এ নিয়ে গতকাল ম্যাচ শেষে সিডনিতে উষ্মা প্রকাশ করেছেন বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা প্রধান জালাল ইউনুস। তাঁর কাছে এই প্রতিবেদকের প্রশ্ন ছিল, বিশ্বকাপের মধ্যে কেন ক্রিকেটাররা এ ধরনের অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন? বিসিবি কেন তাঁদের পাঠাচ্ছে বা যেতে দিচ্ছে?

বিশেষ করে ব্রিসবেনে এর আগে এ রকম এক অনুষ্ঠান নিয়ে জটিলতা হওয়ার পর বিসিবি ও টিম ম্যানেজমেন্টের উচিত ছিল এসব থেকে খেলোয়াড়দের দূরে রাখা। জালাল ইউনুস জবাব দিয়েছেন, ‘আমরা তো মানা করেছিলাম অনুষ্ঠানটা করতে। তারপরও কেন করল জানি না। আর ওদেরই জিজ্ঞেস করে দেখুন, ওরা কেন গেল। আমরা ওদের যেতে বলিনি।’

দল থেকে যেতে বারণ করা হয়ে থাকলে সাকিব-তাসকিন সেখানে গিয়ে দলীয় শৃঙ্খলাই ভাঙলেন। তাহলে কোনো ব্যবস্থা কি নেওয়া হবে তাঁদের বিরুদ্ধে? বিশ্বকাপের দোহাই দিয়ে প্রসঙ্গটা এড়িয়ে গেলেন জালাল ইউনুস। টুর্নামেন্টের মধ্যে তাঁরা এ নিয়ে কিছু করতে চান না।

সত্যিই তা–ই? নাকি কিছু করার জায়গাতেই নেই বিসিবি! প্রশ্নটা আসছে ব্রিসবেনের ঘটনার কারণে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে ব্রিসবেনে থাকার সময় পুরো বাংলাদেশ দলকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি সংগঠন। বাংলাদেশ দল তাতে যোগও দেয়। কিন্তু অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে বাংলাদেশ দল এবং আয়োজক, দুই পক্ষকেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।

ব্রিসবেনের আয়োজকদের অভিযোগ ছিল, সাকিব দাওয়াতে গিয়ে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেননি। নানাভাবে তাদের অপমান করেছেন। আবার দল থেকে পাল্টা বলা হয়েছিল, আয়োজকেরা খেলোয়াড়দের দিয়ে বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম করাতে চেয়েছেন, অনুষ্ঠানে আগতদের সঙ্গে খেলোয়াড়দের ছবি তুলতে বাধ্য করেছেন, যেসবের কথা আগে থেকে ছিল না। সে জন্যই সাকিবসহ সবাই বিরক্ত হয়েছেন।

জানা গেছে বিদেশে এ ধরনের অনুষ্ঠান নিয়ে অতীতেও বিতর্ক হয়েছে বলে ক্রিকেটাররা ব্রিসবেনের অনুষ্ঠানে যেতেই চাননি। এমনকি বিসিবিও গত কয়েক বছর ধরে প্রবাসে এ ধরনের অনুষ্ঠানে ক্রিকেটারদের যেতে নিরুৎসাহিত করে আসছে। তাহলে ব্রিসবেনে ব্যতিক্রম ঘটল কেন? সিডনি-বিতর্কে ঢোকার আগে সেই প্রশ্নের উত্তর জানাটা বেশি জরুরি।

ব্রিসবেনের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ দলকে যোগ দিতে হয়েছে; কারণ, বিসিবি থেকেই নির্দেশনা গেছে পুরো দল যেন অনুষ্ঠানে যায়। সাকিবসহ খেলোয়াড়দের আপত্তি সত্ত্বেও ঢাকা থেকে বারবার ফোন করে একরকম জোরই করা হয় দলের সবাইকে সেখানে যেতে। আয়োজকেরাও দাবি করেছেন অনুষ্ঠানটা বিসিবি এবং স্থানীয় দূতাবাসের অনুমতি নিয়ে করা হয়েছে।

এমনও গুঞ্জন আছে, ওই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সঙ্গে বিসিবির ঘনিষ্ঠ একটি করপোরেট সংস্থার শীর্ষ মহলে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। ক্রিকেটাররা প্রথম অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় ওই করপোরেট সংস্থাই বিসিবিকে চাপ দেয় ক্রিকেটারদের সেখানে পাঠাতে। বিসিবি দলকে অনুষ্ঠানে পাঠিয়ে তাদের অলিখিত ‘আদেশ’ই পালন করেছে।

অর্থাৎ যেভাবেই হোক, নিয়ম ভাঙার শুরুটা বিসিবির হাত ধরে।

এবার সিডনির অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে আসা যাক। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশ দল যে ২৫ অক্টোবর এই শহরে আসবে তা আগে থেকেই জানা ছিল। অনুষ্ঠানটাও ছিল সেদিনই। এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও আগে থেকেই ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছে আয়োজক সংগঠন।

