বইয়ের মোড়কে দেশের ‘ক্রিকেটের দলিল’ লিখলেন লুৎফুর রহমান
তাঁর পুরো জীবনটাই ক্রিকেটময়। ব্রিটিশ আমলে দর্শক হিসেবে ক্রিকেট খেলা দেখেছেন, পাকিস্তান আমলে চুটিয়ে ক্রিকেট খেলেছেন, অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে ঢাকার মাঠে দীর্ঘদিন আয়োজন করেছেন গ্রীষ্মকালীন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট কারদার সামার ক্রিকেট; যা তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বেশ জনপ্রিয় ছিল। পঞ্চাশ-ষাটের দশকের সেই ক্রিকেটার ও প্রবীণ ক্রিকেট সংগঠক লুৎফুর রহমান মাখন এবার ৯৩ বছর বয়সে ক্রিকেট নিয়ে লিখলেন এক বই।
আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা আকরম খাঁ মিলনায়তনে তাঁর তৃতীয় বই ‘ষাটের দশকের ক্রিকেট এই বাংলায়’-এর প্রকাশনা উৎসব হয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ক্রিকেটার, বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক প্রধান নির্বাহী সৈয়দ আশরাফুল হক, সাবেক ক্রিকেটার জাহাঙ্গীর শাহ বাদশা, ওমর খালেদ রুমিসহ আরও অনেকেই।
ক্রিকেটের সঙ্গে দীর্ঘ সময় সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে লুৎফুর রহমান মাখন আগেও ‘যখন নির্বাচক ও আমার ক্লাব’ এবং ‘ক্রিকেটের সাথে পথচলা’ নামের দুটি বই লিখেছেন। সর্বশেষ ‘ক্রিকেটের সাথে পথচলা’ প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালে।
আজ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সাবেক ক্রিকেটার ও লেখকের বন্ধু কাজী হাবিবুর রহমান। বইটি প্রকাশিত হয়েছে সাবেক ক্রিকেটার দুলাল হোসেনের সার্বিক সহযোগিতায়। প্রকাশ করেছে সৌম্য প্রকাশনী।
পাক্ষিক ক্রীড়াজগতের সাবেক সম্পাদক দুলাল মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তারা বইটির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তব্য দেন। মুহাম্মদ কামরুজ্জামান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘বইটি শুধু ইতিহাস নয়, এটি ক্রিকেটের এক অনন্য দলিল।’
সৈয়দ আশরাফুল হক বইটিকে বলেন, ‘এই বইয়ে অনেকগুলো স্কোরকার্ড দেওয়া আছে, যা অসাধারণ একটা দিক। অনেক ম্যাচের অংশ ছিলাম আমি নিজেও। পঞ্চাম-ষাটের দশকের ক্রিকেট সম্পর্কে যাঁদের ধারণা নেই, তাঁরা এই বই থেকে অনেক কিছু জানতে পারবেন।’ কাজী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এমন বই লিখে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন মাখন।’
ওমর খালেদ রুমির কণ্ঠেও লেখকের প্রশংসা, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে বই লেখা হয়েছে। তবে এমন বই আগে দেখিনি। এখানে এত স্কোরকার্ড, যা অবিশ্বাস্য!’ বিসিবির সাবেক পরিচালক ও ক্রিকেট কোচ নাজমুল আবেদীনের কথা, ‘এই বয়সেও মাখন ভাই তিনটি বই লিখেছেন, এটা তাঁকে ছাড়া সম্ভব ছিল না।’ ক্রীড়া লেখক খন্দকার সালেক সুফি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটেই এই বইটি অনন্য হয়ে থাকবে।’
লেখক তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই প্রয়াত কিংবদন্তি ফুটবলার জাকারিয়া পিন্টুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘বই লিখব কখনো ভাবিনি। অনেকের অনুরোধ এবং সহযোগিতায় লিখেছি। আশা করি, বইটি পাঠকের ভালো লাগবে।’ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ক্রীড়া লেখক ইকরামউজ্জমান ও সাবেক ক্রিকেটার শহীদুল আলম রতন।
বইটিতে ষাটের দশকের কিছু দুর্লভ স্কোরবোর্ড আছে, যার অনেকগুলোর ছবি লেখকের নিজের তোলা। ৫৫২ পৃষ্ঠার বইটির নামের সঙ্গে যদিও ষাটের দশক জড়িয়ে আছে, তবে তার আগে-পরের অনেক ইতিহাসও এতে উঠে এসেছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় কীভাবে ক্রিকেট খেলা হতো, কারা খেলতেন—সেসব তুলে ধরা হয়েছে। পঞ্চাশের দশকে শুরু হওয়া কারদার সামার ক্রিকেট, কায়দে আজম ট্রফি, আইয়ুব ট্রফি ক্রিকেট, ইপিএসএফ নকআউট টুর্নামেন্ট, আন্তবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট ইত্যাদি টুর্নামেন্ট সম্পর্কেও বইটিতে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।
অনুষ্ঠানে বক্তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আজ পর্যন্ত দেশের ক্রিকেটের ইতিহাস সংরক্ষণ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, বইটি ইতিহাসের বাঁকে পড়ে থাকা আসল ইতিহাসকেই নতুন করে তুলে ধরেছে।
১৯৩৩ সালের নভেম্বরে কুমিল্লায় জন্ম লুৎফুর রহমান মাখনের। শৈশব কেটেছে ময়মনসিংহে। শহর ময়মনসিংহের পন্ডিতপাড়া অ্যাথলেটিক ক্লাবে ক্রিকেটের প্রথম পাঠ নেন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে ঢাকার প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে অভিষেক হয় তাঁর। পাকিস্তানের প্রধান ঘরোয়া ক্রিকেট প্রতিযোগিতা কায়দে আজম ট্রফি ঢাকায় প্রথমবার আয়োজিত হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে খেলেন। এই টুর্নামেন্টে ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে তাঁর নেতৃত্বে ইস্ট জোনে চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।