জয়ের জন্য ৩৪২ রানের লক্ষ্যে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ৩ উইকেটে ২২২ রানে চতুর্থ দিন শেষ করেছিল পাকিস্তান। শেষ দিনে হাতে ৭ উইকেট নিয়ে পাকিস্তান তখনো ১২০ রানের দূরত্বে। এই পরিস্থিতিতে শেষ দিনে পাকিস্তানের সামনে হিসেবটা ছিল পরিষ্কার। অপরাজিত দুই ব্যাটসম্যান আবদুল্লাহ শফিক ও মোহাম্মদ রিজওয়ানকে আজ সকালের সেশনে যতটা সম্ভব টিকে থাকতে হবে। যত দূর সম্ভব এগিয়ে দিতে হবে দলকে।

কারণ, এই জুটি দ্রুত ভাঙলে পাকিস্তান চাপে পড়ত। পরের দুই ব্যাটসম্যান আগা সালমান ও মোহাম্মদ নওয়াজের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা যে মাত্র চার টেস্টের! এর মধ্যে আগা অভিষেক হলো এ ম্যাচে। গলে চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের নজির গড়তে আবদুল্লাহ-রিজওয়ানকে জুটিকে তাই চওড়া ব্যাটেই লড়তে হতো।

default-image

গলের ইতিহাসের একটি পাতা অবশ্য পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। এ মাঠে এর আগে চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ ৩০০ রান করেছে এই পাকিস্তানই। আর আজ সে মাঠেই চতুর্থ ইনিংসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড নতুন করে লিখিয়ে ৪ উইকেটে জিতল পাকিস্তান। আগের দিন শতক তুলে নেওয়া ওপেনার আবদুল্লাহ শফিক এক প্রান্ত ‘কচ্ছপ-কামড়’ দিয়ে ধরে রাখায় চতুর্থ দিন শেষে মানসিকভাবে কিছুটা এগিয়ে ছিল পাকিস্তানই।

আবদুল্লাহ-রিজওয়ান সকালের সেশনে ১৭.১ ওভারে উইকেটে কাটিয়ে সব মিলিয়ে ১৪৬ বলে ৭১ রানের জুটি উপহার দেওয়ায় কাজটা আরও সহজ হয়ে যায় পাকিস্তানের জন্য। ৭৪ বলে মহামূল্য ৪০ রান করা রিজওয়ান ১০৩.১ ওভারে প্রবাত জয়াসুরিয়ার বলে আউট হয়ে যখন ফিরছিলেন, জয় থেকে মাত্র ৬৬ রানের দূরত্বে ছিল পাকিস্তান। আর আবদুল্লাহ ততক্ষণে পাকিস্তানের জয়ের পথে ‘অতিমানব’ হয়ে ওঠার পাণ্ডুলিপি লেখার প্রায় শেষভাগে।

এরপর পাকিস্তান আরও দুই উইকেট হারায়। আগা সালমানের পর হাসান আলীও ফিরে যাওয়ায় খানিকটা অনিশ্চয়তা ভর করেছিল বৈকি। হাতে ৪ উইকেট রেখে জয় থেকে তখন মাত্র ৩৯ রানের দূরত্বে পাকিস্তান।

আবদুল্লাহ শফিক এক প্রান্ত ধরে রাখায় পাকিস্তান ভক্তদের মনে তখনো হয়তো কোনো অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু লঙ্কানদের মনে আশা জেগে উঠেছিল। এই তো টেস্ট ক্রিকেটের রোমাঞ্চ! ১২৭.২ ওভারে রান তাড়া করে তুলে নেওয়া জয়ের সে রোমাঞ্চে পাকিস্তান লেটার মার্কস পাবে।

default-image

বাবর আজমের এই দলটা আর যাই হোক, চিরায়ত সেই ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ (অননুমেয়) পাকিস্তান যে নয়—এ কথার পক্ষে দাঁড়াবেন অনেকেই। গল বরাবরই স্পিনারদের স্বর্গ। সেখানে ‘পঞ্চম দিনে স্পিন-ঈশ্বরের সামনে নিজেকে কোরবানি দিতে হয়’—এমন একটা কথাও প্রচলিত আছে। মহেশ থিকসানা, জয়াসুরিয়া, রমেশ মেন্ডিসরা কাল থেকেই বড় বড় বাঁক ও বাউন্স পেয়েছেন।

কিন্তু কখনো মনে হয়নি পাকিস্তান তাঁদের দ্বিতীয় ইনিংসে এক-একটি উইকেট হারানোর পর বড় কোনো অনিশ্চয়তা ভর করতে পারে। মারকুটে হাসান আলী (৪ বলে ৫) বাদে প্রতিটি ব্যাটসম্যান উইকেট পড়ার পর আবার নতুন করে শুরু করেছেন ব্যাটসম্যানরা। দৃঢ়তা ও ধৈর্য—এই দুইয়ের সম্মিলনেই গলে ইতিহাস গড়েই জিতল পাকিস্তান।

আর সেই ইতিহাস গড়ায় ভাস্বর হয়ে থাকবে আবদুল্লাহ শফিকের নাম। গত বছর নভেম্বরে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে অভিষিক্ত এই ওপেনারের ক্যারিয়ার মাত্র ৬ টেস্টের। অথচ ২২ বছর বয়সেই কতটা পরিণত! গলের ঘূর্ণি ফাঁদের বাইশ গজে চতুর্থ ইনিংসে ম্যাচ জেতানো ৪০৮ বলে অপরাজিত ১৬০ রানের অপরাজিত ইনিংস। ১ ছক্কা ও মাত্র ৬টি চারের মারে ধৈর্যটা টের পাওয়া যায়।

ইনিংসটি দেখে থাকলে যে কেউ বলবেন, প্রতিটি বলের মেধা ও গুণাগুণ যাচাই করে খেলার পুরস্কার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর উইকেটে কাটিয়ে দেওয়া দেখে মনে হতে পারে, আবদুল্লাহ যেন জনম-জনম ধরেই টেস্ট ক্রিকেট খেলছেন!