‘এন এক্সক্লুসিভ ডিনার উইথ বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রিকেট প্লেয়ার্স’ শিরোনামের প্রচারণায় ক্রিকেটারদের সঙ্গে একই টেবিলে নৈশভোজ করা, ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলা, এককভাবে ছবি তোলা এবং সাকিবসহ ক্রিকেটারদের স্বাক্ষর করা ব্যাট প্রদানের বিভিন্ন প্যাকেজের কথা উল্লেখ করা হয়।

প্রচারণায় প্যাকেজ ভেদে বিভিন্ন ডিনার টেবিলের টিকিটের দাম ছিল বিভিন্ন রকম। ব্যক্তিগত টিকিট ৯০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার, স্পেশাল ক্রিকেটার্স টিম টিকিটস ৫০০ ডলার (সর্বোচ্চ ১০ জনের টেবিল), সিলভার স্পনসরশিপ ১০০০ হাজার ডলার (৫ জনের টেবিল), পাওয়ার্ড বাই স্পনসরশিপ ২০০০ ডলার (১০ জনের টেবিল ও এক্সক্লুসিভ মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ এবং প্রোমো হাইলাইটস), ভিআইপি টেবিল ২০০০ ডলার (১০ জনের টিকিট, খেলোয়াড়দের সঙ্গে স্পেশাল ডিনার, একক ছবি ও ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগ)— এই ছিল বিভিন্ন প্যাকেজের অফার।

অনুষ্ঠানে প্রথমে শ দেড়েক অতিথির যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও পরে গেছেন শ খানেক অতিথি। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এসব টিকিট বিক্রি করেছেন আয়োজকেরা। অতিথি কমে যাওয়ায় ভেন্যু বদলে নর্থ রাইড স্কুল অব আর্টসের পরিবর্তে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয় সিডনি সিটির জাফরান রেস্টুরেন্টে।

কিন্তু দেশে বা বিদেশে কেউই কি পারে বিসিবির পূর্বানুমতি না নিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের এমন বাণিজ্যিক উপকরণ বানাতে? অনুমতি না নিয়ে করলে সেটা ঘোরতর অন্যায় এবং বিসিবির উচিত আয়োজকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। বিসিবি কি তা নিয়েছে? জালাল ইউনুস যদিও নরম সুরে বলেছেন, ‘আমরা তো বলেছি অনুষ্ঠানটা না করতে…’, কিন্তু তাদের যে আয়োজকেরা থোড়াই পাত্তা দিয়েছেন, সেটা তো ২৫ অক্টোবর জাফরান রেস্টুরেন্টে সাকিব-তাসকিনের উপস্থিতিতে হয়ে যাওয়া অনুষ্ঠানেই পরিষ্কার।

বিসিবি বলতে পারে, পুরো দল তো অনুষ্ঠানে যায়নি। গেছেন শুধু সাকিব-তাসকিন। কাজেই দায়টা শুধু এ দুজনের। সেটি হলে শৃঙ্খলা অমান্যের অভিযোগে বিসিবিই তাঁদের বিচার করুক। কিন্তু ক্রিকেটারদের নাম ভাঙিয়ে এই বাণিজ্যিক কার্যক্রম, সেটির দায় কার? বিসিবিকে না জানিয়ে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের নিয়ে এত বড় অনুষ্ঠানের প্রচারণা কী করে হয়ে গেল!

ব্রিসবেনের অনুষ্ঠান নিয়ে ঝামেলা হওয়ার পর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল সিডনির অনুষ্ঠান নিয়ে। একপর্যায়ে অনুষ্ঠান বাতিলের কথাও শোনা গেছে। কিন্তু কিছু টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় অনুষ্ঠানটি যেকোনো মূল্যে করার চাপে পড়ে যান আয়োজকেরা। সেই চাপ সামলাতেই মাত্র দুজন ক্রিকেটারকে নিয়ে কোনোরকমে অনুষ্ঠানটি করা।

ব্রিসবেনের ঘটনার পর সিডনির অনুষ্ঠানের ব্যাপারে শক্ত অবস্থানই নিয়েছিল বিসিবি। ক্রিকেটারদের সেখানে যেতে কড়াভাবে নিষেধ করা হয়। কিন্তু আয়োজকদের সঙ্গে আগে থেকে থাকা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে দুজন ক্রিকেটার শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানে যান।

আর তাতে বিসিবি বা টিম ম্যানেজমেন্ট শক্তভাবে বাধা দিতে পারেনি কারণ ব্রিসবেনের অনুষ্ঠানে ক্রিকেটারদের সবাইকে জোর করে যোগ দিতে বাধ্য করায় নৈতিকভাবে সে অবস্থান তারা আগেই হারিয়েছে। তাদের কথা ক্রিকেটাররা শুনবেনইবা কেন?

সাকিব-তাসকিন যদি শৃঙ্খলা ভেঙেই থাকেন, বিসিবির নিষেধটা তাঁদের কাছে গুরুত্ব পায়নি—এ ব্যাপারে বিসিবি এবং টিম ম্যানেজমেন্টের নড়বড়ে অবস্থানের কারণেই। দাওয়াত-কাণ্ডের দায়টা কি তাহলে বিসিবির ওপরও বর্তায় না? নিয়ম ভাঙার শুরুটা তো তাদের হাত ধরেই!