ব্রায়ান বেনেট: কেউ তাঁকে আউট করতে পারছে না
আইসল্যান্ড ক্রিকেটের এক্স হ্যান্ডল ক্রিকেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মজা করায় সিদ্ধহস্ত। যেমন ধরুন, টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে রশিদ খান ৭০০ উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়ার পর তাদের এক্স হ্যান্ডলে লেখা হয়, ‘আন্তর্জাতিক টি–টুয়েন্টিতে আমাদের কোনো খেলোয়াড় এত রানও করতে পারেনি।’
কিন্তু গতকাল ব্রায়ান বেনেটকে নিয়ে পোস্টটি মজার ছিল না, ‘ব্রায়ান বেনেট সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে কম মূল্যায়িত তরুণ ক্রিকেটার। সে উড়তে পারে, পারে ব্যাটিং করতেও।’
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে গতকাল জিম্বাবুয়ের কাছে শ্রীলঙ্কার ৬ উইকেটে হারের পর এই পোস্ট করে আইসল্যান্ড ক্রিকেট। ভাবতে পারেন, বেনেট ৪৮ বলে ৬৩ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচ জেতানোয় তাঁর প্রশংসা করেই এই পোস্ট। সঠিক। তাহলে ওড়ার বিষয়টি কী নিয়ে? আইসল্যান্ড ক্রিকেট এক্স হ্যান্ডলের পোস্টগুলো খেয়াল করলে এটা ভেবে নেওয়া–ই খুব স্বাভাবিক যে এখানে বেনেটের উড়ন্ত ফর্মের কথা বোঝানো হয়েছে!
ঠিক, আবার ভুলও হতে পারে। গ্রুপ পর্বে ওমানের বিপক্ষে ম্যাচে সীমানা থেকে দৌড়ে গিয়ে উড়ন্ত অবস্থায় একটি ক্যাচ নেন বেনেট। ওড়ার বিষয়টি এ কারণেও বলা হতে পারে।
যেটাই হোক, এই বিশ্বকাপে একটা জায়গায় এখন পর্যন্ত বেনেট অনন্য। না, সবচেয়ে বেশি রান করাদের তালিকায় বেনেট শীর্ষ পাঁচে নেই। স্ট্রাইক রেটও বিস্ফোরক নয়। তবে বেনেট এমন একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে যেখানে অন্তত রান তোলার শীর্ষ দশে তাঁর মতো আর কেউ নেই। তিন ম্যাচ খেলা বেনেটকে কেউ যে এখনো আউট করতে পারেননি! সর্বোচ্চ রান তোলা শীর্ষ ১০ ব্যাটসম্যানের তালিকায় ষষ্ঠ বেনেটের ব্যাটিং গড় তাই অসীম!
বেনেটের এই অসীম জগতের সন্ধান পাওয়ার পথে শুরুর গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ।
জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারে থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরের অঞ্চল গোরোমঞ্জি। যমজভাই ডেভিডের সঙ্গে সেখানেই তাঁর ক্রিকেট খেলার হাতেখড়ি।
বেনেটের ভাষায়, তিন বা চার বছর বয়সে প্রথম ক্রিকেট ব্যাট হাতে নেন। খেলতেন যমজ ভাই ডেভিড এবং সর্বকনিষ্ঠ ভাই শনের সঙ্গে। তিন ভাইয়ের জন্য বাবা বাসায় নেট অনুশীলনের জায়গা তৈরি করে দিয়েছিলেন। এ কারণে স্কুল থেকে ফিরে তাঁদের সময়টা নেটেই কেটেছে। বাবার নেট তৈরি করে দেওয়ার পেছনে ছিল ক্রিকেটপ্রেম। তাঁদের বাবা কেলি বেনেট জিম্বাবুয়ের ক্লাব ক্রিকেটার ছিলেন। ইয়াং ম্যাশোনাল্যান্ড ক্লাবের হয়ে বেশ কয়েকটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে খেলেছেন কেলি। ডেভ হটন, হিথ স্ট্রিক ও ফ্লাওয়ার ভাইদের সঙ্গে ক্লাব ক্রিকেটে খেলেছেন।
সেই কেলি এখন ব্লুবেরি চাষ করেন। এক কথায় কৃষক। ডেভিডও নেমেছেন কৃষিকাজে। তামাক চাষ করেন। আর সেই নেটটি এখনো আছে গোরোমঞ্জিতে। রূপক অর্থে বেনেটও তো কৃষক—যে চাষাবাদটা তিনি শিখেছিলেন ছোটবেলায় বাবার বানিয়ে দেওয়া নেট থেকে। রানের চাষাবাদ আর কী!
