অলিম্পিকে ক্রিকেট ফেরার সবচেয়ে বড় যে কারণ
১২৮ বছর পর আবার অলিম্পিকে ফিরছে ক্রিকেট। এটা অবশ্য পুরোনো খবর। তবে এটাকে শুধু একটা খেলার বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে প্রত্যাবর্তন, কিংবা অলিম্পিকের আরও বৈশ্বিক হওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে অলিম্পিকের কর্তাব্যক্তিদের বিশাল বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশও জড়িত। বরং সেটাই হয়তো অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে ক্রিকেটকে অলিম্পিকে ফেরানোর সিদ্ধান্তে।
এর আগে অলিম্পিকে একবারই ক্রিকেট দেখা গিয়েছিল, ১৯০০ সালে প্যারিসে। সেবার দুই দিনের ম্যাচে ফ্রান্সকে ১৫৮ রানে হারিয়ে সোনা জিতেছিল গ্রেট ব্রিটেন। এক শতাব্দীরও বেশি অপেক্ষা শেষে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে আবার ক্রিকেটকে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি)।
সাম্প্রতিক সময়ে অলিম্পিক গেমসে অনেক নতুন খেলাই যুক্ত হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই আইওসিকে এমন কিছু উপহার দিতে পারেনি, যা ক্রিকেট দিতে যাচ্ছে। ২০০ কোটিরও বেশি অনুসারী আর ভারতীয় বাজারের বিপুল বাণিজ্যিক শক্তি। সেই হিসাবে অলিম্পিকের জন্য বিগত কয়েক দশকের মধ্যে ক্রিকেটই হয়তো সবচেয়ে মূল্যবান সংযোজন হতে যাচ্ছে।
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইওসির স্পোর্টস ডিরেক্টর পিয়ের দুক্রে বলেছেন, ‘অলিম্পিকে না থাকা বিশ্বের প্রধান খেলাগুলোর অন্যতম ছিল ক্রিকেট। এমন সব বাজারে ক্রিকেট দারুণ শক্তিশালী, যেখানে অলিম্পিক গেমস হয়তো এখনো ততটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।’ তাঁর কথা, ‘ক্রিকেট এমন দর্শক আনবে, যারা নিয়মিত অলিম্পিক দেখে না। এটা দুই পক্ষেরই লাভ। আমরা নতুন সুযোগ দেব, আর তারা আমাদের আকর্ষণ বাড়াবে।’
ক্রিকেট ফেরার আগেই অলিম্পিক ঘিরে এর বাণিজ্যিক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ২০২৮ অলিম্পিকের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশে সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে ইতিমধ্যেই ‘জোরালো আগ্রহ’ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে আইওসি। আইওসি টেলিভিশন ও মার্কেটিং বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যান-সোফি ভুমার্দ ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই স্বত্বের মূল্য ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের চেয়ে ‘বহুগুণ’ বেশি হতে পারে। প্যারিস অলিম্পিকের সম্প্রচার স্বত্বের ভিত্তিমূল্য ছিল প্রায় ৩ কোটি ডলার।
আইওসির এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা এই অঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। বাজারে আগ্রহ স্পষ্ট। এটা একদিকে এলএ ২০২৮ অলিম্পিকের জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে ক্রিকেট যোগ হওয়ার ফল।’
ভারতের মিডিয়া বাজারে অলিম্পিক ও ক্রিকেটের সম্পর্ক আগেই তৈরি। ২০২৪ সালে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও ওয়াল্ট ডিজনির যৌথ উদ্যোগে গঠিত ধনকুবের মুকেশ আম্বানির ভারতীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান জিওস্টার ২০২৪ প্যারিস গেমস এবং ২০২৬ মিলানো কর্তিনা শীতকালীন গেমসের সম্প্রচার স্বত্ব নিয়ে রেখেছে। একই সঙ্গে তাদের হাতেই আছে আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্বও। আবার আম্বানির স্ত্রী নীতা আম্বানি আইওসির সদস্য এবং ২০২৩ সালে মুম্বাইয়ে আইওসি সেশনের আয়োজকও ছিলেন।
২০১০ সালে আইওসি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) স্বীকৃতি দেওয়ার পর অলিম্পিকে ক্রিকেটের ফেরা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়। তবে ঐতিহ্যবাহী পাঁচ দিনের টেস্ট কিংবা আট ঘণ্টার এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ অলিম্পিকের আঁটসাঁট সূচির জন্য ছিল একেবারে বেমানান। গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে আসলে টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট। তিন ঘণ্টার ধুন্ধুমার ক্রিকেট কেবল তরুণ দর্শকই টানছে না, অলিম্পিকের দরজাও খুলে দিয়েছে। ২০১৪ সালে আইওসির নতুন নিয়ম অনুযায়ী স্বাগতিক শহরগুলো নিজেদের পছন্দের নতুন খেলা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ পায়। লস অ্যাঞ্জেলেস সেই সুযোগটিই লুফে নিয়ে ক্রিকেটকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তা গ্রহণ করা হয়।
সংক্ষিপ্ত সময়ের বাইরেও টি-টুয়েন্টির প্রবল অনিশ্চয়তা আর বৈশ্বিক বিস্তৃতি একে অলিম্পিকের জন্য যেন তৈরি করেই দিয়েছে বলে মনে করেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী সঞ্জোগ গুপ্ত। জিওস্টারের স্পোর্টস অ্যান্ড লাইভ এক্সপেরিয়েন্সের সাবেক প্রধান নির্বাহী সঞ্জোগ রয়টার্সকে বলেছেন, ‘লাইভ খেলার আসল রোমাঞ্চ হলো তার অনিশ্চয়তা, আর এই সংস্করণে তা সবচেয়ে বেশি। টেস্ট ম্যাচ যেখানে মাত্র ১২টি পূর্ণাঙ্গ সদস্যদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে টি-টুয়েন্টি হলো ক্রিকেটের সত্যিকার বিশ্বজনীন রূপ। টি-টুয়েন্টি বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটের প্রসার ঘটিয়েছে, একে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম বানিয়েছে। এটি অলিম্পিকের সব শর্তই পূরণ করে।’
ক্রিকেটের এই বাণিজ্যিক উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আইপিএল। গত দুই দশকে এই টুর্নামেন্ট গোটা খেলাটাকেই পাল্টে দিয়েছে, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের টেনে এনেছে এবং হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান টুর্নামেন্টগুলোর একটি। ১০ দলের আইপিএলের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার, আর ২০২৬ মৌসুমে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে এই টুর্নামেন্ট দেখেছেন ১২০ কোটি দর্শক।
ভৌগোলিক সম্প্রসারণের বাইরেও ক্রিকেট এনে দিচ্ছে এমন এক দর্শকশ্রেণি, যা অলিম্পিকের জন্য অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত। সঞ্জোগ গুপ্তর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্রিকেটের অনুসারীদের প্রায় ৫০ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে, আর ৩৫ শতাংশের বয়স ২৭ বছরের নিচে, যা ক্রিকেটকে করে তুলেছে ‘ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত’। সঞ্জোগ যা বোঝাতে চেয়েছেন, তা হলো এই বয়সী দর্শক ক্রিকেটের হাত ধরে অলিম্পিকেও আগ্রহী হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে ২০২৮ সালের পরও অলিম্পিকে ক্রিকেট থেকে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০৩২ অলিম্পিক হবে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে, যেখানে ক্রিকেটের ঐতিহ্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ২০৩৬ সালের অলিম্পিক আহমেদাবাদে আয়োজন করতেও চেষ্টা চালাচ্ছে ‘ক্রিকেটের দেশ’ ভারত।