রেকর্ড ৫৮৮ রান—একগুঁয়েমি ছেড়ে বাবর যেভাবে বদলে গেলেন

বাবর আজমপিসিবি

বাবর আজম আলোচনার বাইরে খুব কমই থাকেন। ভালো খেললে আলোচিত হন আবার না খেললেও হন। এই যেমন গত কয়েক বছর ধরে প্রত্যাশামতো পারফর্ম করতে না পারায় আলোচিত ছিলেন। এখনো আছেন। তবে এবার পাকিস্তান সুপার লিগ পিএসএলে দারুণ পারফর্ম করে।

এবারের পিএসএলে তিনি রান করেছেন ৫৮৮। যা পিএসএলের এক আসরে যৌথভাবে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। সেঞ্চুরি করেছেন দুটি, একটি কোয়ালিফায়ারে। অথচ এই বাবরই পিএসএলের আগে ছন্দে ছিলেন না। ফর্মের কারণে নানা প্রশ্নে জর্জরিত ছিলেন। তাহলে এবার কীভাবে বদলে গেলেন?

বদলের গল্প জানার আগে বাবর কীসের মধ্যে দিয়ে গেছেন সেটা আরেকবার স্মরণ করা যাক। পাকিস্তানের সাবেক এই অধিনায়ক টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু প্রধান কোচ মাইক হেসনের কাছ থেকে কড়া বার্তাও শুনতে হয়েছিল যে, পাওয়ার প্লে-তে তাঁর স্ট্রাইক রেট দলের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।

এমনকি নামিবিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে টপ অর্ডার ভালো শুরু করায় তাঁকে ব্যাটিংয়ে নামার প্রয়োজনও মনে করেনি দল। ৬ ম্যাচে ব্যাটিং করে রান করেছিলেন ৯১ রান। তাঁর স্ট্রাইকরেট ছিল মাত্র ১১২.৩৪। এটি নিয়ে তখন অনেক আলোচনা হয়েছে।

সেঞ্চুরির পর বাবর আজম
পিসিবি

অনেকেই বলেছেন ক্যারিয়ারের বাজে সময়ে বাবরের বড় শত্রু ছিল তার ‘একগুঁয়েমি’। ২০২২ সালে করাচি কিংসের হয়ে কাজ করার পর হার্শেল গিবস বলেছিলেন, বাবর তাঁর নিজের ব্যাটিং দুনিয়াতেই মগ্ন থাকেন। কারও পরামর্শ নিতে খুব একটা আগ্রহী নন। গত বছর শোয়েব আখতার তো সরাসরিই বলেছিলেন, বাবরের ‘উন্নতি করার কোনো ইচ্ছাই নেই’।

টি-টুয়েন্টিতে বাবরকে নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে সব সময়ই ছিল তাঁর স্ট্রাইক রেট। এ মৌসুমে তাঁর স্ট্রাইক রেট ক্যারিয়ার সেরা ১৪৬.৩। তবে ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও তিনি ১৪৫ ও ১৪২ স্ট্রাইক রেটে ৫০০ রানের বেশি করেছিলেন। সেই হিসেবে মনে হতে পারে এটি স্রেফ তাঁর চেনা ছন্দে ফেরা। কিন্তু একটু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এবার বাবর শুধু ছন্দে ফেরেননি, বরং গিবস বা শোয়েব আখতারের দেওয়া সেই ‘অনমনীয়’ তকমাগুলোও ঝেড়ে ফেলছেন।

কীভাবে?

গত দুই আসরে বাবরের ব্যাটিংয়ে একটি নির্দিষ্ট ধরন ছিল। পাওয়ার প্লেতে পেসারদের বিপক্ষে তাঁর স্ট্রাইকরেট বেশ ভালো ছিল (১৫৫ ও ১৫১)। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হতো পাওয়ার প্লের পর যখন স্পিনাররা আসতেন। স্পিনাররা লেংথ খুঁজে পেলে বাবর কার্যত হাত-পা গুটিয়ে নিতেন! শুধু শর্ট বল পেলেই কাট বা পুল করে বাউন্ডারি বের করতে পারতেন। এ বছর সেখানেই এসেছে বড় পরিবর্তন।

বিশ্বকাপে ছন্দে ছিলেন না বাবর
পিসিবি

স্পিনারদের ‘ইন-বিটুইন’ লেংথ বা গুড লেংথ থেকেও রান বের করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন বাবর। পিএসএলে স্পিনে ৪-৬ মিটার লেংথের বলে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাবরের স্ট্রাইক রেট ছিল বেশ কম— ১০৪.২০, ৯৮.১০ এবং ১০৮.৩০। ওই তিন বছরে এই লেংথের বলে তাঁর রান ছিল সাকল্যে ১৮১, সেখানে এবার এক আসরেই করেছেন ১৮০। আর স্ট্রাইকরেট—     ১৫০। গড়টাও আকাশচুম্বী—৯০.০০!

আরও পড়ুন

কোন কৌশলে খেলছেন?

৪-৬ মিটার লেংথে বাবরের স্কোরিং রেট বাড়ার পেছনে কাজ করেছে ব্যাকফুটে খেলার প্রবণতা। গত তিন মৌসুমের তুলনায় এ বছর বাবর সামনের পায়ের চেয়ে বলের পিচ বুঝে একটু দেরিতে ব্যাকফুটে খেলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। পাশাপাশি ‘স্লগ সুইপ’ও খেলছেন।

খেলার কৌশলে পরিবর্তন এনেছেন বাবর
পিসিবি

২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ আসরে এই লেংথের বলে তিনি মাত্র ছয়বার স্লগ সুইপ করেছিলেন। অথচ এ বছর চেষ্টা করেছেন সাতবার, যার মধ্যে পাঁচটিতেই ছক্কা হয়েছে। এখন বাবরকে প্রায়ই দেখা যায় স্টাম্প থেকে সরে গিয়ে জায়গা করে কাট করতে বা আড়াআড়ি ব্যাটে কাভার ও মিডউইকেট দিয়ে মারতে। এসব কারণেই এ বছর স্পিনের বিপক্ষে তাঁর স্ট্রাইক রেট ১৫৬, এর আগে সর্বোচ্চ ছিল ১২৮ (২০২৪ সালে)।

অবশ্য স্পিনের ওপর বাড়তি জোর দিতে গিয়ে পেসের বিপক্ষে বাবরের স্ট্রাইক রেট কিছুটা কমেছে (১৪৮ থেকে ১৩৬)। তবে মোটের ওপর যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে, তা তো পরিসংখ্যানই বলছে।

আরও পড়ুন