আইসিসির নতুন নিয়মে বিপদে বাংলাদেশ: ব্যাটিংয়ে ধস, বোলিংয়ে লাগামহীন রান
সুইং বাড়ছে, কিন্তু উইকেটপ্রতি রান খরচ কমছে না; উল্টো বাড়ছে। ওভারপ্রতি রান দেওয়ার হারও ঊর্ধ্বমুখী। ব্যাটসম্যানদের অবস্থাও তথৈবচ। ইনিংসের শেষ দিকে রান তোলার গতি কমে যাচ্ছে। অথচ একই নিয়মের সুবিধা নিয়ে অন্য অনেক দল বোলিংয়ে সাফল্য পাচ্ছে, ব্যাটিংয়েও খুঁজে নিচ্ছে নতুন পথ।
ওয়ানডে ক্রিকেটে আইসিসির নতুন নিয়ম বাংলাদেশের সামনে যেন এক অদ্ভুত ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বোলাররা বল সুইং করাতে পারছেন বেশি, কিন্তু সেটিকে উইকেট কিংবা কম রান দেওয়ার সাফল্যে রূপ দিতে পারছেন না। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের রিভার্স সুইং সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন ব্যাটসম্যানরা।
এই ধাঁধার সর্বশেষ নমুনা দেখা গেছে গত শনিবার আবুধাবিতে। ত্রিদেশীয় সিরিজে জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। প্রথমে ব্যাট করে জিম্বাবুয়ে তুলেছিল ৮ উইকেটে ২৭১ রান। জবাবে বাংলাদেশের ইনিংস থেমেছে ৩৪ ওভারের মধ্যেই, ১৭২ রানে।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তাসকিন আহমেদও হারের কারণ হিসেবে ব্যাটিং–ব্যর্থতার কথাই বলেছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, বোলিংয়ে কিছুটা ধারাবাহিকতা এলেও ব্যাটিংয়ে নিয়মিতই ভুল করছে বাংলাদেশ।
জিম্বাবুয়ের কাছে হেরে যাওয়া ম্যাচে বোলিংয়ে সেরা পারফরম্যান্সটি ছিল তাসকিনেরই। ১০ ওভারে ৪৪ রানে ৩ উইকেট। তবে একটু গভীরে গেলে ধরা পড়বে আরেকটি সত্য। তাসকিন সে দিন শুরুতেই শুধু ভালো বোলিং করেছেন, শেষে রান বিলিয়েছেন। নতুন বলে প্রথম স্পেলে ৬ ওভার বোলিং করে ২ মেডেনসহ মাত্র ১৮ রান দিয়েছিলেন, নিয়েছিলেন ৩ উইকেটও।
অথচ ডেথ ওভারে তাঁর করা দুই ওভারে এসেছে ১৯ রান। এক ওভারে ১০, অন্যটিতে ৯। উইকেট পাননি একটিও।
শুধু তাসকিন নন, সে দিন ডেথ ওভারে রান দিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমানও। কাটার মাস্টার খ্যাত এ বোলার ডেথে তিন ওভার বল করে দিয়েছিলেন ২৪ রান, উইকেটশূন্য। অথচ, ম্যাচের ওই সময়টাতেই তাঁর সবচেয়ে ভালো বোলিং করার কথা।
কেন?
