খাজার বোমা: কেপ টাউনে বল টেম্পারিংয়ে জড়িত ছিল পুরো অস্ট্রেলিয়া দল
বেশ বড়সড় এক বোমাই ফাটালেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ব্যাটসম্যান উসমান খাজা। তাঁর দাবি, ২০১৮ সালে কেপ টাউন টেস্টে বল টেম্পারিংয়ের ঘটনায় পুরো অস্ট্রেলিয়া দল জড়িত ছিল। সেই টেস্টে অস্ট্রেলিয়া দলে ছিলেন খাজা।
খাজা আরও দাবি করেছেন, কেপ টাউনের আগে পোর্ট এলিজাবেথ (বর্তমানে গেবেরা) টেস্টেও বল টেম্পারিংয়ের একই কৌশল ব্যবহার করেছিল অস্ট্রেলিয়া দল।
ড্রেসিংরুমে অস্ট্রেলিয়া দলের তখনকার ওপেনার ক্যামেরন ব্যানক্রফটের পাশে বসতেন খাজা। কেপ টাউন টেস্টে বল টেম্পারিংয়ের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে সাজা খাটা ব্যানক্রফটের পাশে বসলেও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) তদন্তকারীরা কখনো খাজাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। নিজের আত্মজীবনী ‘সবর’-এ এসব বিস্ফোরক দাবিই প্রকাশ করবেন খাজা। বইটি প্রকাশ হবে আগামী মঙ্গলবার। চলতি বছর জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন খাজা।
বইটির বিষয়ে অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্স এবং ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গকে আগেই জানিয়েছেন খাজা। প্রতিষ্ঠিত লেখক বা সাংবাদিকের সাহায্য ছাড়াই বইটি নিজে লিখেছেন ৩৯ বছর বয়সী সাবেক এই ক্রিকেটার।
আত্মজীবনী প্রকাশ হওয়ার তিন দিন আগে আজ ‘নাইন পেপার্স’কে সাক্ষাৎকার দেন খাজা। ২০১৮ সালে কেপ টাউনে সেই ‘স্যান্ডপেপারগেট’ কেলেঙ্কারির ঘটনা সম্পর্কে বইটিতে কী থাকছে, তা সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছেন। কেপ টাউনে বলে স্যান্ডপেপার (শিরীষ কাগজ) ব্যবহারের বিষয়টি পুরো দলেরই জানা ছিল এবং তার আগের টেস্টেও এটা ব্যবহার করা হয়েছিল বলে সাক্ষাৎকারে দাবি করেন খাজা। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সবাই (জড়িত) ছিলাম। শুধু ব্যাটার, বোলার কিংবা স্টাফ নয়, আমরা সবাই।’
এত দিন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ), সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় ও স্টাফদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ঘটনার জন্য শুধু স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফটই দায়ী ছিলেন। স্মিথ ও ওয়ার্নারকে এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং ব্যানক্রফট নিষিদ্ধ হন ৯ মাস। সে সময় টেস্ট দলের সহ-অধিনায়ক ওয়ার্নারকে আন্তর্জাতিক ও অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে সব ধরনের নেতৃত্ব থেকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, যার সুবাদে বিগ ব্যাশে (বিবিএল) সিডনি থান্ডারকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পান ওয়ার্নার।
২০২১ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যানক্রফট দাবি করেন, কেপ টাউন টেস্টে বল টেম্পারিংয়ের বিষয়টি বোলারদের জানা ছিল। এর জবাবে প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন যৌথ বিবৃতিতে এ বিষয়ে আগে থেকেই জানাশোনা অস্বীকার করেছিলেন। কামিন্স–লায়নরা দাবি করেন, ‘নিউল্যান্ডসের বড় পর্দায় ছবিগুলো না দেখা পর্যন্ত আমরা জানতাম না বলের অবস্থা পরিবর্তন করতে মাঠে কোনো বহিরাগত বস্তু নেওয়া হয়েছিল।’
খাজা বলেছেন, তিনি নিজে সত্য প্রকাশকারী হতে চাননি। কিন্তু এই সত্য প্রকাশ করাকে নিজের দায়িত্ব বা অবশ্যকর্তব্য বলে মনে করেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৮৮ টেস্ট, ৪০ ওয়ানডে, ৯টি টি–টুয়েন্টি খেলা খাজা। তাঁর ভাষায়, ‘আদর্শ পরিস্থিতিতে আমি এটা করতে চাইতাম না। এমন কেউ হতে চাইতাম না, যে সামনে এসে সত্যটা প্রকাশ করবে। সমস্যা হলো, আমি ভেবেছিলাম যে আট বছর পর এত দিনে সত্যটা এমনিতেই সামনে চলে আসবে।’