সত্যি বলতে, বিরুদ্ধ-স্রোতেই যেন আবদুল্লাহর ব্যাট আরও বেশি চওড়া হয়ে ওঠে। টেস্টে ক্যারিয়ারে তাঁর দুটি শতকই পাকিস্তানের দ্বিতীয় ইনিংসে। দলের দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর ব্যাটিং গড় এক শ-র বেশি। গলের ইতিহাসে চতুর্থ ইনিংসে এর আগে শতকই ছিল মাত্র তিনটি। এর মধ্যে শুধু দিমুথ করুণারত্নে শতকসহ ম্যাচ জিতিয়েছেন। আবদুল্লাহ তাঁর পাশে বসলেন।

default-image

শ্রীলঙ্কার আশা যে একদম ছিল না, তা নয়। সকালের সেশনে দ্রুত কয়েকটি উইকেট নিতে পারলে পাল্টে যেত ম্যাচের মোড়। মোট ৪ উইকেট নেওয়া জয়াসুরিয়া সকালে ২টি তুলে নিলেও কাজ হয়নি। ওই যে সকালের শুরুতেই মড়ক লাগতে দেয়নি পাকিস্তান। আর শ্রীলঙ্কার ফিল্ডাররাও স্পিনে ব্যাটসম্যানরা প্রতিবার ‘বিট’ হওয়ার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। এর মধ্যেই টেস্ট অভিষিক্ত আগা সালমান এসে ৩৫ বল খেলে ফেলেন। তাঁর ১২ রানের ইনিংসটি এই অর্থে মূল্যবান—১১৩.৩ তম ওভারে জয়াসুরিয়ার বলে তিনি আউট হওয়ার পরই মধ্যাহ্নভোজ বিরতিতে যায় দুই দল। জয় থেকে পাকিস্তান তখন মাত্র ৪৪ রানের দূরত্বে। হাতে ৫ উইকেট এবং এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবদুল্লাহ শফিক।

কাল চতুর্থ দিনের খেলা শেষে আজহার আলী বলেছিলেন, ‘শেষ দিনে একটি জুটি দাঁড়ালেই কাজ হয়ে যাবে।’ আবদুল্লাহ ও রিজওয়ানের জুটি শেষ দিনে ১২০ রানের লক্ষ্যে নেমে অর্ধেক পথ (৬৬ রানের দূরত্ব) পর্যন্ত এগিয়ে দেওয়ার পরও বিপদ হতে পারত পাকিস্তানের। বিশেষ করে ধনঞ্জয়া ডি সিলভাকে ছক্কা মারতে গিয়ে হাসান আলী দ্বিতীয় সেশনে দ্বিতীয় ওভারে আউট হওয়ার পর। মোহাম্মদ নওয়াজ এসে ঠান্ডা মাথায় আবদুল্লাহকে সঙ্গ দেওয়ায় শ্রীলঙ্কার আশা শেষ হয়ে যায়।

তবে আবদুল্লাহর ক্যাচ ছাড়ায় শ্রীলঙ্কার দীর্ঘশ্বাস আরও লম্বা হবে। ১২২.৫ ওভারে ধনঞ্জয়ার বলে ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল তাঁর। স্লগ সু্ইপ করতে গিয়ে মিডউইকেটে ক্যাচ তুলেছিলেন। পাকিস্তান তখন জয় থেকে ১৮ রানের দূরত্বে, হাতে ৪ উইকেট আর আবদুল্লাহ ছাড়া পাকিস্তানের স্বীকৃত কোনো ব্যাটসম্যান নেই। এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কি না হাতের মধ্যে পড়া ক্যাচটা কাসুন রাজিতা নিতে পারলেন না! জয়টাই যেন হাত ফসকে ফেলে দিলেন! কারণ, আবদুল্লাহ তখন আউট হলে পরে কী ঘটত কিছুই বলা যায় না। ভালোভাবেই ম্যাচে ফিরে আসত শ্রীলঙ্কা।

কিন্তু সুযোগটি হাতছাড়া করার পর মাঠে লঙ্কানদের শরীরী ভাষা প্রায় পড়ে যায়। নওয়াজ ও আবদুল্লাহ মিলে বাকিটা পথ ভালোভাবেই পাড়ি দেন। সপ্তম উইকেটে ৭৮ বলে দুজনের অবিচ্ছিন্ন ৩৯ রানের জুটিটি পাকিস্তানের ঐতিহাসিক এই জয়ে দৃঢ়তার শেষ উদাহরণ হয়ে থাকবে, যেখানে নওয়াজের ৩৪ বলে ১৯ রানের ইনিংসটির দাম টাকায় বিচার করা অসম্ভব।

বৃষ্টি এর মধ্যে রসিকতাও করেছে। পাকিস্তান জয় থেকে ১১ রান দূরে থাকতে বৃষ্টির কারণে খেলা আধা ঘণ্টার বেশি সময় বন্ধ ছিল। খেলা পুনরায় শুরুর পর শ্রীলঙ্কার হার ছিল শুধুই সময়ের ব্যাপার। পাকিস্তানের দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট নেন লঙ্কান স্পিনার জয়াসুরিয়া। দুই টেস্টের সিরিজে ১–০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল পাকিস্তান। রোববার গলেই সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন