পেসারদের সোনালি সময়ে হীরা হতে চান রোহান উদ দৌলা

দক্ষিণ আফ্রিকায় ম্যাচসেরার পুরস্কার হাতে রোহান উদ দৌলাবিসিবি

সৈয়দপুরের চেনা পথঘাটগুলো তখন আরও বেশি আপন হয়ে উঠেছিল রোহান উদ দৌলার। ৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা, কিন্তু গড়নে হালকা—তাঁর জন্য প্রায় অবশ্যম্ভাবীই ছিল স্ট্রেস ফ্র্যাকচার। ওই চোট থমকে দিয়েছিল তাঁর পথচলা। অনূর্ধ্ব-১৯ পেরিয়ে পেশাদার ক্রিকেটে পা রাখার আগেই প্রায় দুই বছর ছিলেন মাঠের বাইরে।

কংক্রিটে ঢেকে থাকা ঢাকার চেয়ে তখন তাঁর কাছে প্রিয় হয়ে গিয়েছিল সৈয়দপুর। মায়ের সান্নিধ্য, চেনা হাওয়ায় ফেরার লড়াই; এখনো তাঁর চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় সেসব দিনের ছবি, ‘ওই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। আমার বাড়ি তো উত্তরে, ওদিকে সুন্দর ঠান্ডা থাকে। ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে হেঁটে বেড়াতাম একা একা। কোনো দিন সাইকেল চালাতে চালাতে গান শুনতাম। এভাবেই প্রায় দুই বছর কেটে গেছে।’

যেকোনো পেসারের জন্যই লম্বা সময়, এত দিন মাঠের বাইরে থেকে ফেরাটাও কঠিন। যুব ক্রিকেট আর বিপিএলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে সম্ভাবনার ঝলক দেখিয়ে অল্পতেই কি হারিয়ে যাবেন? কারও কারও মনে সেই শঙ্কা থাকলেও রোহানের কল্পনার সীমানাতেও নাকি ছিল না তা।

দুই বছর চোটের কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন রোহান উদ দৌলা
ফেসবুক

ছিল না বলেই হয়তো তিনি ফিরে এসেছেন আবার, পারফর্মও করছেন। দক্ষিণ আফ্রিকা ইমার্জিংয়ের বিপক্ষে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে নিজের সর্বশেষ ম্যাচেও ৫ উইকেট পেয়েছেন—তার তিনটিই বোল্ড। তিন বলে তিন উইকেটও পেয়েছিলেন, মাঝে একটা ওয়াইড দিয়ে দেওয়ায় হ্যাটট্রিকটা আর হয়নি।

এত লম্বা সময় মাঠের বাইরে থাকা মানে না ফেরার শঙ্কা জেগে যায় প্রবলভাবে। কথাটা বলতেই রোহান হাসতে হাসতে শোনান তাঁর মন্ত্রটা, ‘মুভি দেখতে গিয়ে পজ করলে যেমন হয়, আমার কাছে এই সময়টা তেমনই। ওই পজটা এখন আবার আনপজ করেছি। আগে যা যা চাইতাম, যেমন ক্ষুধা ছিল, সব একই রকম আছে, কিছুই বদলায়নি।’

পুরো সময়ে মায়ের ‘ধরো তুমি দুই বছর পর ক্রিকেট শুরু করেছ’ সান্ত্বনা লড়াইটা চালিয়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে। গতি আর উচ্চতা আছে, সুইং করাতে পারেন—বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সেরা সময়ে আরও একজন যেন জাতীয় দলের দুয়ারে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়তে শুরু করেছেন।

কিন্তু কাজটা তো কঠিন, আপনার কী মনে হয়? এক নিশ্বাসে বলে ফেলা রোহানের উত্তর শুনে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই, ‘ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে তো লাভ নেই। আগে আমাদের দেশে ফাঁকা মাঠ ছিল। এখন তা নেই। এটা তো ভালো!’

