ঝড়ের পর বৃষ্টি আসে। লিটন–ঝড়ের পরও সেটাই এলে অ্যাডিলেড ওভালে। আর সেই বৃষ্টিতেই যেন খেই হারাল বাংলাদেশ। প্রায় ৫২ মিনিট খেলা বন্ধ থাকার পর যখন আবার তা শুরু হলো, নাজমুলের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে দ্বিতীয় বলেই রানআউট লিটন। সেখান থেকে বাংলাদেশ শুধু হারের দিকেই এগোল। শেষ দিকে কিছুটা রোমাঞ্চ ছড়িয়ে হারটা শেষ পর্যন্ত ৫ রানের।

বৃষ্টির আগে লিটনের ২৭ বলে ৬০ রানের ইনিংসটা ছিল টি–টোয়েন্টির ব্যাটিং বিনোদনে ভরপুর। কিন্তু ভারতের ১৮৪ রানের জবাব দিতে নেমে ৭ ওভার শেষেই ওই বৃষ্টির ছন্দপতন। ২১ বলে ফিফটি করে লিটন দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ৬৬ রানে। সাত বাউন্ডারির সঙ্গে তিনটি দুর্দান্ত ছক্কা, নিজে অপরাজিত ছিলেন মাত্র ২৬ বলে ৫৯ করে। নাজমুলের ছিল ১৬ বলে ৭ রান।

স্থানীয় সময় রাত ৯টা ৫০ মিনিটে খেলা শুরু হলে ডিএলএসে বাংলাদেশের নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৬ ওভারে ১৫১ রান। অর্থাৎ বাকি ৯ ওভারে করতে হবে ৮৫। নতুন লক্ষ্যে বাংলাদেশের যে খুব অসুবিধা হয়েছিল তা নয়। জেতার জন্য ওভারপ্রতি রান বাড়েনি, বরং কিছুটা কমেই গিয়েছিল। কিন্তু মাঝে ড্রেসিংরুমে কাটিয়ে আসা সময়টাতে যেন মাঠের উত্তাপ আর ছন্দ হারিয়ে গেল তাঁদের মধ্য থেকে। ব্যাটিংয়ের তাল–লয় গেল কেটে।

অবশ্য বৃষ্টিতে একটা ক্ষতি তো হয়েছেই। একবার রান নিতে গিয়ে ভেজা ঘাসে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন লিটন। পরে কে এল রাহুলের সরাসরি থ্রোতে যে বলে রান আউট হলেন, সে বলেও দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে ভেজা মাঠের কারণে গতি হারান তিনি।

লিটনের ওই আউটের পর বাংলাদেশ যেন তাদের লক্ষ্যটাই হারিয়ে ফেলে। ৭.২ ওভার থেকে ১২.৫—এই ৩৪ বলের মধ্যে বাংলাদেশ লিটনসহ হারায় নাজমুল-আফিফ-সাকিব-ইয়াসির-মোসাদ্দেকের উইকেট। শুরুতেই বেড়ে যাওয়া রান-বলের ব্যবধানটা পরে খুব বেশি কমাতে পারেননি নাজমুল। অন্য কেউও পারেননি ঝোড়ো ইনিংস খেলে সেটা পুষিয়ে দিতে।

খেলা যত এগিয়েছে, গ্যালারিতে ভারতীয় দর্শকদের আনন্দে ভাসিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে সাকিবের দল। বাংলাদেশের দর্শকদের হাত থেকে নেমে গেছে লাল–সবুজ পতাকা।

বৃষ্টি এবং বৃষ্টির পর মাঠ খেলার উপযোগী করে তুলতে সময় চলে গিয়েছিল ৫২ মিনিট। এই সময় বাংলাদেশ শিবিরে যত না টেনশন ছড়ানোর কথা, তার চেয়ে বেশি ছড়ানোর কথা ভারতীয় শিবিরে। লিটনের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে তখন যে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডটাই বেশি ঝলমলে লাগছিল!

বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই টিভি পর্দায় ভেসে ওঠে ডিএলএসের হিসাব। বাংলাদেশ ১৭ রানে এগিয়ে। ড্রেসিংরুমের সামনে বিরাট কোহলি আর আম্পায়ার মরিস এরাসমাসের সঙ্গে সাকিব আল হাসানের দুষ্টুমি বলে দিচ্ছিল বেশ নির্ভারই ছিলেন তিনি তখন। কিন্তু পরে যখন ডিএলএসে বাংলাদেশের নতুন লক্ষ্য ঠিক হচ্ছিল, ওই সময় আম্পায়ারদের কোনো একটা সিদ্ধান্ত যেন মানতে পারছিলেন না সাকিব। রোহিতের উপস্থিতিতেই আম্পায়ারদের সঙ্গে কিছু একটা নিয়ে মতের মিল হচ্ছিল না বাংলাদেশ অধিনায়কের। সাকিব এরপর ডাগআউটে ফিরে গেছেন হতাশ চেহারা নিয়ে।

দ্বিতীয়বার ব্যাটিংয়ে নামার পর শেষ দিকেই শুধু মনে হয়েছে, একটা শেষ চেষ্টা করলে হয়তো বাংলাদেশের সম্ভাবনা আছে। শেষ ওভারে দরকার ছিল ২০ রান, উইকেটে ছিলেন নুরুল হাসান ও তাসকিন আহমেদ। প্রথম বলে ১ রান নিয়ে তাসকিন প্রান্ত দিয়ে দেন নুরুলকে। নুরুল একটা ছক্কা আর একটা চার মারলেও জয়ের জন্য দরকার ছিল আরও কিছু।

লিটনের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের সৌজন্যে পাওয়ার–প্লেতেই বাংলাদেশ নিয়েছিল কোনো উইকেট না হারিয়ে ৬০ রান। কিন্তু এর আগে ব্যাটিংয়ে পাওয়ার–প্লের ৬ ওভার নিয়ে ভারতীয় দলেও নিশ্চিত অতৃপ্তি ছিল। ৬ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৩৭। বাংলাদেশের বোলিংয়ের বিপক্ষে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের জন্য এটা কোনো রান!

আবার দলটা ভারত বলেই ইনিংসের যেকোনো সময় ‘পাওয়ার–প্লে’র আমেজ নিয়ে আসা যায়, শুধু এক–দুইটা মোক্ষম ওভার পেতে হবে। নবম ওভারে বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার শরীফুল ইসলাম সেই সুযোগটাই দিয়ে দিলেন রোহিত শর্মার দলকে।

৮ ওভার শেষেও ভারতের রান ছিল ১ উইকেটে ৫২। ৯ ওভার শেষে ওই ১ উইকেটেই ৭৬! নিজের দ্বিতীয় ওভার করতে এসে শরীফুল দিয়ে দিলেন ২৪ রান। মিড অফ দিয়ে বিরাট কোহলির বাউন্ডারিতে শুরু। পরে কে এল রাহুল মেরেছেন দুই ছক্কা আর এক চার। ম্যাচটা যেন ওই ওভারেই চলে গেছে ভারতের হাতে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামনে ১৮৫ রানের লক্ষ্য, এত রান তাড়া করে এবারের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর কোনো দলই জেতেনি। বাংলাদেশ কি পারবে অসাধ্য সাধন করতে? প্রায় ৩০ হাজার দর্শকের বেশির ভাগই এই প্রশ্নে ‘না’ ভোটই দিয়ে থাকবেন। বেশির ভাগ দর্শক যে ছিলেন ভারতীয়ই! বাংলাদেশের দর্শকও ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের আর উৎসব করে ঘরে ফেরা হয়নি। ভারতের কাছে হেরে বাংলাদেশের বিশ্বকাপটাই যে প্রায় দিগন্ত দেখে ফেলেছে!