সেমিফাইনালের আগে ভারতের ‘দুশ্চিন্তা’র ছয়টি কারণ
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গত পরশুর ম্যাচটা শেষে ইডেন গার্ডেনে স্বস্তির সুবাতাস। অলিখিত ‘কোয়ার্টার ফাইনালের’ স্নায়ুচাপ সামলে ভারত যখন শেষ হাসি হাসল, কলকাতার গ্যালারিতে উৎসবের আবহ। কিন্তু এর মধ্যেও একটা খটকা থেকেই যাচ্ছে। ভারত কি তাদের সেরা ক্রিকেটটা খেলতে পেরেছে? উত্তরটা বোধহয় খোদ সূর্যকুমার যাদবেরও জানা নেই।
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারত জায়গা করে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই যাত্রাটা মোটেও রাজকীয় ছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে আমেদাবাদে হার কিংবা জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৮৪ রান হজম করা—সব মিলিয়ে সেমিফাইনাল ম্যাচের আগে ভারতের দুশ্চিন্তার জায়গা আছে বেশ কিছু।
আগামীকাল কলকাতার ইডেন গার্ডেনে প্রথম সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকা খেলবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ৫ মার্চ মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অপর সেমিফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ দুইবারের চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। ফাইনালের টিকিটের জন্য ওই লড়াইয়ে নামার আগে কাটাছেঁড়া করলে ভারতের দুশ্চিন্তা করার মতো অন্তত ছয়টি কারণ বেরিয়ে আসছে।
বরুণ চক্রবর্তীর ‘রহস্য’ কি ফাঁস
সর্বশেষ (২০২৪) টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের পর থেকে এবারের বিশ্বকাপ পর্যন্ত এ সংস্করণে বরুণ চক্রবর্তীর চেয়ে বেশি উইকেট আর কোনো পূর্ণ সদস্যদেশের বোলার পাননি। গৌতম গম্ভীর যখন তাঁকে সাদা বলের ক্রিকেটে নিয়মিত করলেন, তখন মনে হয়েছিল ভারতের ট্রাম্প কার্ড তৈরি। দুই বিশ্বকাপের মাঝখানে ২৮ ইনিংসে নিয়েছিলেন ৫৭ উইকেট।
কিন্তু এই বিশ্বকাপে এসেই যেন বরুণের ঘূর্ণির ধার কমে গেছে। গ্রুপ পর্বে পুঁচকে দলগুলোর বিপক্ষে চললেও সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাঁকে বেশ সাধারণ মনে হয়েছে। গ্রুপ পর্বে নিয়েছিলেন ৯ উইকেট। সুপার এইটে ৩ ম্যাচে ১২ ওভার বল করে রান দিয়েছেন ১২২, উইকেট মাত্র ৩টি। আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগছেন কি না, কে জানে। লেংথ ঠিক রাখতে পারছেন না। বরুণের যে চার ওভারের ওপর ভারত ভরসা করত, সেই চার ওভারই এখন চিন্তার কারণ।
বুমরা তো আর ‘মেশিন’ নন
যশপ্রীত বুমরা না থাকলে এই ভারতীয় দলের দশা কী হতো, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। ৬.৩ ইকোনমি রেট নিয়ে এই টুর্নামেন্টেও তিনি অতিমানবীয়। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়—বুমরার ওপর অতিনির্ভরশীলতা। বুমরা তো আর যন্ত্র নন যে প্রতিদিনই তিনি রান আটকে উইকেট নেবেন! কোনো দিন যদি তিনি মার খেয়ে যান, সেদিন হাল ধরবে কে? হার্দিক পান্ডিয়া, নাকি ছন্দে না থাকা বরুণ?
