হাসানের হাত ধরে ডারউইনে বাংলাদেশের উজ্জ্বল দিন

৬ উইকেট নিয়েছেন যে বল দিয়ে, মাঠ ছাড়ার সময় সেই বলটা দেখাচ্ছেন হাসান মাহমুদশামসুল হক

খেলাটা কোথায় হচ্ছে? অস্ট্রেলিয়ায় না বাংলাদেশে!

মারারা স্টেডিয়ামের উইকেট কাদের বেশি পরিচিত হওয়ার কথা? অস্ট্রেলিয়া না বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের!

প্রশ্নটা মাথায় এসেছিল ডারউইন টেস্টের প্রথম সেশনেই, যখন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানরা রীতিমতো সংগ্রাম করছিলেন বাংলাদেশের বোলিংয়ের সামনে। যদিও দুটি প্রশ্নের উত্তরই কারও অজানা নয়, তবু দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর একটু ব্যাখ্যা দাবি করে। মারারা উইকেটে এর আগে বাংলাদেশ তো নয়ই, অস্ট্রেলিয়ার এই দলটাও কখনো টেস্ট খেলেনি। কাজেই এই জায়গায় দুই দলই সমান সমান।

তবে ২২ বছর পর ডারউইনে টেস্ট ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তন দিবসে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে এটিকে হয়তো যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাবে না অস্ট্রেলিয়া দলও। প্রথম সেশনে ৭৪ রানে ৪ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়া যে টেস্টের প্রথম দিনেই ১৯৮ রানে অলআউট হয়ে গেল; তার একটাই ব্যাখ্যা—হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের পেসারদের দুর্দান্ত বোলিং। দ্বিতীয় সেশনেও ৪ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়ার শেষ দুই উইকেট পড়েছে চা–বিরতির পর। দিনের শেষ সেশনের মাত্র ৫ ওভারই ব্যাটিং করতে পেরেছে তারা।

প্রথম দিনে আলো কেড়েছেন হাসান মাহমুদ
শামসুল হক

লাইন-লেংথ ধরে রেখে টানা ভালো জায়গায় বল করে যাওয়ার পুরস্কার হিসেবে টেস্টে তৃতীয়বারের মতো ৫ বা তার বেশি উইকেট পেয়েছেন হাসান। যেকোনো সংস্করণেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটি প্রথম পাঁচ উইকেট। ৫৫ রানে ৬ উইকেট নেওয়া হাসান এই প্রথমে নাম লেখালেন ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেই। এক প্রান্তে তাঁর অব্যাহত চাপ অন্য প্রান্তে সহজ করেছে বাকি বোলারদের কাজও।

অস্ট্রেলিয়ার বাকি চারটি উইকেটও ভাগাভাগি করে নিয়েছেন দলের অন্য দুই পেসার তাসকিন আহমেদ আর ইবাদত হোসেন। টেস্টে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো এক ইনিংসে প্রতিপক্ষের ১০ উইকেট নিলেন বাংলাদেশের পেসাররা। আগের ঘটনাটি ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে। হাসান ৫ উইকেট নিয়েছিলেন সেই ইনিংসেও।

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নেমে কিংবদন্তি সব ‘দর্শক’ পাচ্ছে বাংলাদেশ। মার্ভ হিউজ, মার্ক ওয়াহ, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, জেসন গিলেস্পি, ম্যাথু হেইডেন, সাইমন ক্যাটিচ—কে নেই এখানে! এই সিরিজে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল আর রেডিও স্টেশনের হয়ে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই ক্রিকেটাররা।

বাংলাদেশের পেসারদের পারফরম্যান্স দেখে রীতিমতো মুগ্ধ তাঁদের একজন মার্ভ হিউজ। চা–বিরতির সময় লাউঞ্জে টুকটাক কথা হলো তাঁর সঙ্গে। ধারাভাষ্যকার হিসেবে চুক্তি থাকায় বেশি কথা বললেন না, তবে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ফাস্ট বোলার হাসান মাহমুদকে দুই শব্দে প্রত্যয়ন করেছেন ‘টু গুড বোলার’ বলে। পরে প্রশংসা করেছেন অন্যদেরও, ‘বাংলাদেশের পেস বোলিংটাই এখন অনেক ভালো।’

দুর্দান্ত বোলিং করেছেন বাংলাদেশের তিন পেসার—ইবাদত, তাসকিন ও হাসান
শামসুল হক

সকালে টসের পর মারারা স্টেডিয়ামের উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ট্রাভিস হেড বলেছিলেন, ‘উইকেট দেখে বেশ শক্ত মনে হচ্ছে, যথেষ্ট ঘাসও আছে।’ এমন উইকেটে পেসাররা সুবিধা পাবে জানা কথা। কিন্তু সুবিধাটা যে বাংলাদেশের পেসাররা এত দারুণভাবে কাজে লাগাবেন, তা বোধ হয় ভাবতে পারেননি হেড-প্যাট কামিন্সরাও।
নতুন বলে বোলিং শুরু করে তাসকিন আহমেদ ও হাসান সকাল থেকেই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের অস্বস্তিতে রাখেন। প্রথম ওভারে তাসকিনের বলে পরাস্ত হন হেড, পরের ওভারে ডারউইনের ঘরের ছেলে জেক ওয়েদারাল্ডকে একই অস্বস্তিতে ফেলেন হাসান।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের পেসাররা উইকেট থেকে মুভমেন্ট, বাউন্স পেয়েছেন পুরো ইনিংসেই। হাসান নিয়মিত ভালো লেংথে বল করে গেছেন, সুইং করিয়েছেন দুই দিকেই।

