এআই যেভাবে দখল করে নিচ্ছে খেলার দুনিয়া

গ্রাফিকসএআই দিয়ে বানানো

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যখন মাঠে ফ্রি-কিক নেন, তখন আমাদের চোখ থাকে সেই শটে, বলের বাঁক আর গোলপোস্টে। কিন্তু পর্দার আড়ালে একদল মানুষ ততক্ষণে মেপে ফেলছেন সেই শটের গতিপথ, বাতাসের বাধা আর রোনালদোর শরীরের প্রতিটি পেশির কম্পন।

কিংবা ট্যুর ডি ফ্রান্সে একজন সাইক্লিস্ট যখন রেসে নামেন, আমরা কী দেখি? তিনি কতটা এগিয়ে বা পিছিয়ে আছেন, তাই তো? কিন্তু ট্র্যাকের বাইরে একদল মানুষের চোখ থাকে অন্য কোথাও। সেই সাইক্লিস্ট কতটা শক্তি খরচ করছেন, সেকেন্ডে কতবার ঘুরছে তাঁর সাইকেলের চাকা?

আধুনিক খেলাধুলা এখন যেন সেন্সর, ক্যামেরা আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) এক গোলকধাঁধা। কিছুই আর শুধু অনুমানের বিষয় নয়। সবই ধরা পড়ছে যন্ত্রের চোখে।

আরও পড়ুন

২০১১ সালের সেই বিখ্যাত সিনেমা ‘মানিবল’-এর কথা মনে আছে? ব্র্যাড পিট দেখিয়েছিলেন, কীভাবে স্রেফ পরিসংখ্যান ব্যবহার করে একটা সাদামাটা বেসবল দলকেও বদলে দেওয়া যায়। ২০২৬ সালে এসে সেই ডেটা বা পরিসংখ্যানের জগৎ এখন কয়েক আলোকবর্ষ এগিয়ে গেছে। খেলাটা এখন আর শুধু আবেগ বা শারীরিক দক্ষতার বিষয় নয়, বরং সংখ্যা আর অ্যালগরিদমের এক জটিল সমীকরণ। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই অন্য অনেক কিছুর মতো দখল করে নিচ্ছে খেলার দুনিয়াও।

সিলিকন ভ্যালি যখন ড্রেসিংরুমে

স্পোর্টস ডেটা অ্যানালাইসিসের বাজার এখন যেন টগবগ করে ফুটছে। আগে কোচেরা খেলোয়াড়দের চোখের দেখায় বিচার করতেন। এখন গায়ে লাগানো সেন্সর বলে দিচ্ছে একজন খেলোয়াড় কতটা ক্লান্ত কিংবা তার চোট পাওয়ার ঝুঁকি কতটুকু। ফ্রান্সের ‘সিস্পোর্টস’-এর পরিচালক ফ্রাঙ্ক ইমবাখ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘কোনো ক্লাব বা ফেডারেশনের কাছে যখন খেলোয়াড়দের সব তথ্য থাকে, আমরা তাদের নিখুঁত পরামর্শ দিতে পারি। আমরা তখন বলে দিতে পারি কীভাবে তাদের পারফরম্যান্স আরও বাড়ানো যাবে কিংবা চোট এড়ানো যাবে।’

গ্রাফিকস
এআই দিয়ে বানানো

এখন অনেক খেলোয়াড়ের শরীরে বসানো হচ্ছে পরিধানযোগ্য সেন্সর। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি থেকে শুরু করে হৃৎস্পন্দনের নিখুঁত হিসাব চলে আসছে ল্যাপটপের স্ক্রিনে। ফুটবলের কথাই ধরুন—ব্যাপারটা এখন আর বলের পেছনে ছোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্যালারিতে থাকা ক্যামেরা এখন প্রতি সেকেন্ডে ৫০টি ছবি তুলছে। খেলোয়াড়ের পায়ে বল থাকুক বা না থাকুক, তার প্রতিটি নড়াচড়া ট্র্যাক করা হচ্ছে। এমনকি একজন খেলোয়াড় কতটা জোরে শ্বাস নিচ্ছেন, সেটাও বাদ যাচ্ছে না। এ যেন এক ডিজিটাল ময়নাতদন্ত!

