আইপিএল এখন ‘বড় ব্যবসা’, সমানে সমান লড়াই এখানে চলবে না: মুরালিধরন
ব্যাটিংয়ে রেকর্ড ভাঙছে নিয়মিত। বেধড়ক মার খাচ্ছেন র্যাঙ্কিংয়ে সেরা বোলার। আড়াই শ পেরিয়ে যাওয়া রানও তাড়ার সময় মনে হচ্ছে তুচ্ছ। চাইলে গতকাল রাতে মুম্বাই ইন্ডিয়ানস-সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ম্যাচের উদাহরণও দেওয়া যায়। এই ম্যাচে মুম্বাইয়ের ২৪৩ রান তাড়া করে সানরাইজার্স জিতেছে ৬ উইকেটে, ৮ বল হাতে রেখে। আইপিএল কি তাহলে শুধু ব্যাটসম্যানদের খেলা?
কেউ কেউ বলতে পারেন, এ নতুন কী! তবে হায়দরাবাদের স্পিন বোলিং কোচ মুত্তিয়া মুরালিধরন পুরোনো এ কথাই শুনিয়েছেন নতুন করে। সেটা অবশ্য বোলারদের জন্য রূঢ় বাস্তবতা। শ্রীলঙ্কান স্পিন কিংবদন্তির মতে, এখনকার দিনে বোলারদের ‘মেনে নিতে’ হবে যে তাঁরা মার খাবেন এবং খেলাটা এখন যেভাবে চলছে, তার সঙ্গেও মানিয়ে নিতে হবে।
হায়দরাবাদের জয়ের পর সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে কথা বলেন টেস্টে সর্বোচ্চ ৮০০ উইকেটশিকারি মুরালিধরন। সাবেক এই অফ স্পিনারের মুখেই শুনুন সেসব কথা, ‘বোলারদের জন্য পরিস্থিতি এখন খুব কঠিন। শুধু আমাদের দল নয়, সব দলেই এখন এমন ওপেনার আছে, যারা বল ভেতরে এল নাকি বাইরে গেল, তা নিয়ে ভাবে না; তারা স্রেফ বোলারদের ওপর চড়াও হচ্ছে। আমাদের সময়ে প্রথম ৬ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৪০-৫০ রানকে ভালো স্কোর ধরা হতো, এখন গড় রানই হচ্ছে ৭০-৮০।’
আইপিএলে ব্যাটে-বলের লড়াইয়ে তাহলে ভারসাম্য আসবে কীভাবে? মুরালিধরন এ নিয়ে বেশ বাস্তববাদী। টি-টুয়েন্টি সংস্করণের বাণিজ্যিক দিক এবং বিনোদনের চাহিদাকেই বড় করে দেখছেন তিনি। কিংবদন্তির ব্যাখ্যা, ‘চারপাশ থেকেই বল উড়ে সীমানার বাইরে যাচ্ছে, তাই বাউন্ডারি পিছিয়ে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না। আমরা যদি বোলারদের সহায়ক উইকেট বানাই, তবে দর্শকেরা একে বিরক্তিকর বলবেন। কারণ, টি-টোয়েন্টি যাঁরা দেখেন, তাঁরা বিনোদন চান, চার-ছক্কা দেখতে চান। আর সেভাবেই এই টুর্নামেন্ট সাজানো হয়েছে—অতিরিক্ত একজন ব্যাটসম্যান নামানোর সুযোগ (ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার) দেওয়া হয়েছে।’
মুরালিধরন আরও এক ধাপ এগিয়ে আইপিএল নিয়ে বলেন, ‘এটি এখন একটি বড় ব্যবসা, এখানে স্পনসরসহ অনেক কিছু জড়িত। (খেলার ধরন বদলে ফেললে) আপনি স্পনসর হারাবেন, মানুষের আগ্রহও কমে যাবে।’
তবে মুরালিধরন মনে করেন, ব্যাটসম্যানদের দাপটের এই ধারা অব্যাহত থাকবে এবং বোলাররা সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেবেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমার মনে হয় এটি চলতেই থাকবে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোলাররা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে, এতে কিছুটা সময় লাগবে।’