পাওয়ারপ্লেতে বুমরাকে ঠিকঠাক ব্যবহার না করাটাও একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়া কাপে দেখা গেছে, বুমরা পাওয়ারপ্লেতেই দুই-তিন ওভার করে প্রতিপক্ষের ধস নামিয়েছেন। অথচ এখানে তাকে আনা হচ্ছে পঞ্চম ওভারে। বুমরাকে পরে আনা মানে প্রতিপক্ষকে হাত খোলার সুযোগ করে দেওয়া।
ক্যাচ ফসকালে যাবে ম্যাচও
পরিসংখ্যান বলছে, সুপার এইটের দলগুলোর মধ্যে ক্যাচ ছাড়ার হার সবচেয়ে বেশি ভারতের। ক্যাচ ধরায় ভারতের সাফল্য ৭২.৭ %, সবচেয়ে ভালো ইংল্যান্ড (৮৭.২%)।
পাকিস্তান বা শ্রীলঙ্কার চেয়ে ভারতের ফিল্ডিং ভালো মনে করা হতো, কিন্তু এবার ভারত তাদের পেছনে। ডোয়াইন ব্রাভো বা রবীন্দ্র জাদেজাদের মতো ‘গান ফিল্ডার’ এই দলে কই? ঈশান কিষান বা শিবম দুবেরা তো ফিল্ডিংয়ে শরীরই নাড়াতে পারছেন না সময়মতো। এমনকি তরুণ অভিষেক শর্মাও যেভাবে ক্যাচ ফেলছেন, তাতে মনে হচ্ছে চাপের মুখে ভারতীয় ফিল্ডাররা হাতে মাখন লাগিয়ে নামছেন।
একার কাঁধে আর কত
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে সূর্যকুমার, পাকিস্তানের বিপক্ষে ঈশান কিষান, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সঞ্জু স্যামসন—ভারত ম্যাচ জিতছে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে। দলীয় পারফরম্যান্স কই?
অস্ট্রেলিয়া বড় টুর্নামেন্ট জেতে কারণ মোক্ষম সময়ে তাদের সবাই জ্বলে ওঠেন। ভারতের টপ অর্ডার কিন্তু এখনো একসঙ্গে ক্লিক করেনি। জিম্বাবুয়ে ম্যাচ বাদ দিলে টপ ফোরের ধারাবাহিকতা নেই বললেই চলে। শুধু একজনের ওপর ভরসা করে কত দূর যাওয়া যায়?
সূর্যের আকাশ কি মেঘে ঢাকা
যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪৯ বলে ৮৪ রানের সেই ইনিংসের পর সূর্য যেন মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়েছেন। পরের ইনিংসগুলোতে তার স্ট্রাইক রেট (৯২, ১১০, ১২১) কোনোভাবেই তাঁর নামের সঙ্গে মানানসই নয়। আইপিএলে ১৬৮ স্ট্রাইক রেটে রান তোলা সূর্য যেন বাঁহাতি স্পিনারদের সামনে অসহায় হয়ে পড়ছেন। অফসাইডে গ্যাপ খুঁজে পাওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিপক্ষ এখন বুঝে গেছে তাঁর ফ্লিক শটটা আটকে দিলেই সূর্যকে ‘গ্রহণ’ লাগানো সম্ভব।
সেমিফাইনালের মঞ্চে কি আবার স্বরূপে ফিরবেন স্কাই?
অভিষেক শর্মা: আত্মবিশ্বাস আইসিইউতে
টুর্নামেন্টের আগে অভিষেকের ব্যাট থেকে রানের লাভাস্রোত বইছিল। সেই অভিষেক এখন রানের হাপিত্যেশ করছেন। বিশ্বকাপের আগে ২৪ ম্যাচে ২০০ স্ট্রাইক রেটে হাজার রান করা ভারতীয় ওপেনারের বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে গড় মাত্র ১৩.৭৫! তিনটি ‘ডাক’ মেরে টুর্নামেন্ট শুরু করা অভিষেক এখন আত্মবিশ্বাসের তলানিতে। আকিল হোসেনের সাধারণ বলে যেভাবে তিনি আউট হয়েছেন, তাতে বোঝা যাচ্ছে সমস্যাটা টেকনিক্যাল নয়, মানসিক। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটা ফিফটি পেলেও বড় ম্যাচে তাঁর রান না পাওয়াটা ভারতকে ভোগাতে পারে।