৩ ম্যাচে ১১ উইকেট: ক্যালিসের স্কুল থেকে উঠে আসা কে এই শ্যাডলি
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ উইকেটের রেকর্ডটি এখন যৌথভাবে দুজনের—ফজলহক ফারুকি ও অর্শদীপ সিংয়ের। ২০২৪ বিশ্বকাপে আফগানিস্তান ও ভারতের দুই পেসার ১৭টি করে উইকেট নিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে ২০২৬ টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে এখনো গ্রুপ পর্বই শেষ হয়নি, তাহলে এই হিসাব এখন কেন আসছে?
কারণ, এবার গ্রুপ পর্বে ৩ ম্যাচ খেলেই ১১ উইকেট নিয়েছেন এক বোলার। এর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স একটি আরেকটির ‘কার্বন কপি’—২৫ রানে ৪টি করে উইকেট! এরপর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নিয়েছেন ২১ রানে ৩ উইকেট। এতক্ষণেও বোলারটিকে না চিনলে আপনি বলতেই পারেন, তাহলে তো এবার ফারুকি এবং অর্শদীপের রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে!
উত্তর— ‘না’, আবার ‘হ্যাঁ’–ও।
হ্যাঁ বলতে হচ্ছে, কারণ ক্রিকেট মহা অনিশ্চয়তার খেলা। এখন যুক্তরাষ্ট্র যদি সুপার এইটে ওঠে কিংবা সেই ধাপও পেরিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট পেয়ে যায়, তাহলে হয়তো ফারুকি ও অর্শদীপের রেকর্ড হুমকির মুখে পড়তে পারে।
কারণ, ওই রেকর্ড গড়তে ৮টি করে ম্যাচ খেলতে হয়েছিল ফারুকি এবং অর্শদীপকে। আর এবার যাঁর কথা বলা হচ্ছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পেস বোলিং অলরাউন্ডার শ্যাডলি ফন শালকভিক।
ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে এবার ‘এ’ গ্রুপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ দুই পরাশক্তির মধ্যে যেকোনো একটি বাদ পড়বে আর সেই ফাঁক গলে যুক্তরাষ্ট্র সুপার এইটে উঠবে—এমন সম্ভাবনা একটু কমই। তবে অবিশ্বাস্য কিছু যে ঘটবে না, সেটাও কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যায় না।
ভারত ও পাকিস্তানের পর এখন পয়েন্ট তালিকার তিনে যুক্তরাষ্ট্র। আর একটি ম্যাচই খেলবে তারা গ্রুপ পর্বে। সুপার এইটে ওঠার আশাও তাদের মিলিয়ে যায়নি।
শ্যাডলি তাই আলোচনায়। ইএসপিএনক্রিকইনফোয় যেমন তাঁকে নিয়ে কথা বলেছেন ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ও বিশ্লেষক আকাশ চোপড়া। তিনি মনে করেন, ৩৭ বছর বয়সী শ্যাডলি এখন আসলে তাঁর জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে পা রাখার দ্বারপ্রান্তে। পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার প্রায় শেষের পথে। এখন তাই যতটা সম্ভব উপভোগ করছেন।
এই উপভোগের বিষয়ে চোপড়ার ব্যাখ্যাটা কারও কারও ভালো লাগতে পারে। বিশেষ করে মধ্যবয়সে যাওয়ার আগে যাঁরা সাফল্য পেতে মরিয়া তাঁদের জন্য। চোপড়ার ভাষায়, ‘কেউ কেউ শেষ দিকেও সাফল্য পেতে পারেন। বয়স হওয়ায় হয়তো শারীরিক চ্যালেঞ্জটা বেশি, কিন্তু মাথা আরও তীক্ষ্ণ হয়। এটা সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে পারলে এবং বাকি প্রক্রিয়া তো তার জানাই, জ্যাক ক্যালিসের স্কুল থেকে এসেছে সে, অনেক ক্রিকেট খেলেছে, তাই জীবন এখন তাকে যে সুযোগ দিচ্ছে, সেটা সে নিতে পারছে।’
রিকি পন্টিংয়ের চোখে ‘সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার’ ক্যালিসের স্কুল থেকে আসার প্রসঙ্গে পরে বলা যাবে। আগে একটু জেনে নেওয়া যাক, এখনকার সাফল্যটা কেন শ্যাডলির জন্য বিশেষ কিছু।
