টাইলিস্ট ও সহিষ্ণু ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজের অর্জনের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে বিশাল অবদান রেখেছেন খাজা। মাঠের বাইরে বিশেষ করে উসমান খাজা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেও অবদান রেখেছেন। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের পক্ষ থেকে আমি উসমানকে তাঁর সব অর্জনের জন্য অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই।’
চলতি অ্যাশেজ জয় আগেই নিশ্চিত করেছে অস্ট্রেলিয়া। পাঁচ ম্যাচের সিরিজে তারা ৩–১ ব্যবধানে এগিয়ে।