তরুণদের ভয়ডরহীন ব্যাটিংয়ের প্রসঙ্গে মুরালিধরন উদাহরণ দেন গতকাল ৩০ রানে অপরাজিত থাকা হায়দরাবাদের ব্যাটসম্যান সলিল অরোরার। যশপ্রীত বুমরাকে মারা সলিলের ‘নো-লুক’ ছক্কার উদাহরণ টেনে মুরালিধরন বলেন, ব্যাটারদের মানসিকতা আমূল বদলে গেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ১৩৪৭ উইকেটশিকারি মুরালিধরনের ভাষায়, ‘এখন একজন ভালো বোলারকেও ছক্কা হজম করতে হচ্ছে, এমনকি বুমরাকেও এক-দুই বলের মধ্যে সীমানার বাইরে পাঠানো হচ্ছে। অভিষেক শর্মা যেভাবে মারছে, অবিশ্বাস্য। কিন্তু সলিলের মতো তরুণ যখন বুমরার বলে ছক্কা মারে, তা বিস্ময়কর। আগে ভাবা হতো বুমরার মতো বোলারের সামনে একজন তরুণ কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করবে। কিন্তু এখন তা নয়; এখন তারা চিন্তা করে কীভাবে ছক্কা মারা যায়। তরুণদের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। কারণ, সবাই দেখিয়ে দিয়েছে আধুনিক ক্রিকেটটা এভাবে খেলতে হয়।’
বোলারদের জন্য মুরালিধরনের পরামর্শ, ‘বোলারদের আসলে খুব বেশি কিছু বলার নেই। তাদের প্রচুর অনুশীলন করতে হবে এবং যতটা সম্ভব নিখুঁত হতে হবে। কপালে থাকলে কোনো একদিন হয়তো ভালো করবেন। কিন্তু আবহাওয়া আর উইকেটের কন্ডিশনের কারণে ভালো বোলিং করেও অনেক সময় মার খেতে হতে পারে।’
আধুনিক ক্রিকেটের স্পিন বোলিং নিয়েও আক্ষেপ ঝরেছে মুরালিধরনের কণ্ঠে। খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁর বোলিংয়ে প্রচুর বাঁক ছিল। এখন এই দক্ষতা কারও মধ্যে তেমন একটা দেখেন না মুরালিধরন, ‘স্পিনাররা এখন বল না ঘুরিয়ে শুধু জোরে বল করার চেষ্টা করছে। তৃণমূল পর্যায়ে শেখানোর পদ্ধতিতে পরিবর্তন দরকার। ১০-১২ বছর বয়স থেকেই বল ঘোরানোর অভ্যাস করতে হবে। যদি বল না ঘোরে, তবে ব্যাটারদের কাছে সেটা থ্রো-ডাউন বোলারদের মতোই মনে হয় এবং তারা অনায়াসে লাইনে গিয়ে ছক্কা মারে।’
একসময় মুরালিধরন ও শেন ওয়ার্নকে নিয়ে বিতর্ক চলত—কে সেরা স্পিনার? টেস্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭০৮ উইকেট নেওয়া অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি ওয়ার্ন প্রয়াত হয়েছেন ২০২২ সালে। মুরালিধরনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এখন তিনি বা ওয়ার্ন খেললে কেমন করতেন?
কিংবদন্তির উত্তর, ‘আমরা বল ঘোরাতে পারতাম ঠিকই, কিন্তু খুব বড় কোনো প্রভাব হয়তো ফেলতে পারতাম না। হয়তো ১টি বা ২টি উইকেট পেতাম; কিন্তু উইকেট এতই ভালো যে ব্যাটসম্যানরা অনায়াসে আমাদের বলে ৪০ রান তুলে নিত। এখনকার দিনে কোনো দলকে ২০০ রানের নিচে আটকাতে আপনার দলে অন্তত তিন-চারজন এ ধরনের বোলার প্রয়োজন।’
২০০৮ সালে আইপিএলে প্রথম সংস্করণে ওয়ার্নের অধিনায়কত্বে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল রাজস্থান রয়্যালস। আইপিএলে তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের হয়ে খেলা মুরালিধরনও এ টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছেন চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে।
নিজের সময়ের পাওয়ার হিটিং ও এখনকার পাওয়ার হিটিংয়ের মধ্যে পার্থক্য দেখেন মুরালিধরন, ‘সেই সময়ে পাওয়ার হিটিং এখনকার মতো এত বিধ্বংসী ছিল না। যখন বোলিং করতাম, ৬০-এর বেশি ম্যাচের মধ্যে হয়তো মাত্র দুবার আমাকে মার খেতে হয়েছে, মানে ৪০-এর বেশি রান দিয়েছি। শেন ওয়ার্নের ক্ষেত্রেও তা–ই। অথচ আজকালকার দিনে একজন স্পিনারের জন্য ৫০ রান দেওয়া কোনো ব্যাপারই না, আর কেউ ৪০ রান দিলে বলা হয় সে খুব ভালো বোলিং করেছে। খেলাটা বদলে গেছে, তাই দুই যুগের তুলনা চলে না।’