হাসান মাহমুদ, আপনাকে মনে থাকবে
সময়টা একটু এগিয়ে দেওয়া যাক, ১০ বছর? কিংবা আরেকটু বেশি…!
হুট করে আপনার মনে হলো, একটু স্মৃতি হাতড়ে ফেরা যাক। তা করতে করতেই আপনি ডারউইন টেস্টে। কী মনে পড়বে তখন? ম্যাচটা দেখে থাকলে হয় তো অনেক কিছুই—মেহেদী হাসান মিরাজ কীভাবে স্টিভ স্মিথের ক্যাচটা নিলেন, তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরির পর লাফিয়ে ওঠা উদ্যাপন অথবা হয়তো মুমিনুল হকের চারে ম্যাচ জেতার ওই মুহূর্ত।
কিন্তু না দেখলে সবার আগে যাঁর কথাটা মাথায় আসবে, তিনি হাসান মাহমুদ। কারণ, তাঁর নামটাই যে ম্যাচসেরা হিসেবে লেখা। দুই হাত তুলে হাসানের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার মুহূর্তটা ম্যাচটা দেখে থাকলে মনে পড়ার কথা আরও বেশি।
এত বছরে হয়তো আপনি জেনে গেছেন হাসান মাহমুদ কোথায় থেমেছেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় যখন প্রথম ৫ উইকেট পেলেন, তখন তাঁর স্বপ্ন ছিল টেস্টে চার শ থেকে পাঁচ শ উইকেট নেওয়া। কথাটা শুনে কেউ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলে তাঁকে দায় দেওয়ার সুযোগ নেই খুব একটা। বাংলাদেশের কোনো পেসার যে এক শ উইকেটই পাননি এখনো!
হাসান চার শ-পাঁচ শ উইকেট পাবেন কি না, সে উত্তর এখনো সময়ের হাতে। না পাওয়ার সম্ভাবনার বাজির দরই হয়তো ৯৯ বনাম ১। কিন্তু এটুকু আপনাকে নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায়, হাসান মনেপ্রাণে চান বলেই কথাটা বলেছেন। হেঁয়ালি কিংবা বলার জন্য নয়; তিনি তেমন মানুষই নন।
হাসানের চার শ উইকেট নেওয়ার কথাটা বলা কারও কারও মনে ঔদ্ধত্যে ভরা একটা ছেলের ছবিও হয়তো এঁকে দিতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, হাসান তেমন কেউ নন। ব্যাটসম্যানদের মন খারাপ হবে বলে তিনি তো উদ্যাপনই করতে চান না!
এখন তাঁর ইংরেজি সাক্ষাৎকার দেখে যতই সবাই মুগ্ধ হোক, হাসান আসলে খুব মৃদুভাষী। অল্প অল্প কথা বলেন খুবই ধীরেসুস্থে। গুছিয়ে বলতে পারেন, ক্রিকেটের বোধটাও প্রবল বলেই হয়তো তাঁর সেসব কথাও মন দিয়ে শুনতে ইচ্ছা করে।
ম্যাচ থাকলে ক্রিকেটারদের কাউকে কাউকে হাজির হতে হয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে। হাসান যেদিন আসেন, বড় কোনো শিরোনাম না পাওয়া গেলেও লেখার উপজীব্যের অভাব হয় না। চমকপ্রদ কথা তিনি না-ই বলতে পারেন, কিন্তু তাঁর কথায় খেলার গল্প থাকে খুব ভালোভাবে।
হাসানের ক্যারিয়ারের গতিপথটাও বোধ হয় তাঁর মতো। ধীরলয়ে আপন পথ খুঁজে নেওয়া। এখন শুনলে কেমন-কেমন মনে হয়, কিন্তু তাঁকে একসময় সাদা বলের বোলারই ভেবে নিয়েছিলেন অনেকে। ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুটাও কিন্তু হয়েছিল টি-টুয়েন্টি দিয়েই। এরপর ওয়ানডেও খেলে ফেলেছিলেন বছরখানেকের মাথায়।
তখন বলে গতি ছিল, ইয়র্কার মারতে পারতেন ভালো, সঙ্গে তখন ছিল চোটের শঙ্কাও। কিন্তু সময়ের সঙ্গে হাসান পথ খুঁজে নিয়েছেন তাঁর। রঙিন পোশাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের চার বছর পর পা রেখেছিলেন টেস্টে। সেটিও এর চোট, সে খেলবে না; এমন অনেক সমীকরণ মিলিয়ে।
এখন হাসানের সবকিছুই যেন টেস্ট। দুই দিকে সুইং করাতে পারেন, লেংথের মারপ্যাঁচটা বুঝে যান অল্পতে, খেলতে যান কাউন্টিতেও—লাল বলটাই এখন তাঁর ভীষণ প্রিয়। ওই পথে চোট আসে, তা জয় করে ফিরে আসেন হয়তো লাল বলটা আবার হাতে নেবেন বলেই।
হাসান এখন লাল বল হাতে নিয়ে কী করতে পারেন, ওই গল্পটা তো পুরো পৃথিবীতেই চর্চা হচ্ছে। পাকিস্তান ও ভারতে ৫ উইকেট পাওয়ার পর তাঁর গলার স্বরের মতোই অল্প অল্প করে শুরু হওয়া আলোচনাটা অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যানদের ড্রেসিংরুমের পথ দেখিয়ে বেশ জোরালো।
হাসানের গল্প কোথায় গিয়ে থামবে, কে জানে। কিন্তু কেউ চাইলে ডারউইন টেস্টের পর বলেই দিতে পারেন, হাসান, আপনাকে মনে থাকবে। সবাই ভুলে গেলেও ম্যাচের স্কোরকার্ডে তো লেখাই থাকবে—অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশ যখন প্রথমবার হারিয়েছে, তখন ম্যাচসেরা ছিলেন হাসান মাহমুদ নামের এক পেসার।