উত্তর খুঁজতে যেতে হবে গত বছরের জুলাইয়ে। তখন ওয়ানডে ক্রিকেটে সাদা বল ব্যবহারের নিয়মে পরিবর্তন আনে আইসিসি।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইনিংসের প্রথম ৩৪ ওভার দুই প্রান্ত থেকে দুটি আলাদা বল ব্যবহার করা হয়। এরপর অধিনায়ক সেই দুটি বলের একটি বেছে নিতে পারেন। বাকি ১৬ ওভার খেলা হয় নির্বাচিত বলটি দিয়ে।
সাধারণত অধিনায়কেরা অপেক্ষাকৃত পুরোনো ও খসখসে বলটিই বেছে নেন। কারণ, এমন বল রিভার্স সুইং করানোর জন্য বেশি উপযোগী।
ক্রিকেটের তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণকারী সংস্থা ক্রিকভিজের পর্যবেক্ষণ বলছে, এ নিয়ম চালুর পর ওয়ানডে ক্রিকেটে রিভার্স সুইং যেন নতুন জীবন পেয়েছে। ইনিংসের শেষ দিকে পেসাররা আগের চেয়ে বেশি সুইং পাচ্ছেন। ফলে ব্যাটসম্যানদের জন্য রান তোলা কঠিন হয়ে উঠছে।
অনেক দলই এই পরিবর্তনের সুফল পেতে শুরু করেছে। কেউ বোলিংয়ে ভালো করছে, কেউ ব্যাটিংয়ের কৌশল বদলে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। আবার কিছু দলের বোলাররা সফল হলেও ব্যাটসম্যানরা ভুগছেন।
দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশ ভুগছে দুটিতেই। শেষ দিকে ব্যাটসম্যানদের রান তোলার হার কমেছে, আবার বোলাররা সুইং পেলেও রান সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, বেড়ে যাচ্ছে তাদের বোলিং গড় ও ইকোনমিও।
সুইংয়ে এগিয়ে মোস্তাফিজ–তাসকিন, সাফল্যে পিছিয়ে
নতুন নিয়ম চালুর পর ডেথ ওভারে বল সুইং করানোর পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, এমন পেসারদের প্রথম চারজনের মধ্যে আছেন বাংলাদেশের দুজন—মোস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদ।
মোস্তাফিজের বোলিংয়ে সুইং বেড়েছে ৪৯.৫ শতাংশ। শুনতে দারুণ লাগার কথা। কিন্তু পরের দুটি পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, বাড়তি সুইং তাঁর জন্য বাড়তি সাফল্য নিয়ে আসেনি।
ডেথ ওভারে মোস্তাফিজের বোলিং গড় কমার বদলে বেড়েছে ৫.৩। ইকোনমি রেটও বেড়েছে ০.৯। অর্থাৎ বল বেশি সুইং করালেও উইকেট পেতে আগের চেয়ে বেশি রান খরচ করছেন। ওভারপ্রতি রানও দিচ্ছেন বেশি।
তাসকিনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। তাঁর বলের সুইং বেড়েছে ৪০.৮ শতাংশ। অথচ বোলিং গড় বেড়েছে ১.৯, ইকোনমি রেট ১.৬।
অন্য দেশের পেসারদের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের দুই পেসার কতটা ব্যতিক্রম।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের আলজারি জোসেফের সুইং বেড়েছে ৮৩.৬ শতাংশ। তাঁর বোলিং গড় কমেছে ৬.৭, যদিও ইকোনমি অপরিবর্তিত। দক্ষিণ আফ্রিকার লুঙ্গি এনগিডির সুইং বেড়েছে ৬৩.৩ শতাংশ। তাঁর বোলিং গড় কমেছে ১০.৬, ইকোনমি কমেছে ৩.৩।
যুক্তি দেওয়া যেতে পারে, আলজারি ও এনগিডির সুইং তো মোস্তাফিজ–তাসকিনদের চেয়ে বেশি বেড়েছে। তাই তাঁরা বেশি সফল।
কিন্তু পাকিস্তানের নাসিম শাহর পরিসংখ্যান সেই যুক্তিও দুর্বল করে দেয়। তাঁর সুইং বেড়েছে ৩৮ শতাংশ, অর্থাৎ দুই বাংলাদেশি পেসারের চেয়েও কম। অথচ নাসিমের বোলিং গড় কমেছে ১৯.২, ইকোনমি কমেছে ১.৬।
আবার অস্ট্রেলিয়ার নাথান এলিসের সুইং কমেছে ৩৯.৯ শতাংশ, অথচ বোলিং গড় কমেছে ৬১। তাঁর ইকোনমি অপরিবর্তিত।
অর্থাৎ শুধু বল সুইং করাতে পারলেই হচ্ছে না। সেই সুইংকে কাজে লাগিয়ে রান আটকানো ও উইকেট নেওয়ার দক্ষতাও জরুরি। আর ঠিক এ জায়গাতেই পিছিয়ে মোস্তাফিজ–তাসকিনরা।
ব্যাটিংয়ে আরও বড় দুশ্চিন্তা
বোলারদের এই বিপরীতমুখী পরিসংখ্যানই বাংলাদেশের একমাত্র দুশ্চিন্তা নয়। ব্যাটিংয়ের ছবিটা বরং আরও উদ্বেগজনক।
ওয়ানডে ক্রিকেটে ইনিংসের শেষ ১০ ওভারকে সাধারণত রান তোলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে ধরা হয়। হাতে উইকেট থাকলে এই সময়েই বড় শট খেলে সংগ্রহটা বড় করার চেষ্টা করেন ব্যাটসম্যানরা।
কিন্তু পুরোনো বলে রিভার্স সুইং ও শেষ মুহূর্তের মুভমেন্ট বাড়ায় সেই কাজ এখন কঠিন হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য তো আরও বেশি।
