‘ক্রিকেটারদের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করছি, খারাপ খেললে ওই টাকা ফেরত চাচ্ছি নাকি’
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে এবার বাংলাদেশ খেলবে কি না, তা এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। ভারতে খেলতে হলে বাংলাদেশ খেলবে না নিশ্চিত, সরকার এবং বিসিবির অবস্থান এখন পর্যন্ত সেটাই বলছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের দাবি মেনে আইসিসি কি ভারত থেকে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো অন্য কোথাও সরাবে?
বিসিবির কাছে এরও কোনো উত্তর আজ পর্যন্ত নেই। তবে অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতায় বিসিবির এক কর্মকর্তা তাঁর ব্যক্তিগত মত জানাতে গিয়ে সম্ভাবনাটা দুই দিকে সমান ভাগ করে দিয়ে বললেন, ‘আমি বলব ফিফটি-ফিফটি।’
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে খেলবে কি না, এ প্রশ্নের সমান্তরালে এখন অন্য এক আলোচনাও শুরু হয়ে গেছে। বিশ্বকাপে না খেললে কতটা আর্থিক ক্ষতি হতে পারে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের? তিনবারের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে অনুষ্ঠিত বিসিবির দোয়া ও মিলাদ মাহফিল শেষে আজ সে ব্যাপারে একটা ধারণা দিয়েছেন বিসিবির অর্থ কমিটির প্রধান এম নাজমুল ইসলাম।
ধারণা না বলে তথ্য বলাই ভালো। নাজমুল স্পষ্টভাবেই বলেছেন, এতে বিসিবির কোনো আর্থিক ক্ষতি হবে না। কারণ, বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ফি হিসেবে আইসিসির কাছ থেকে এরই মধ্যে ৫ লাখ ডলার পেয়ে গেছে বিসিবি, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে বিশ্বকাপের জন্য আইসিসির কাছ থেকে বিসিবির আর কিছু পাওয়ার নেই।
নাজমুলের এটাও দাবি, এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে না খেললেও ২০২৭ সাল পর্যন্ত আইসিসি থেকে বিসিবির রাজস্ব আয়ে কোনো হেরফের হবে না। এক প্রশ্নে তিনি সাংবাদিকদের জানান, আইসিসি থেকে প্রতিবছর বাংলাদেশ ২০.৪ মিলিয়ন ডলার পায়। এ ছাড়া আইসিসির রিজার্ভ মানি থেকে চার বছর পর পায় ৪ মিলিয়ন ডলার।
আর্থিক ক্ষতি বিসিবির না হলেও হবে ক্রিকেটারদের। কারণ, বিশ্বকাপ থেকে প্রাইজমানি এবং ম্যাচ ফি হিসেবে যে টাকা পেতেন খেলোয়াড়েরা, সেটি তখন তাঁরা পাবেন না। নাজমুলই বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের কোনো ক্ষতি হবে না, ক্রিকেটারদের ক্ষতি হবে। কারণ, খেললে প্রতিটা খেলায় ক্রিকেটাররা ম্যাচ ফি পায়।’
ওরা গিয়ে যদি কিছুই না করতে পারে, তাহলে ওদের পিছে আমরা যে এত কোটি কোটি টাকা খরচ করছি, আমরা কি ওদের কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত চাচ্ছি নাকি!
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে পয়েন্ট তালিকার অবস্থানের ওপর নির্ভর করে প্রতিটি দল নির্দিষ্ট অঙ্কের প্রাইজমানিও পায়। গত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে যেমন বাংলাদেশ দল পেয়েছিল ৭ লাখ ২০ হাজার ডলার। প্রাইজমানির অঙ্কটা এবার আইসিসির আরও বাড়ানোর কথা। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা না হলে এই টাকাও পাবেন না ক্রিকেটাররা।
খেলোয়াড়দের ক্ষতিটা শুধু আর্থিকই নয়। বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে তাদের খেলা হবে না, বড় ক্ষতি আসলে এটাই। এবারের বিশ্বকাপের দলে ডাক পাওয়া অনেকের হয়তো আর সুযোগই হবে না বিশ্বকাপে খেলার।
বিসিবির পরিচালক নাজমুল ইসলাম অবশ্য অতটা মানবিকভাবে চিন্তা করছেন না বিষয়টাকে। বিশ্বকাপ না খেললে খেলোয়াড়দের যে আর্থিক ক্ষতি হবে বলে তিনি নিজেই জানিয়েছে, সেটি পুষিয়ে দেওয়ার কোনো চিন্তা বিসিবি করবে কি না, এমন এক প্রশ্নে নাজমুল উল্টো বলেছেন, ‘ওরা গিয়ে যদি কিছুই না করতে পারে, তাহলে ওদের পিছনে আমরা যে এত কোটি কোটি টাকা খরচ করছি, আমরা কি ওদের কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত চাচ্ছি নাকি!’
আরেক প্রশ্নে তিনি এমনও মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা যে ওদের পেছনে এত খরচ করছি, বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ওরা কিছুই করতে পারছে না। আজ পর্যন্ত আমরা একটাও বৈশ্বিক অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি? কোনো একটা জায়গায় আমরা কতটুকু কী করতে পারছি? আমরা তাহলে তো প্রত্যেকবারই বলতে পারি, তোমরা খেলতে পারোনি, তোমাদের পেছনে যা খরচ করেছি, এটা এবার তোমাদের কাছ থেকে আমরা নিতে থাকি, ফেরত দাও।’
নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে যথেষ্ট যুক্তি থাকলেও বিসিবির অর্থ কমিটির প্রধানের মতো দায়িত্বশীল জায়গায় থেকে তাঁর করা এমন বক্তব্য বিস্মিতই করেছে সবাইকে। খেলোয়াড়দের কী দেবে না দেবে, সে সিদ্ধান্ত অবশ্যই বিসিবির, তবে খেলোয়াড়দের পেছনে টাকা খরচ করার খোঁটাটা দেওয়ার আগে তাঁর চিন্তা করা উচিত ছিল, ক্রিকেটারদের খেলাকে পুঁজি করেই বিসিবি আইসিসি ও পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে টাকা আয় করে। তা ছাড়া কোনো খেলোয়াড়ই বিসিবিতে এসে বলেন না যে ‘আমাকে জাতীয় দলে নিন।’
খেলাটার প্রতি শ্রম, মেধা, নিবেদন বিনিয়োগ করে নিজ যোগ্যতায় তাঁরা সর্বোচ্চ পর্যায়ে আসেন। দলের প্রয়োজনেই অসংখ্য খেলোয়াড়ের মধ্য থেকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সেরাদের বেছে নেয় বিসিবি।
ক্রিকেটার আগে, না ক্রিকেট বোর্ড আগে, এই প্রশ্নটাও প্রসঙ্গক্রমে এসে পড়ে। এ ব্যাপারে নাজমুলের পাল্টা প্রশ্ন, ‘ধরুন বোর্ডটাই যদি না থাকে, তাহলে ক্রিকেট মানে ক্রিকেটাররা থাকবে কি না?’ পরে আবার ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘আমার হাত না থাকলে শরীর থাকবে না, শরীর না থাকলে হাত থাকবে না, তো আমার হাত না থাকলে আমার শরীর আর এই হাতের কোনো কোনো কাজ আছে? একই রকম। মানে, দে আর পার্ট অ্যান্ড দ্য পার্সেল।’
বিশ্বকাপ খেলার প্রশ্নে তাই দেশের স্বার্থ আর খেলোয়াড়দের নিরাপত্তাকেই বড় করে দেখতে চান তিনি।