তানজিদ–নাজমুলের পর আবার হাসান, ডারউইনে দ্বিতীয় দিনও বাংলাদেশের
ছয় সেশনের মধ্যে কেবল একটিতেই একটু হাসি–আনন্দ করতে পারল অস্ট্রেলিয়ানরা। সেটিও আজ দিনের শেষ সেশনে। সারা দিনে বাংলাদেশের যে পাঁচটি উইকেট অস্ট্রেলিয়া নিতে পেরেছে, এই সেশনেই এসেছে তার তিনটি। এটুকু বাদ দিলে ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনের মতো আজ দ্বিতীয় দিনটাও ছিল বাংলাদেশেরই।
একটি সেঞ্চুরি, একটি সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগানো ইনিংস, একটি শতোর্ধ্ব রানের জুটি এবং শতরানের কাছাকাছি আরেকটি জুটি মিলিয়ে বোলিংয়ের মতো প্রথম ইনিংসের ব্যাটিংয়েও বাংলাদেশের জ্বলজ্বলে পারফরম্যান্স। হাসান মাহমুদের আগুনে পুড়ে গতকাল অস্ট্রেলিয়া অলআউট হয় ১৯৮ রানে। আজ দ্বিতীয় দিন শেষে ৬ উইকেটে ৩৫১ রান করে বাংলাদেশ এগিয়ে ১৫৩ রানে। ডারউইনে এমন কিছুর জন্য নিশ্চয়ই প্রস্তুত ছিল না অস্ট্রেলিয়া। তবে দ্বিতীয় দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশকেই কৃতিত্ব দিয়ে গেছেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার বো ওয়েবস্টার।
বাংলাদেশকে এমন দিন এনে দেওয়ার মূল কৃতিত্ব ওপেনার তানজিদ হাসান ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেই তানজিদ করেছেন প্রথম সেঞ্চুরি। তাঁর ১৯৭ বলে ১০১ রানের ইনিংসটি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেই টেস্টে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের প্রথম সেঞ্চুরি। নাজমুল শতরানের দেখা পাননি, তবে বাংলাদেশের আরেকটি ভালো দিনে ১২৬ বলে তাঁর ৮৪ রানের ইনিংসেরও আছে বড় ভূমিকা।
ডারউইনে এখন শীতকাল হলেও সেই শীতের ধরনটা কেমন, তা বোঝা গেল আজ দুপুরে স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ভেসে ওঠা এক সতর্কবার্তায়; যাতে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা অনেক বেশি। সবাই যেন পর্যাপ্ত পানি পান করে এবং সানস্ক্রিন ব্যবহার করে।
নাজমুল যে সময়ে উইকেটে আসেন, ডারউইনের এই গা জ্বালানো রোদের ‘শীতে’ও বাংলাদেশের ইনিংসে তখন বসন্তের হাওয়া। জশ হ্যাজলউডের করা অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের বলে মারতে গিয়ে প্রথম সেশনে মুমিনুল হক কট বিহাইন্ড হয়ে যান ফিফটি থেকে মাত্র ১ রান দূরে থাকতে। কিন্তু যাওয়ার আগে দ্বিতীয় উইকেটে তানজিদের সঙ্গে গড়ে দিয়ে যান ১০২ রানের জুটি। বাংলাদেশের সাড়ে তিন শ পেরিয়ে যাওয়ার প্রথম ভিত গড়ে দিয়েছিল সেটাই।
স্কোরবোর্ডে ২ উইকেটে ১৩৮ রান, উইকেট তখনো বেশ ব্যাটিং–বান্ধব। মুমিনুল ফিরে যাওয়ার পর তানজিদের সঙ্গে অধিনায়ক নাজমুলের কাজ ছিল আরেকটি বড় জুটির সঙ্গী হওয়া, নিজেও বড় ইনিংস খেলা।