খাজা এরপর বলেন, ‘ভেবেছিলাম ডেভি (ওয়ার্নার) বিষয়টি ফাঁস করে দেবে অথবা অন্য কেউ এ নিয়ে আরও খোলামেলা কথা বলবে। তবে একদম শুরু থেকেই আমার অবস্থান ছিল—এর দায় সম্মিলিতভাবে নেওয়া উচিত।’
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে খাজা আরও বলেন, ‘ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। বলেছিলাম, “দল হিসেবে এটার দায় নাও।” আমরা দলগতভাবেই এটা করেছি। কী হচ্ছিল, তা আমরা জানতাম এবং দল হিসেবেই আমাদের এর দায় নিতে হবে—আমার অবস্থান সব সময়ই এমন ছিল। শেষ পর্যন্ত এতে কাজ হয়নি এবং ওই তিনজনকে শাস্তি দেওয়া হয়।’
সাক্ষাৎকারে ওয়ার্নার, ব্যানক্রফট ও স্মিথের প্রতি সহমর্মিতা ঝরেছে খাজার কণ্ঠে, ‘গত আট বছরে আমি দেখেছি ডেভিকে (ওয়ার্নার) বারবার কতটা নির্মমভাবে বিদ্ধ করা হয়েছে...ও শুধু সহ্যই করে গেছে, একের পর এক সহ্য করে গেছে। আর ব্যাঙ্গার্স (ব্যানক্রফট) ওই ঘটনার পর অল্প দিন টেস্ট খেললেও তারপর আর কখনো দলে ফিরতে পারেনি। স্মিথের কথাও ধরা যাক...আমি জানি, ওই একটা বছর সবকিছু যেভাবে ঘটেছিল, তা সে কখনোই ভুলে যায়নি।’
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জেনেশুনেই আমার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি; কারণ তারা জানত যে আমি দল হিসেবে দায়টা নিতে চাই। সাক্ষাৎকার নিলে আমি সত্য বলতে প্রস্তুত ছিলাম।নাইন পেপার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উসমান খাজা
খাজা কেন এখন এ বিষয়ে মুখ খুললেন তা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, ‘আমি অন্য কোনো কারণে এটা করছি না, শুধু মনে করেছি এটাই সঠিক কাজ। সব সময় বিশ্বাস করি ক্রিকেটের বাইরেও জীবনে অনেক কিছু আছে, আর ছেলেরা কোনো না কোনোভাবে এই বিচার পাওয়ার যোগ্য। অথচ মনে হচ্ছে না কেউ তাদের সেই ন্যায়বিচার দেবে। তিনজনের কেউ-ই মুখ খুলতে চায় না। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ তারা নিজে কিছু বললে তা কেবল কথার কথা বা “তাদের নিজেদের বক্তব্য” বলেই গণ্য হবে। তাই তাদের হয়ে কথা বলার জন্য অন্য কারও প্রয়োজন ছিল।’
কেপ টাউন ও জোহানেসবার্গ টেস্টের মাঝের সময়ে তৎকালীন সিএ প্রধান নির্বাহী জেমস সাদারল্যান্ড বোর্ডের নৈতিকতা বিভাগের প্রধান ইয়েন রয় ও পারফরম্যান্স ম্যানেজার প্যাট হাওয়ার্ডকে কেপ টাউনে পাঠিয়েছিলেন ম্যাচে খেলোয়াড়দের আচরণবিধি তদন্ত করার জন্য। সেই তদন্তের ফলেই স্মিথ, ওয়ার্নার ও ব্যানক্রফট শাস্তি পান।
খাজা বলেন, ‘পুরো টেস্টে আমি ব্যানক্রফটের ঠিক পাশেই বসেছি, অথচ আমাকে কোনো সাক্ষাৎকার বা জিজ্ঞাসাবাদই করা হয়নি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, জেনেশুনেই আমার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি; কারণ তারা জানত যে আমি দল হিসেবে দায়টা নিতে চাই। সাক্ষাৎকার নিলে আমি সত্য বলতে প্রস্তুত ছিলাম। শুধু ফোনটি বাজার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু ফোন আর কখনোই বাজল না, এর মধ্যেই শাস্তি ঘোষণা করা হলো এবং আমি বিষয়টি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারিনি।’
খাজার এই সাক্ষাৎকারের পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায় যে পুরো ঘটনার সততা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রক্রিয়া নিয়ে তারা সন্তুষ্ট, ‘২০১৮ সালের কেপ টাউনের টেস্টের পর গত আট বছরে এ নিয়ে প্রচুর জল্পনা-কল্পনা হয়েছে, যার মধ্যে গত মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ জুড়েও ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ ছিল। এ সময়ে যেকোনো প্রাসঙ্গিক তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ সব সময়ই ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) কাছে এখন পর্যন্ত যত প্রাসঙ্গিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং নিজেদের সততা ও স্বচ্ছতা এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর আস্থা এখনো অটুট রয়েছে।’