হাত নেই, পা নেই—তবু ক্রিকেট খেলছেন তাঁরা
কাঠের লাঠিতে ভর করে আছেন সাগর ইসলাম। কোমরের নিচ থেকে বাঁ পা বলে কিছু নেই। ডান পায়ের সঙ্গে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি ওই কাঠের লাঠিটাই। একটু পরই তিনি শুরু করলেন দৌড়। এটুকু শুনলেই অদ্ভুত শোনাবে যে কারও। এক পা আর লাঠিতে ভর করেই দৌড়!
বিস্ময়টা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাবে পরের তথ্যটা জানলে—সাগর দৌড়াচ্ছেন আসলে বোলার হিসেবে। তাঁর হাতে বল, সামনে দাঁড়িয়ে একজন ব্যাটসম্যান। ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেটারদের জন্য ট্রায়াল ক্যাম্প, যেখানে সবার গল্পই দিনাজপুরে রিকশা চালিয়ে সংসার চালানো সাগরের মতো। ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে পা হারানোর পরও থেমে যায়নি যাঁর ক্রিকেট স্বপ্ন। কারও হাত নেই, কারও পা, কারও আবার অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা। সবার একটাই পরিচয়—ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ক্রিকেটার।
গাজীপুরের সিয়ামের গল্পটাই শুনুন। ছোটবেলায় গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার পর হাতে ব্যান্ডেজ পরানো হয়েছিল তাঁর। সেই হাতে এমনই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে যে পুরো হাতই কেটে ফেলতে হয়েছে সেই পাঁচ বছর বয়সে। প্রতিদিন এলাকার ছেলেদের ক্রিকেট খেলতে দেখতেন অসহায় চোখে। এরপর একদিন নিজেও ব্যাট–বল হাতে নেন, যেটির গন্তব্য কাল ব্যাট–প্যাড পরে পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হয়ে বসুন্ধরা ক্রিকেট মাঠের ইনডোরে ২৬ বছরের সিয়ামের এক হাতেই ব্যাটিং করা।
এসব ছোট ছোট গল্পকে জোড়া লাগিয়ে ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড দল তৈরির চেষ্টার কাজটা করছেন বাংলাদেশ প্যারা অলিম্পিক কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার সানোয়ার হোসেন। বিসিবির সঙ্গে তাঁদের সংযোগটাও হচ্ছে তাঁর হাত ধরেই।
গত দুই দিন ১৮০ ক্রিকেটারের মধ্য থেকে বাছাই করা হয়েছে ২০ জনকে। সানোয়ারের ডাকে সাড়া দিয়ে দুদিনই বাংলাদেশের অনেক ক্রিকেট তারকা ঘুরে গেছেন এখানে। স্বপ্নের নায়কদের কাছ থেকে দেখার রোমাঞ্চে ভেসেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করেও ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর সাগর–সিয়ামরা। গত পরশু ঘুরে গেছেন আকরাম খান, হাবিবুল বাশার, খালেদ মাসুদ ও তামিম ইকবাল। গতকাল এসেছিলেন মুশফিকুর রহিম ও জাভেদ ওমর।
মিরপুরে অনুশীলন শেষ করে মুশফিক যখন এলেন, একটা হুড়াহুড়িই শুরু হয়ে গেল। হিড়িক পড়ে যায় সেলফি তোলার, মুশফিক একে একে হাত মেলান সবার সঙ্গে। একটু পর নিজেও ব্যাট–বল হাতে নেন তাঁদের অনুপ্রেরণা দিতে।
মাইক্রোফোন হাতে মুশফিক যদিও উল্টো বলেছেন, ‘আপনাদের দেখে আমি অনেক অনুপ্রাণিত হই।’ কেন, সেই ব্যাখ্যাও আছে জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়কের কথাতে, ‘আমাদের অনেক সময় ছোটখাটো ইনজুরি হয়, অনেক কষ্ট হয়—সেই জায়গা থেকে আপনারা জীবনভর এটা বয়ে চলেন, এটা কল্পনা করলে খুবই কষ্ট লাগে।’ মুশফিকের সুরে সুর মিলিয়ে জাভেদ ওমরও বললেন প্রায় একই কথা।
এই ক্রিকেটারদের নিয়ে সামনে বড় পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সানোয়ার। কিছুদিন পর ভারতে একটি টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়ার কথা আছে। স্পেশাল অলিম্পিকের মতো বৈশ্বিক আসরে দল পাঠানোরও। সানোয়ার এসব স্বপ্ন ছড়িয়ে দিয়েছেন এই ভাগ্যবিড়ম্বিত ক্রিকেটারদের মনে। সেই স্বপ্ন হয়তো ডালপালাও ছড়াতে শুরু করেছে। করারই কথা। হাত নেই, পা নেই তারপরও যাঁরা ক্রিকেট খেলতে পারেন, তাঁদের স্বপ্নটা তো আকাশছোঁয়া হওয়ারই কথা!