মাঝেমধ্যে শট খেলার মতো বল দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটসম্যানদের লোভেও ফেলার চেষ্টা করেছেন। যেটির পুরস্কার পেয়েছেন ১২তম ওভারে ওয়েদারাল্ডকে উইকেটকিপার লিটন দাসের গ্লাভসে কট বিহাইন্ড করিয়ে।

ডারউইনের প্রথম দিনটা এরপর পুরোই হাসানময় হয়ে ওঠে। নিজের দ্বিতীয় উইকেট, মানে ট্রাভিস হেডকে ফেরানোর পর থেকেই প্রেসবক্সে অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন তিনি। সম্প্রতি ইংলিশ কাউন্টিতে ভালো বোলিং করে আসা হাসানের ব্যাপারে কেউ কেউ বাড়তি খোঁজখবরও নিচ্ছিলেন।

শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার ভিতটা নড়িয়ে দেন হাসান
শামসুল হক

৭ ওভারের প্রথম স্পেলে ২৫ রান দিয়ে ২ মেডেনসহ ২ উইকেট—হাসান অস্ট্রেলিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন দিনের শুরুতেই। সে ধাক্কা পরে আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি প্যাট কামিন্সের দল। হাসান পরে নিয়েছেন আরও ৪ উইকেট। নিজের ৬ উইকেটের মধ্যে তিনি হয়তো এগিয়ে রাখবেন স্টিভেন স্মিথের উইকেটটাকেই।

ব্যক্তিগত ২ রানে স্লিপে তানজিদ হাসানের হাতে জীবন পাওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসটা বলতে গেলে একাই টেনেছেন স্মিথ। হাসানকে ডাউন দ্য উইকেটে এসে মারতে গিয়ে আকাশে ক্যাচ তুলে দেওয়ার আগে করেছেন ১০৯ বলে ৭১ রান।
উইকেটের সুবিধা হাসান কতটা কাজে লাগিয়েছেন সেটি তাঁর করা আউটগুলোর ধরন দেখেই বোঝা যায়। প্রথম চার উইকেটের মধ্যে একটি বোল্ড, অন্য তিনটি উইকেটের পেছনে লিটনের হাতে ক্যাচ।

ডারউইনের সবুজ উইকেটে উজ্জ্বল ছিলেন বাংলাদেশের অন্য দুই পেসার তাসকিন আর ইবাদতও। প্রথম সেশনে তাঁদেরও একটি করে উইকেট ছিল। তবে হাসানের মতো ইবাদতও ২ উইকেট নিয়ে লাঞ্চে যেতে পারতেন যদি ১৭তম ওভারে স্মিথের ওই ক্যাচটা তানজিদ না ছাড়তেন। জীবন পেয়ে কতটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছেন স্মিথ, সেটি তো তাঁর ৭১ রানের ইনিংসেই পরিষ্কার। একটি ছক্কার সঙ্গে সাত বাউন্ডারি—বাংলাদেশের বোলারদের সামনে একমাত্র তাঁকেই মনে হয়েছে কিছুটা স্বচ্ছন্দ।

ব্যাটিংয়ে নেমে ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারের শেষ বলেই শূন্য রানে আউটের সুযোগ দিয়ে বেঁচে গেছেন ওপেনার তানজিদ। জশ হ্যাজলউডের বলে টি-টুয়েন্টি সুলভ এক শট খেলে বল তুলে দিয়েছিলেন আকাশে। কিন্তু ক্যাচটা ধরতে পারেননি নাথান লায়ন। পরের ওভারের প্রথম বলে তেড়েফুঁড়ে মারতে গেছেন আরেক ওপেনার সাদমান ইসলামও। মিচেল স্টার্কের বলে এমন আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ড্রাইভ খেলতে চাইলেন যেন, রান করার অনেক তাড়া!

শেষ সেশনে ভালো ব্যাট করেন মুমিনুল ও তানজিদ
শামসুল হক

পরে অবশ্য দুজনই থিতু হয়েছিলেন। কিন্তু দিন শেষ করে আসতে পারেননি নবম ওভারে স্টার্কের ১৪৩.৪ কিলোমিটার গতির একটা বলে ঠিকঠাক ব্যাট লাগাতে না পারায়। ফিরেছেন ৩০ বলে ২০ রান করে কাভার পয়েন্টে লায়নের হাতে ক্যাচ দিয়ে।

৩২ রান নিয়ে আরেক ওপেনার তানজিদ অবশ্য দিন শেষ করে এসেছেন ৩৫ রানে অপরাজিত থাকা অভিজ্ঞ মুমিনুল হকের সঙ্গে। তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ৬০ রানের জুটিতে শুধু সাদমানের উইকেটটি হারিয়েই ৯৬ রান বাংলাদেশের। হাসান মাহমুদের হাত ধরে আসা দারুণ দিনটা তাই প্রথম দিন শেষেও উজ্জ্বলই থেকেছে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর: অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ৫৩ ওভারে ১৯৮ (স্মিথ ৭১, ওয়েদারাল্ড ২৩, হেড ২২, ক্যারি ১৯; হাসান ৬/৫৫, ইবাদত ২/৩৯, তাসকিন ২/৫৫, মিরাজ ০/১২, তাইজুল ০/২৪)। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ২৪ ওভারে ৯৬/১ (মুমিনুল ৩৫*, তানজিদ ৩২*, সাদমান ২০; স্টার্ক ১/২৮, হ্যাজলউড ০/১৯, কামিন্স ০/১৪, গ্রিন ০/১২, লায়ন ০/১৬)।—প্রথম দিন শেষে।
আরও পড়ুন