দুটিতেই সফল বলতে হবে তাঁকে। তানজিদের সেঞ্চুরির একটু আগেই নাজমুল পূর্ণ করেন নিজের ফিফটি, সেঞ্চুরির পরপর তানজিদ আউট হওয়ার আগে তৃতীয় উইকেটে দুজনের জুটি দাঁড়ায় ৯৩ রানের। নাথান লায়নের একটা বল লং অফে পাঠিয়ে ১ রান নিয়ে নাজমুল ফিফটি পেয়ে যান ৭৪ বল খেলেই।
টেস্ট ক্রিকেটে এর আগে ১৫ বার ফিফটি করে ৯ বারই তিন অঙ্কে পৌঁছেছেন। নাজমুলের ফিফটি হলেই তাই সেঞ্চুরির সুবাস ছড়াতে শুরু করে। ডারউইন টেস্টেও তা হলে বাংলাদেশের স্বপ্নের পরিধিটা আরও বড় হতে পারত। কিন্তু হ্যাজলউড নতুন বল হাতে নেওয়ার পরই ছোটখাটো একটা বিপর্যয়, নাজমুলকে দিয়েই যার শুরু।
নতুন বলে একটু বেশি বাউন্স পেয়েছিলেন হ্যাজলউড। অফ স্টাম্পের বাইরের সে বলটা ঠিকঠাক সামলাতে না পেরে স্লিপে স্মিথের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফিরতে নয় নাজমুলকে। তাতে ভেঙে যায় মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে তাঁর ৯৮ বলে ৬৬ রানের জুটি।
দলের ২৯৭ রানে নাজমুল আউট হয়েছেন ৮২তম ওভারে। এরপর ৮৫ ও ৮৬তম ওভারে কামিন্স আর মিচেল স্টার্কের বলে বাংলাদেশে হারায় আরও দুই স্বীকৃত ব্যাটসম্যান লিটন দাস আর মুশফিকুর রহিমকে। ৩ উইকেটে ২৯৭ থেকে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ৫ ওভারের মধ্যে হয়ে যায় ৩০৮/৬।
দিনের তখনো অনেকটা খেলা বাকি ছিল বলে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ হয়তো অলআউটই হয়ে যাবে আজ। ব্যাট করার মতো আর তো ছিলেন কেবল মেহেদী হাসান মিরাজ, অন্যদের মূল পরিচয় বোলার।
কিন্তু বল হাতে ৬ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ ব্যাট হাতেও মিরাজের সঙ্গে এমনই দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন যে বাংলাদেশকে অলআউট করতে অপেক্ষায় থেকেই দিন শেষ হলো অস্ট্রেলিয়ার।
সপ্তম উইকেটে ২৪.৩ ওভার অবিচ্ছিন্ন থেকেছে মিরাজ–হাসানের সপ্তম উইকেট জুটি; এই সময়ে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে যোগ হয়েছে আরও ৪৩ রান। ৭৩ বলে ৩২ রানে অপরাজিত মিরাজের সঙ্গে হাসানের স্কোরটাই বেশি বিস্ময় জাগায়। দুটি বাউন্ডারি মেরে তিনি অপরাজিত ১৬ রানে, তবে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের চরম হতাশা উপহার দিয়ে বল খেলেছেন ৭৬টি। শেষ দিকে আর উইকেট ফেলতে না পেরে অন্য পথেও গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা। কিন্তু তাঁদের স্লেজিং মনঃসংযোগে কোনো ব্যাঘাতই ঘটাতে পারেনি মিরাজ–হাসানের।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ১১০ ওভারে ৩৫১/৬ (তানজিদ ১০১, নাজমুল ৮৪, মুমিনুল ৪৯, মুশফিক ৩৬, মিরাজ ৩২*, হাসান ১৩* ; স্টার্ক ২/৬৮, হ্যাজলউড ২/৬৮, কামিন্স ১/৫০)। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ১৯৮। —দ্বিতীয় দিন শেষে।
