২০২১ সালে আট বছর পর বাংলাদেশকে দেশে পেয়ে জিম্বাবুয়েও তো হয়তো এ্ই আশায় বুক বেঁধেছিল। এরপর কী হয়েছিল, তা আপনার মনে আছে বলেই অনুমান করি। বাংলাদেশে খেলা আর জিম্বাবুয়েতে খেলাকে এক বানিয়ে দিয়ে এবারও বাংলাদেশের ৩–০তে জয়। সব মিলিয়ে সর্বশেষ ১৯ ম্যাচ ধরলে অবিশ্বাস্য এক স্কোরলাইন—বাংলাদেশ ১৯: জিম্বাবুয়ে ০।

এই প্রেক্ষাপট মাথায় না রাখলে ২০২২ সালের ৫ আগস্ট হারারেতে জিম্বাবুয়ের এই জয়ের তাৎপর্য বোঝা যাবে না। পুরোপুরি বুঝতে আরও কিছু তথ্য যোগ করে নিতে পারেন। মাঝের নয় বছরে ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার পার্থক্য বাড়তে বাড়তে তা দুই দেশের ভৌগোলিক দূরত্বকে বলতে গেলে ছুঁয়েই ফেলেছে। যেটির সবচেয়ে প্রমাণ হয়ে এসেছে ২০১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ের কোয়ালিফাই করতে না পারা। অথচ ১৯৮৩ থেকে শুরু করে এরপর টানা ৯টি বিশ্বকাপ খেলেছে জিম্বাবুয়ে। ১৯৮৩ বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিয়েছে, ১৯৯২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে। অথচ জিম্বাবুয়ে তখনো টেস্ট স্ট্যাটাসই পায়নি। যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অভিষেক, সেই ১৯৯৯ বিশ্বকাপেও তো ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পরাশক্তিকে হারানোর কীর্তি আছে জিম্বাবুয়ের।

সেসব যদি আপসেট হয়ে থাকে, হারারেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের সর্বশেষ জয়টাও তা–ই। জিম্বাবুয়েতে যাওয়ার আগে টানা ৫টি ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছে, ক্যারিবিয়ানে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ওয়ানডে সুপার লিগে বাংলাদেশের ওপরে যেখানে শুধু্ই ইংল্যান্ড, ১৩ দলের পয়েন্ট টেবিলে জিম্বাবুয়ে শুধু নেদারল্যান্ডসেরই ওপরে। এই সিরিজ যেহেতু সুপার লিগের অংশ নয়, এটিকে পয়েন্ট টেবিলের ২ আর ১২ নম্বরের লড়াই না বলে ‘৭ আর ১৫ নম্বরের লড়াই’ বলাই ভালো। তা এই ‘৭ আর ১৫’টা কী?

আইসিসি ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের অবস্থান। যে র‌্যাঙ্কিংয়ে নেদারল্যান্ডস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডেরও নিচে জিম্বাবুয়ে। র‌্যাঙ্কিংয়ের এই ব্যবধান দুই দলের কাগজে–কলমের শক্তি সম্পর্কে কিছুটা বলে। হ্যাঁ, কিছুটাই বলে, পুরোটা নয়। শুধু এই সিরিজটা ধরলে জিম্বাবুয়ে তো আরও হীনবল। সর্বশেষ সিরিজের অধিনায়ক ক্রেইগ আরভিন নেই, নেই জিম্বাবুয়ের এই প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী অলরাউন্ডার শন উইলিয়ামস। চোটের কারণে দর্শক দলের মূল দুই পেস বোলার মুজারাবানি ও চাতারাও। এই দল নিয়ে র‌্যাঙ্কিংয়ে সাত ধাপ ওপরের এক দল এবং ১৯–০ বিভীষিকাকে হারিয়ে এই জয়ের পর জিম্বাবুয়ে আনন্দে ভেসে যাওয়াই স্বাভাবিক।

সেই আনন্দ সবচেয়ে মূর্ত হয়েছে বাতাসে ছুড়ে দেওয়া সিকান্দার রাজার মুষ্টিবদ্ধ হাত ও গগনবিদারী চিৎকারে। ছক্কা মেরে জয়ের পর উদ্‌যাপনটা এমনিতেই একটু উন্মাতাল হয়। এখানে তো কারণ ছিল আরও। ক্যারিয়ারের প্রথম তিন ম্যাচের দুটিতেই বাংলাদেশের বিপক্ষে জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন। যা তাঁর মনে আছে কি না, এ নিয়ে সংশয়ের কথা তো আগেই বলেছি। মাঝখানে বাংলাদেশের বিপক্ষে যে টানা ১৯ পরাজয়, তার ১৬টিতেই ছিলেন সিকান্দার রাজা। এই জয় তাঁর চেয়ে মধুর লাগবে আর কার!

পরাজয়ে পরাজয়ে সিকান্দার রাজার ৩৩৭৬ দিন আগের সেই জয়ের স্মৃতি ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যদি কথা হয়, তাহলে উল্টোটাই বা নয় কেন! তামিম ইকবাল, মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহিমের কি মনে ছিল জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ সেই পরাজয়ের স্মৃতি? প্রথম দুজন যদি ভুলেও গিয়ে থাকেন, মুশফিকুর রহিমের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা দেখছি না। সেই ম্যাচে মুশফিকই ছিলেন বাংলাদেশের অধিনায়ক। টানা দ্বিতীয় পরাজয়ে সিরিজে হার তাঁর মনে এমনই লেগেছিল যে, সংবাদ সম্মেলনে এসে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বসেন। আবেগতাড়িত সেই সিদ্ধান্ত থেকে পরে সরে আসেন মুশফিক, কিন্তু বুলাওয়ের সেই রাত কি আর তাঁর ভোলার কথা!