টেস্টে কি সত্যিই উন্নতি করছে বাংলাদেশ
উন্নতি…!
খুবই ক্লিশে শব্দ। আগে বহুবার শুনেছেন নিশ্চয়ই। ক্রিকেটেও কি শোনেননি? পুরোনো কিছু না ঘেঁটেই বলে দেওয়া যায়, শুনেছেন। কোনো একটা বাজে হারের পর, ‘উন্নতি নেই’, কোথাও ভালো একটা কিছু করলে ‘আরও উন্নতি দরকার’, ব্যর্থতার পরও ‘উন্নতি করব।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটে ‘উন্নতি’ কথাটা শুনতে শুনতে বিরক্তি এসে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু বিশ্বাস করুন, বাংলাদেশ ক্রিকেটে সত্যিই উন্নতি করছে। এখনই তেড়েফুঁড়ে আসবেন না। একটা টেস্ট জিততেই এত মাতামাতি বলে ভ্রু–ও কুঁচকে ফেলবেন না। অঙ্কের হিসাবে অন্তত টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের উন্নতির ছাপটা স্পষ্ট।
তা কী এমন করেছে বাংলাদেশ? সংখ্যাগুলো ছোটখাটো নয়, অন্তত ‘উন্নতি করছে’ বোঝানোর জন্য যথেষ্ট। টেস্টে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের জয় ২৬টি। দুই ভাগে ভাগ করুন এই জয়গুলোকে—২০১৮ সালের ৩০ নভেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ১৩তম জয়টা পেতে কত ম্যাচ লেগেছে জানেন? ১১২টি। আর পরের ১৩ জয়ে? ৪৫ ম্যাচ। চিন্তা করে দেখুন, গত আট বছরে বাংলাদেশ প্রায় প্রতি তিন টেস্টের একটা জিতেছে!
এবার নিশ্চয়ই ভাবতে শুরু করেছেন, নিশ্চয়ই সহজ কোনো প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এসেছে এসব জয়! তা–ও আসলে পুরোপুরি ঠিক নয়। হ্যাঁ, আয়ারল্যান্ড ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয় আছে, মুখোমুখি হওয়া প্রথম টেস্টেই লজ্জার হার উপহার দেওয়া আফগানিস্তানের বিপক্ষেও। কিন্তু বাকিগুলো?
মিরপুর টেস্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় পাওয়ার পর তাদের বিপক্ষে টানা তিন জয় এসেছে, এটা হয়তো আপনার জানা। হয়তো এটাও যে এই টানা তিন জয়ের আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৩ ম্যাচে বাংলাদেশের সম্বল বলতে ছিল শুধু একটা ড্র, জয় ছিল তখনো বহুদূরের কল্পনা।
নিউজিল্যান্ডকে ঘরে ও বাইরে দুই জায়গাতেই হারিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে একটি তো বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো—মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্ট জয়! অথচ ওই জয়ের আগে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কোনো সংস্করণেই বাংলাদেশের জয় ছিল না। দুই বছর আগে বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে আরও একবার হারিয়ে এসেছে তাদেরও।
এবার উন্নতির আলোচনায় আসা যাক—কোথায় তা হলো? খুব কঠিন নয় উত্তরটা। শুধু একটা জায়গা বলতে বললে তা পেস বোলিং। নীরবে–নিভৃতে যে বিপ্লবের সূচনা করে গিয়েছিলেন মুমিনুল হক। একটু খটকা লাগছে? মনে করে দেখুন, মাউন্ট মঙ্গানুইতে ওই জয়ের সময় অধিনায়ক ছিলেন তিনিই।
টেস্ট অধিনায়কত্ব পাওয়ার পর মুমিনুল নিয়মিত পেসারদের খোঁজখবর রেখেছেন, তাঁদের ওপর ভরসা রেখেছেন ম্যাচেও। বিশ্বাসটা ছড়িয়ে দিয়েছেন পুরো দলে ‘ওরাই আমাদের জেতাবে…’। মুমিনুল নেতৃত্ব নেওয়ার আগের বছর ২০১৯ সালেই আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ টেস্ট খেলতে নেমে গিয়েছিল কোনো পেসার ছাড়াই। সেখান থেকে রীতিমতো বিপ্লব করেই মুমিনুল বোঝাতে শুরু করেন, নিয়মিত জিততে হলে আমাদের পেস বোলিংটা লাগবেই!
তত দিনে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে উইকেট পেসারদের সাহায্য করতে শুরু করেছে। ওই পথ ধরে আসতে শুরু করেছে গতির বোলিংয়ের নতুন নতুন মুখ। প্রথম ১৩ জয়ে পেসারদের বোলিং গড় যেখানে ছিল ৫০ পেরোনো (৫৬.৬৯), পরের ১৩ জয়ে তা নেমে আসে ৩৮.৩৭–এ।
শুধু কি পেসার? তা–ও না। স্পিনারদের কথা তো আর আলাদা করে বলার দরকার নেই। ২০১৫ সালে অভিষেক হওয়া মেহেদী হাসান মিরাজ আলো ছড়িয়েছেন শুরু থেকেই, তাইজুল ইসলাম পরিণত হয়েছেন সময়ের সঙ্গে। তাঁদের দুজনের ভিড়ে যখনই নাঈম হাসান কিংবা হাসান মুরাদ সুযোগ পেয়েছেন, বুঝিয়েছেন সামর্থ্য আছে তাঁদেরও।
কিন্তু শুধু বোলারদের দিয়ে তো আর ম্যাচ জেতা যায় না, স্কোরবোর্ডে রানও থাকতে হয়। এখনো প্রায়ই তা থাকে না, সত্যি। কিন্তু চাইলে যে তাঁরা রান করতে পারবেন, তা কে অস্বীকার করবে!
১০০ টেস্ট খেলা মুশফিকুর রহিম পাড়ি দিয়ে এসেছেন বহু পথ, মুমিনুল হক উত্থান–পতন মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে দলের ভিত বহুদিন ধরে—তাঁদের সঙ্গে এবার যোগ করুন নাজমুল হোসেনকে। দুই ইনিংসে ম্যাচ জেতানো ১০১ আর ৮৩ রান করে এসেও যিনি বলেন, ‘বড় ব্যাটসম্যান হলে তো ডাবল সেঞ্চুরিই করে আসতাম...।’ লিটন দাস আর মিরাজ বাংলাদেশকে ২৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর ম্যাচ জিতিয়ে আসেন রাওয়ালপিন্ডিতে।
উচ্চাশা বেশি হয়ে যাচ্ছে কি না, এমন সংশয় এতক্ষণে পেয়ে বসার কথা। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ভয়টা অমূলকও নয়। কিন্তু বাংলাদেশ টেস্ট দলটা এখন এমন, নতুন কেউ দলে এলে প্রশ্নটা শোনা যায় কান পাতলেই, ‘কার জায়গায় খেলবে?’
এটাকেও উন্নতি বলাই যায়, কী বলেন?