শ্যাডলি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেছেন ২০২৪ সালের এপ্রিলে। এখন খেলেছেন ১৩টি ওয়ানডে ও ১৭টি টি–টুয়েন্টি। এই পেস অলরাউন্ডার সর্বশেষ টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ৪ ম্যাচ খেললেও কোনো উইকেট পাননি। কিন্তু এবার একদমই উল্টো অভিজ্ঞতা—দুই ম্যাচে ৮ উইকেট পাওয়ার পর অনুভূতিটা বলেছিলেন শ্যাডলি, ‘বাস্তব বলে মনে হচ্ছে না। স্বপ্ন মনে হয়। আমার ক্রিকেট–জীবনে সবচেয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হচ্ছে। খুব খুশি লাগছে না বললে মিথ্যা বলা হবে।’
জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান শ্যাডলি। সেটা অনেকটা হঠাৎ করেই।
সত্যিটা হলো শ্যাডলি এখন হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামে প্রচুর খুদে বার্তা পাচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, ‘জীবনে সম্ভবত এত বেশি বার্তা আমি কখনো পাইনি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রায় ৩৪০টি মেসেজ পেয়েছি, আর ইনস্টাগ্রামে ১০০টিরও বেশি বার্তা এসেছে—দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলোর অনেকগুলোরই এখনো জবাব দেওয়া হয়নি।’
সেসব খুদে বার্তার মধ্যে কিছু বার্তা দক্ষিণ আফ্রিকার টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান রিজা হেনড্রিকসের। দুজনে পুরোনো বন্ধু। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে তাঁদের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে। ভারত ও পাকিস্তানের মতো বড় দলের বিপক্ষে খেললেও শ্যাডলির কোনো ভয়ডর ছিল না। বাবার কাছে শিখেছেন, প্রতিপক্ষ কে দেখার দরকার নেই, বলটা দেখো আর খেলো। নিজের কাজটা করো।
যুক্তরাষ্ট্রে যে ক্রিকেট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে সেটাও জানালেন শ্যাডলি, ‘মানুষ যতটা ভাবে, যুক্তরাষ্ট্রে তার চেয়েও অনেক বেশি ক্রিকেট হয়। ধরুন, শুধু আমাদের লিগেই সিয়াটলে পাঁচটি ডিভিশন, প্রতি ডিভিশনে আটটি করে দল। সিয়াটল শহরের ১০ মাইলের মধ্যে পাঁচটি ক্রিকেট একাডেমি রয়েছে এবং প্রতিটি একাডেমিতে এই মুহূর্তে গড়ে প্রায় ১৭০ জন করে শিশু-কিশোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে—বয়স পাঁচ থেকে শুরু করে ১৯ বছর পর্যন্ত। দক্ষতার দিক থেকে বললে, এখানে উঠে আসা প্রতিভার সংখ্যা সত্যিই ভয় ধরানোর মতো।’
জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান শ্যাডলি। সেটা অনেকটা হঠাৎ করেই। যুক্তরাষ্ট্রের স্পিনার নসথুস কেনজিগে প্রশিক্ষণের জন্য ব্লুমফন্টেইনে গিয়েছিলেন। শ্যাডলি সেখানে তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ারে বড় একটা সময় কাটিয়েছেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ–সুবিধা নিয়ে কথা হয় দুজনের মধ্যে।
তখন মাইনর লিগের জন্য খেলোয়াড় খুঁজছিল যুক্তরাষ্ট্র ক্রিকেট। সেই সুযোগে দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকজন খেলোয়াড় চুক্তিবদ্ধ হন। শ্যাডলি চলে যান সিয়াটলে—যেটা তাঁর জন্মশহর কেপটাউনের মতোই। কেপটাউনের উইনবার্গ বয়েজ হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন জ্যাক ক্যালিস। শ্যাডলিও খেলেছেন এ স্কুলের হয়ে। ছোটবেলায় পাকিস্তান সফরেও গিয়েছেন এই স্কুলের হয়েই।
সময়ের ফেরে শ্যাডলি এখন যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। ৩৭ বছরের ১৮ বছরই গেল পেশাদার ক্রিকেটে। শ্যাডলি অবশ্য বয়স বা সময় নিয়ে ভাবতে চান না, ‘সত্যি বলতে আমি আজীবনই খেলতে চাই, কিন্তু জানি সেটা পারব না।’
এই বিশ্বকাপে শ্যাডলি এখন পর্যন্ত যা পেরেছেন, সেটাও তো কম না।