আরও পড়ুন

ব্রিটিশ স্টার্টআপ ‘স্পোর্টস ডায়নামিকস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আরনড সান্টিন একে বলছেন এক ‘হোলিস্টিক’ বা সামগ্রিক পদ্ধতি। এখানে নিজের দলের শক্তি যেমন জানা যায়, তেমনি প্রতিপক্ষের দুর্বলতাও বের করা যায় নিমেষেই।

টাকার পাহাড় ও বাজির দুনিয়া

বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ডেটা বা তথ্যের ব্যবসার ভবিষ্যৎ আকাশচুম্বী। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইওয়াই’-এর অন্যতম শীর্ষ কর্তা লোডোভিকো মাঞ্জিয়াভাক্কি পূর্বাভাস দিয়েছেন, আগামী দশকে ইউরোপের স্পোর্টস অ্যানালিটিকস বাজার কয়েক বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে। আরেকটি গবেষণা বলছে, ২০৩২ সালের মধ্যে এই বাজার হবে প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের! বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা!

আগে কোচেরা খেলোয়াড়দের চোখের দেখায় বিচার করতেন। এখন গায়ে লাগানো সেন্সর বলে দিচ্ছে একজন খেলোয়াড় কতটা ক্লান্ত কিংবা তার চোট পাওয়ার ঝুঁকি কতটুকু।
গ্রাফিকস: এআই দিয়ে তৈরি

এই তথ্যের খেলা শুধু মাঠের কৌশলেই সীমাবদ্ধ নেই। টিভি সম্প্রচার থেকে শুরু করে অনলাইন বেটিং বা ফ্যান্টাসি লিগ—সবখানেই তথ্যের জয়জয়কার। জার্মানি ভিত্তিক ‘ডেটা স্পোর্টস গ্রুপ’ যেমন রাগবি বা ক্রিকেটের লাইভ ডেটা সরবরাহ করে গণমাধ্যম ও গেমিং কোম্পানিগুলোকে। ‘ডেটা স্পোর্টস গ্রুপ’-এর রাজেশ ডি’সুজা যেমন বলছিলেন, বুকি বা জুয়াড়িদের কাছে এই ডেটা হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল হাতিয়ার। পরিসংখ্যান দেখে তারা ঠিক করেন, কার ওপর বাজি ধরা নিরাপদ। এমনকি অফ-সিজনে যখন মাঠে কোনো খেলা থাকে না, তখনো ফ্যান্টাসি লিগের ভক্তদের মাতিয়ে রাখে এই পরিসংখ্যানের লড়াই।

তথ্যের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা

এত সব কথার ভিড়ে একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায়—খেলোয়াড়দের এই ব্যক্তিগত তথ্যের মালিক আসলে কে? ইউরোপে অবশ্য ‘জিডিপিআর’ (তথ্য সুরক্ষা) আইন আছে। তবে সান্টিন বলছেন অন্য এক বাস্তবতার কথা। পেশাদার চুক্তিতে স্বাক্ষর করার সময় খেলোয়াড়রা কার্যত তাদের ডেটা ব্যবহারের অনুমতি ক্লাব বা লিগকে দিয়েই দেন। খেলার দুনিয়ায় খেলার এই তথ্যের  বাজার যে কতটা জমজমাট, তার প্রমাণ মিলেছে এই মাসেই। আমেরিকান টেক জায়ান্ট ‘জিনিয়াস স্পোর্টস’ ১২০ কোটি ডলারে কিনে নিয়েছে বেটিং প্ল্যাটফর্ম ‘লিজেন্ড’কে।

আরও পড়ুন

দিনশেষে মাঠে ফুটবলারের সেই শৈল্পিক ড্রিবলিং বা পেস বোলারের গতির ঝড় হয়তো আমাদের চোখে সৌন্দর্য, কিন্তু স্পোর্টস অ্যানালিটিকসের দুনিয়ায় তা কোটি ডলারের একেকটি পরিসংখ্যান মাত্র! মাঠের লড়াইটা হয়তো এখনো খেলোয়াড়ের ঘাম আর দক্ষতার, কিন্তু পর্দার আড়ালের জয়-পরাজয় এখন নির্ধারিত হচ্ছে বাইনারি কোডে!