নতুন নিয়ম চালুর আগে ডেথ ওভারে বাংলাদেশের রানরেট ছিল ৭.৮৪। অর্থাৎ শেষ ১০ ওভারে গড়ে প্রায় ৭৮ রান তুলত বাংলাদেশ।
নিয়ম পরিবর্তনের পর সেই রানরেট নেমে এসেছে ৬.৫৬-তে। অর্থাৎ শেষ ১০ ওভারে এখন গড়ে প্রায় ৬৬ রান। ওভারপ্রতি রান কমেছে ১.২৮।
যে বাংলাদেশ এমনিতেই পাওয়ার হিটিংয়ে পিছিয়ে, তাদের জন্য এই পতন বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
আরও উদ্বেগের বিষয়, ডেথ ওভারে রানরেট সবচেয়ে বেশি কমেছে—এমন দলগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ চতুর্থ। বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কমেছে শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের রানরেট ১০.৩১ থেকে নেমেছে ৭.৯২-তে। কমেছে ২.৩৯। নিউজিল্যান্ডের কমেছে ১.৬৮, অস্ট্রেলিয়ার ১.৪৭।
তবে সব দলের অবস্থা যে এমন, তা নয়।
ভারতের রানরেট উল্টো ৬.৯৯ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮.৩৩। অর্থাৎ ওভারপ্রতি ১.৩৪ রান বেশি তুলছে তারা। ইংল্যান্ডের রানরেট ৮.০৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯.১৬।
অর্থাৎ একই নিয়মে কেউ রান তোলার নতুন রাস্তা খুঁজে পাচ্ছে, কেউ পুরোনো কৌশলেই আটকে থাকছে। বাংলাদেশ আপাতত দ্বিতীয় দলেই।
২০২৭ বিশ্বকাপে কী অপেক্ষা করছে
আইসিসির এই নিয়ম নিয়ে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তার আরেকটি বড় কারণ ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ।
আগামী বছরের অক্টোবর ও নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় হবে বিশ্বকাপ। হাতে এখনো প্রায় এক বছর সময়। কিন্তু নতুন নিয়মের প্রভাব যে বিশ্বকাপে দলগুলোর ব্যাটিং ও বোলিং কৌশলে বড় পরিবর্তন আনতে পারে, তার ইঙ্গিত এরই মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার কন্ডিশনে রিভার্স সুইং বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যদিও এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। কারণ, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নতুন নিয়ম চালুর পর দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে মাত্র তিনটি ওয়ানডে হয়েছে। ফলে নিয়মটির প্রভাব বিচার করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো নেই।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটের স্বাভাবিক চরিত্রের কথাও মাথায় রাখতে হবে। দেশটির কন্ডিশনে ইনিংসের শেষ দিকে বল এমনিতেই অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি সুইং ও মুভ করে। বাউন্সও থাকে বেশি।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দক্ষিণ আফ্রিকার মাঠে ডেথ ওভারে ওভারপ্রতি গড়ে ৭.৩৫ রান উঠেছে। অর্থাৎ শেষ দিকে রান তোলার সুযোগও ছিল যথেষ্ট।
কিন্তু পুরোনো বলের রিভার্স সুইং যদি আরও কার্যকর হয়ে ওঠে, তাহলে সেই হিসাব বদলে যেতে পারে। বাউন্সের সঙ্গে রিভার্স সুইং যোগ হলে শেষ ১০ ওভারে বড় শট খেলা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে ব্যাটসম্যানদের জন্য।
সে ক্ষেত্রে ব্যাটিংয়ের কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হবে। শেষ ১০ ওভারে ঝড় তোলার অপেক্ষায় না থেকে ইনিংসের মাঝের ওভারগুলোতেই রান তোলার গতি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে ২০ থেকে ৪০ ওভারের মধ্যে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নতুন নিয়মে শেষ দিকে রান তোলার গতি কমছে, আবার বল হাতে সেই সময়টায় প্রতিপক্ষের রানও আটকাতে পারছেন না পেসাররা।
একদিকে মোস্তাফিজ–তাসকিনদের বাড়তি সুইংকে কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করতে হবে। অন্যদিকে ব্যাটসম্যানদের শিখতে হবে পুরোনো বলের রিভার্স সুইং সামলে রান তোলার নতুন কৌশল।
২০২৭ বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের হাতে সময় আছে এক বছর। প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সময়কে কি কাজে লাগাতে পারবে বাংলাদেশ?