এক ওভারে ছয় ছক্কা—যুবরাজের পথ ধরেছেন যাঁরা

২০০৭ বিশ্বকাপে স্টুয়ার্ট ব্রডকে এক ওভারে ৬ ছক্কা মেরেছিলেন যুবরাজ সিংফাইল ছবি

প্রথম বলটা মিড উইকেটের ওপর দিয়ে। পরেরটা ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগ। তিন নম্বর ছক্কাটা এল এক্সট্রা কাভার দিয়ে। চতুর্থ বল ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে ছক্কা। পঞ্চম ও ষষ্ঠ ছক্কা যথাক্রমে মিউ উইকেট ও মিড অন দিয়ে।

১৯ বছর আগের ঠিক এই দিনটিতেই ডারবানের কিংসমিডে লিখে রাখা হয়েছিল আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটের এক অসাধারণ গল্প। তরুণ স্টুয়ার্ট ব্রডকে অসহায় বানিয়ে এক ওভারে ছয় ছক্কার অবিস্মরণীয় সেই ঝড় তুলেছিলেন ভারতের অলরাউন্ডার যুবরাজ সিং।

সেই যে শুরু। এরপর সময়ের স্রোতে ১৯টি বছর ভেসে গেছে। আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টিতে ছয় বলে ছয় ছক্কা মারার দৃশ্য ক্রিকেট–বিশ্ব দেখেছে আরও পাঁচবার। সেই তালিকায় যাদের নাম উঠে এসেছে, তাঁরা সবাই হয়তো যুবরাজের মতো ক্রিকেট–দুনিয়ার কুলীন পরিবারের সদস্য নন। কিন্তু রেকর্ডের পাতায় তো তাঁরা একই সিংহাসন ভাগ করে নিয়েছেন!

যুবরাজ যখন ওই কীর্তি গড়েছিলেন, টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট তখন হাঁটি হাঁটি পা পা করা এক শিশু। ১৯ বছরে ক্রিকেট খেলাটা ঘুরে গেছে পুরো ৩৬০ ডিগ্রি। ব্যাটিংয়ের ব্যাকরণ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, পাল্টে গেছে ব্যাটসম্যানদের ভাবনার জগৎ ও ব্যাটিং কৌশল। তাই এই তালিকায় নতুন নতুন নাম যুক্ত হওয়াটা কোনো বিস্ময় নয়। এমনকি সত্যি বলতে, যুবরাজের সেই ছয় ছক্কাও কি খুব অভাবনীয় ছিল?

যুবরাজ সিং ও স্টুয়ার্ট ব্রড– ১৯ বছর আগের ছবি
যুবরাজ সিংয়ের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে

সেই ২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপেই তো নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৬ বলে ৬ ছক্কা মেরে তছনছ করে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ওপেনার হার্শেল গিবস।

আর ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে তো পাওয়া যায় ১৯৬৮ সালের কথা। ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে খেলার সময় গ্ল্যামরগনের ম্যালকম ন্যাশকে এক ওভারে ছয়টি ছক্কার স্বাদ উপহার দিয়েছিলেন কিংবদন্তি স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্স। তার ১৬ বছর পর রঞ্জি ট্রফিতে সেই একই কীর্তি স্পর্শ করেন মুম্বাইয়ের ব্যাটসম্যান রবি শাস্ত্রী। সেই বিচারে ক্রিকেটের সবচেয়ে মারকুটে সংস্করণ টি-টুয়েন্টিতেও যে এমন ঘটনা ঘটবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। যুবরাজ না মারলে অন্য কেউ হয়তো মারতেন।

তবে উল্টোভাবে ভাবলে, যুবরাজের সেই রেকর্ড যে দীর্ঘ ১৪টি বছর কেউ ভাঙতে পারেনি, সেটাই বরং বেশি বিস্ময়কর। অবশেষে ২০২১ সালে এসে সেই রাজকীয় রেকর্ডে ভাগ বসান ওয়েস্ট ইন্ডিজের দানবীয় ব্যাটসম্যান কাইরন পোলার্ড। সেই রাতে শ্রীলঙ্কার স্পিনার আকিল ধনঞ্জয়ার ওপর দিয়েই গিয়েছিল ছয় ছক্কার সেই ঘূর্ণিঝড়।

এক ওভারে টানা ৬ বলেই ছক্কা মেরেছেন দীপেন্দ্র সিং ঐরি
এক্স

আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টির এই তালিকায় তিন নম্বর নামটি নেপালের দীপেন্দ্র সিং ঐরির। ২০২৪ সালে কাতারের বিপক্ষে ৬ বলে ৬ ছক্কা হাঁকান তিনি। সেদিন মাত্র ৯ বলে ফিফটি ছুঁয়ে আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টির দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডটিও নিজের দখলে নিয়েছিলেন দীপেন্দ্র।

আরও পড়ুন

একই বছর সামোয়ার ড্যারিয়াস ভিসার ভানুয়াতুর বিপক্ষে ১ ওভারে ৬ ছক্কা মারেন। পরের বছর ২০২৫ সালে জিব্রাল্টারের বিপক্ষে একই কীর্তি গড়ে তালিকায় নিজের নাম লেখান বুলগেরিয়ার মানান বশির। আর এই অভিজাত ক্লাবের সবশেষ সদস্য নেপালের কুশল ভুর্তেল। চলতি বছর চীনের বিপক্ষে ৬ বলে ৬ ছক্কা মেরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। অবাক করা ব্যাপার হলো, এলিট এই তালিকায় নেপালেরই দুজন ব্যাটাসম্যান আছেন।

সামনের দিনগুলোয় এই তালিকা যে আরও দীর্ঘ হবে, তা না বললেও চলে। তবে এ সবকিছুর পেছনে একটা ধন্যবাদ বোধ হয় ইংলিশ অলরাউন্ডার অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ আর ডিমিত্রি মাসকারেনহাস পেতেই পারেন। কেন?

এক ওভারে ছয় ছক্কা—যুবরাজের পথ ধরেছেন যাঁরা
প্রথম আলো গ্রাফিকস

সেই টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের কিছুদিন আগেই একটি ওয়ানডে ম্যাচে যুবরাজের ওভারে টানা ৫টি ছক্কা মেরেছিলেন মাসকারেনহাস। সেই ক্ষত তো যুবরাজের মনে ছিলই। আর ডারবানে সেই ওভারটির ঠিক আগেই যুবরাজকে সেধে স্লেজিং করতে এসেছিলেন ফ্লিনটফ। দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ও হয়। সেই ক্ষোভ আর রাগের পুরো দহন গিয়ে পড়েছিল বেচারা তরুণ ব্রডের ওপর।

তবে ব্রডের ওপর সেই ঝড়ের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশ সহ্য করতে হয়েছিল ক্রিস ব্রডকে। ম্যাচের দিন ম্যাচ রেফারি হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তিনি। নিজের চোখের সামনে ছেলের বল গ্যালারিতে আছড়ে পড়তে দেখার সেই নির্মম যন্ত্রণা একজন বাবার চেয়ে বেশি আর কে বুঝতে পারে!

আরও পড়ুন