বালোতেল্লির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররাও বলতে পারেন, ‘কেন সব সময় আমাদের সঙ্গেই এমনটা ঘটে!’ যে-ই না কোনো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের একটু সম্ভাবনা জাগে, এই যেমন সেমিফাইনাল-টাইনালে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, আম্পায়ারের কোনো ‘ভুল’ সিদ্ধান্তে সবকিছু ভেস্তে যায়!

কখনো কখনো আম্পায়ারদের উপহার দেওয়া ‘ভুল’ সিদ্ধান্ত হয়তো বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ‘উপহার’ দেয় আক্ষেপের তেতো স্বাদ। কিন্তু প্রতিটি টুর্নামেন্টেই তো বাংলাদেশের সমর্থকদের সঙ্গী হয় কিছু ‘আহা, ইস্‌, একটুর জন্য’ রকমের কিছু শব্দ আর চুলছেঁড়া অভিজ্ঞতা! আর এগুলো রচিত হয় টুর্নামেন্টের বাঁকে বাঁকে কখনো তীরে এসে তরি ডোবায় বা কখনো ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করতে না পারায়! এমন ‘আহা, ইস্‌, একটুর জন্য’ শব্দগুলোর পাণ্ডুলিপি রচনা করেন কারা? নিশ্চয়ই বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা ব্যাট-বলে ব্যর্থতা দিয়ে!

এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কথাই ধরুন, পাকিস্তানের বিপক্ষে সুপার টুয়েলভে নিজেদের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে জিতলেই সেমিফাইনালে উঠত বাংলাদেশ। কিন্তু হলো কী? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে গোটা বিশ্বের ক্রিকেট মহলে ঝড় ওঠা ওই ঘটনা—সাকিব আল হাসানের বিতর্কিত এলবিডব্লু!

মাঠের আম্পায়ার ভুল করার পর টিভি আম্পায়ারও সেই ভুল শোধরাননি। বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা তো আক্ষেপে পুড়ছেনই, বিভিন্ন দেশের সাবেক ক্রিকেটাররাও বলছেন—এটি আসলে আউট ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার টম মুডি, ভারতের আকাশ চোপড়া, খোদ পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম ও মিসবাহ উল হকেরা এটিকে দেখছেন সাকিবের সঙ্গে ‘অন্যায়’ হিসেবে।

এর সঙ্গে বাংলাদেশের সমর্থকদের হাহুতাশ আর সমালোচনা তো আছেই। ঘটনা গতকালের, কিন্তু ক্ষত যে এখনো শুকায়নি তা বোঝা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই। কিন্তু ম্যাচটির দিকে যদি তাকান, সাকিব ‘ভুল’ আউটই কি পরাজয়ের একমাত্র কারণ?

সাকিব আউট হওয়ার আগের বলে বাংলাদেশের রান ছিল ১০.৪ ওভারে ৭৩। এখান থেকে ২০ ওভারে ৮ উইকেটে মাত্র ১২৭ রান তুলতে পারে সাকিবের দল। এরপর ছোট পুঁজি নিয়ে খেলতে ফিল্ডিংয়ে নেমে প্রথম ওভারেই তাসকিনের বলে সহজ ক্যাচ মিস করেছেন উইকেটকিপার নুরুল হাসান। এর আগে ব্যাট হাতে পুরো টুর্নামেন্টের মতোই পাকিস্তানের বিপক্ষেও নাজমুল হোসেন খেলেছেন ওয়ানডে-সুলভ ইনিংস। ৪৮ বলে করেছেন ৫৪ রান।

শুধু পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচই নয়, সময়ের চাকায় ঘুরে পুরো টুর্নামেন্টটা দেখে এলে বাংলাদেশ কি মনে রাখার মতো কোনো পারফরম্যান্স করেছে? একের পর এক ‘ভুলে ভরা গল্প’ রচনা না করলে পাকিস্তান ম্যাচের আগেই হয়তো সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলতে পারত বাংলাদেশ! নেদারল্যান্ডস আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয় পেলেও টুর্নামেন্টজুড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং ছিল অনেকটাই এলেমেলো।

ভারতের বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে লিটন দাসকে তাঁর আসল জায়গা ওপেনিং ফিরিয়ে দেওয়ায় ব্যাট হাতে জ্বলে উঠেছিলেন। রান তাড়া করতে নেমে তাঁর ২৭ বলে ৬০ রানের ঝড়ের পরও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। জিততে পারেনি পরের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায়।