তাসকিন আহমেদ-নাহিদ রানা-শরীফুল ইসলামদের নিয়ে এখন পেস বোলিংয়ে বাংলাদেশের সোনালি সময়...এটুকু বলতেই রোহান থামিয়ে দেন আবার। তিনি উল্টো ছুড়ে দেন একটা প্রশ্নও, ‘আপনি হীরা নেবেন নাকি সোনা?’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলতে থাকেন ২১ বছরের তরুণ, ‘অবশ্যই হীরা নেবেন। আমি হীরা হতে চাই। স্বর্ণযুগ চলুক, আমি যদি হীরা হই, আমাকেই আগে নেবে। আমাকে হীরা হতে হবে।’

জাতীয় দলের তারকা মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে রোহান উদ দৌলা
ফেসবুক

হীরা হওয়ার সেই লড়াইয়ের পথটা দীর্ঘ, বন্ধুর—তা ভালো করেই জানা আছে রোহানের। অল্প সময়ে তা টেরও পেয়েছেন। তিনি তাই প্রতিনিয়তই উন্নতির পথ খুঁজছেন। ধাপে ধাপে এগোচ্ছেন। টেপ টেনিসে শুরু হওয়া স্বপ্নটা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর খুঁজে পেয়েছিল একাডেমি। এলাকার বড় ভাইয়েরা এমনভাবে গিয়ে মা–বাবার কাছে তাঁর ক্রিকেট প্রতিভার তারিফ করেছিলেন, তাতে ভরসা রেখে তাঁকে ছাড় দেওয়া হয়েছে পড়াশোনায়ও।

বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের পথ পেরিয়ে এখন তিনি জাতীয় দল থেকে এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে। চূড়ান্ত গন্তব্যে কবে পৌঁছাতে পারবেন, সে উত্তরটা তাঁর কাছে নেই ঠিকই। কিন্তু তিনি জানেন, ‘আমাকে হীরা হতেই হবে ভাই, যদি না পারি ওই আফসোস সারা জীবন থেকে যাব। আমি তা নিয়ে বাঁচতে চাই না। হীরা হতে যা যা করা লাগে, সবকিছুর জন্যই আমি প্রস্তুত।’

দুই বছর আগেই বিপিএল খেলা রোহানের ক্যারিয়ারে এখনো কেবল ১১ লিস্ট ‘এ’ আর দুই স্বীকৃত টি-টুয়েন্টি খেলার অভিজ্ঞতায় আটকে আছে। তবে স্বপ্নের ডানা মেলার শুরুটা তো হলো কেবলই। থমকে থাকা পথচলাটা তিনি নতুন করে শুরু করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় ট্রাই সিরিজে।

সেখান থেকেই উড়াল দেবেন অস্ট্রেলিয়ার টপ এন্ড টি-টুয়েন্টিতে। এরপর হয়তো অন্য কোথাও। অথবা কে জানে, আবার হঠাৎ তাঁকে থমকে দেবে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। কিন্তু দুই বছরের দীর্ঘ চোট তাঁকে শিখিয়ে গেছে অনেক কিছু, ‘এখন আমার খারাপ হলেও কিছু যায়–আসে না, ভালো হলেও না। কারণ, আমি জানি যেখান থেকে কষ্ট আসবে, ওখান থেকেই সুখ আসবে।’

আলাদা করে কোনো ক্রিকেটার আদর্শ মানেন না। গতির কারণে যশপ্রীত বুমরা আর সুইংয়ের কারণে পছন্দ করেন ভুবনেশ্বর কুমারকে—তাঁদেরও চোটের সঙ্গে লড়াইয়ের গল্প আছে। তবু তাঁরা নাম খোদাই করেছেন আলাদা করে।

রোহান উদ দৌলা কি পারবেন? ওই উত্তরের জন্য আগামী কয়েক বছর তাঁর দিকে চোখ রাখা যেতে পারে। যাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর ভাষায় ‘ক্যারেক্টার’ আর ‘মানসিক শক্তি’; তিনি বোধ হয় হতাশ করবেন না!

আরও পড়ুন