অথচ ম্যাচ শেষে আলোচনায় এসব ছিল না। আম্পায়াররা ভেজা মাঠে খেলা আবার শুরু করে দিয়েছিলেন কি না, এর সঙ্গে যোগ হলো বিরাট কোহলির ‘ফেক ফিল্ডিং’। ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা হারিয়েই গেল এর আড়ালে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে যাঁর আউট নিয়ে ঝড় উঠেছে, সেই সাকিব, বাংলাদেশের অধিনায়ক তথা দেশসেরা অলরাউন্ডার ব্যাট আর বল হাতে টুর্নামেন্টে কী করেছেন? ৫ ম্যাচে ৪৪ রানের বেশি করতে পারেননি। বোলিংয়েও ৫ ম্যাচে নিয়েছেন ৬ উইকেট, ২৭.৮৩ গড় ও ৮.৭৮ ইকোনমি রেটে বোলিং করে। সব মিলিয়ে ব্যক্তিনৈপুণ্যে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা অন্য অনেক দেশের চেয়েই পিছিয়ে ছিলেন। এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলে মনে রাখার মতো পারফরম্যান্স শুধু তাসকিন আহমেদের। ১৬.৩৭ গড়ে ও ৭.২৭ ইকোনমিতে ৫ ম্যাচে যাঁর ৮ উইকেট।

এই যে তাসকিন ছাড়া এবারের বিশ্বকাপ দলে বাংলাদেশের আর কারও মনে রাখার মতো কোনো পারফরম্যান্স নেই, অধিনায়ক সাকিবের নিষ্প্রভ হয়ে থাকা—সবকিছুই এখন ঢাকা পড়ে গেছে ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের দুটি বিতর্কে! এর আগেও এমন বিতর্কে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ব্যর্থতা চাপ পড়েছে। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ তো বেশি দূরের কথা নয়, সবারই মনে থাকার কথা। সেবারও বাংলাদেশের সামনে ছিল সেমিফাইনালে ওঠার সুযোগ। টুর্নামেন্টে ভালোও খেলেছিল বাংলাদেশ। তবে মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ভারতের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি মাশরাফি বিন মুর্তজার দল।

১০৯ রানের বিশাল ব্যবধানে হারার পরও সব আলোচনা কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় রুবেলের ফুলটসে রোহিত শর্মা ক্যাচ দেওয়ার পর আম্পায়ার উচ্চতার কারণে নো বল ডাকায়। সঙ্গে যোগ হয় বাউন্ডারি লাইনে শিখর ধাওয়ানের নেওয়া মাহমুদউল্লাহর ক্যাচটির বৈধতার প্রশ্ন।

ভারতের বিপক্ষে সেই ম্যাচের পর আইসিসির বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধই ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশের সমর্থকেরা! সেই সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল আইসিসির প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ হিসেবেও বাংলাদেশ দলের প্রতি এই ‘অন্যায়’কেই কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন! সেই সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড বা সমর্থকেরা দেখতেই পেল না—রোহিতের যে ক্যাচটিতে ‘নো’ বল দেওয়া হয়েছিল, তিনি তখন ছিলেন ৯০ রানে। ক্ষতি যা করার তিনি ততক্ষণে করে ফেলেছেন! আর মাহমুদউল্লাহ যখন আউট হয়েছেন, তিনি ব্যাট হাতে ভারতের ক্ষতির শুরুই করতে পারেননি। আসলে ব্যাট আর বলে বাজে খেলেই হেরেছে বাংলাদেশ।

সব মিলিয়ে বলতে হচ্ছে, বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের কী ভাগ্য! তাঁদের বাজে পারফরম্যান্স আর ব্যর্থতা চাপা পড়ে যায় বিতর্কে! কিন্তু এসব করে কি বড় দল হওয়া সম্ভব?

এবার ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচের পর ওঠা বিতর্ক নিয়ে সে দেশের ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে যেমন টুইট করেছেন, ‘আমার বাংলাদেশের বন্ধুদের বলব, লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারার দায় ফেক ফিল্ডিং বা ভেজা কন্ডিশনকে দেবেন না। যদি একজন ব্যাটসম্যানও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারত, ম্যাচটা বাংলাদেশ জিতত...অজুহাত খুঁজলে বড় হওয়া যায় না।’