ক্রিকেটটা যে তাঁর পরিবারেই ছিল, সেটা বেনেট বললেন বাবার উদাহরণ টেনে, ‘তিনি জাতীয় দলে খেলেননি। কিন্তু জিম্বাবুয়ে অনূর্ধ্ব–১৯ দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন আর ক্লাব ক্রিকেট খেলেছেন।’
সে হিসেবে কেলির এই সন্তানটি কিন্তু বাবার পথে নেমেই ছাপিয়ে গেছেন বাবাকে।
কেলির মতো বেনেট এবং ডেভিডও খেলেছেন জিম্বাবুয়ে অনূর্ধ্ব–১৯ দলে। শুধু খেলেছেন কী, ২০২২ অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের হয়ে সর্বোচ্চ রানের গৌরবটা ব্রায়ান বেনেটের (৬ ম্যাচে ২৭৩), দুইয়ে তাঁরই ভাই ডেভিড বেনেট (৬ ম্যাচে ২২২)।
জিম্বাবুয়ের পিটারহাউস স্কুলে লেখাপড়া করেছেন দুই ভাই। সেখানেও ক্রিকেট বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গ্যারি ব্যালান্স এবং রায়ান বার্ল এই স্কুল থেকেই উঠে এসেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কিংসউড কলেজের ক্রিকেট উৎসবে নিয়মিত অংশ নিত পিটারহাউস স্কুল। কোভিডের সময় শেষ দুই বছরে বেনেটের স্কুলের লেখাপড়া শিকেয় ওঠে।
বাবা তাই কিংসউড কলেজে ভর্তি করেন দুই ছেলেকে। সেখানে প্রথম ম্যাচেই ব্রায়ান বেনেট কী করেছিলেন, সেটা শুনুন অ্যান্ড্রু বার্চের মুখে। ওয়ারিয়র্সের সাবেক এই পেসার তখন সেখানে কোচিং করাতেন। বার্চের ভাষায়,‘১০০ বলে ১৫১ করে সে একদম ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেছিল। ভয়ডরহীন এবং শর্ট বলে খুব ভালো। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছি তার সাফল্যক্ষুধা দেখে। অল্প বয়সে প্রতিভা অনেকেরই থাকে, কিন্তু ক্ষুধাটা বিরল।’
অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপ খেলে আসার পরের বছর জিম্বাবুয়ের হয়ে টি–টুয়েন্টিতে অভিষেকের সুযোগ পান ব্রায়ান বেনেট। কিন্তু ডেভিডের আর ক্রিকেটার হয়ে ওঠা হয়নি। ব্রায়ান ২০২৪ সালে বাকি দুই সংস্করণেও অভিষিক্ত হন। পরের বছর ট্রেন্ট ব্রিজে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টে করেন জিম্বাবুয়ের হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরি (৯৭ বল)। সেটা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সপ্তম টেস্ট। ব্রায়ান বেনেটের ক্যারিয়ার মূলত এরপরই পাখা মেলতে শুরু করে।
এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে সম্ভবত সেটারই চূড়ান্ত রূপ দেখা যাচ্ছে। ওমানের বিপক্ষে ৪৮*, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৬৪* ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬৩*। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়। শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া যে গ্রুপে আছে, সেখানে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুয়ে। ভাবা যায়! তবে জিম্বাবুয়ের এই সাফল্যের পেছনে যে বেনেটের দারুণ অবদান, তা ভেবে নেওয়াটা কষ্টকর নয়।
কিন্তু বেনেটকে দেখে তা বোঝা গেছে কতটা? গতকাল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও ফিফটি করার পর তেমন একটা উচ্ছ্বাস দেখাননি। সতীর্থ সিকান্দার রাজাকে শুধু জড়িয়ে ধরেছেন। বেনেট আসলে নিভৃতে নিজের কাজটা করতেই পছন্দ করেন। জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক রাজা যেমন কাল বললেন, ‘ম্যাচের পর ম্যাচ সে এটা (পারফর্ম) করে যাচ্ছে। কৃতিত্বটা তাকে দিতেই হবে।’
শ্রীলঙ্কাকে হারানোর এই ম্যাচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই জিম্বাবুয়ের সেই সোনালি প্রজন্মের প্রসঙ্গ তুলে আনেন। নব্বই দশকের শেষ দিকে সেই যে নিল জনসন, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ার, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল, হিথ স্ট্রিকদের দলটি। ব্রায়ান বেনেট কি তবে এই দলে নিল জনসন, নাকি ক্যাম্পবেল? জিম্বাবুয়ের ডেভেলপমেন্ট কোচ ইয়ান টিংকার অবশ্য তা মনে করেন না, ‘সে অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেলের মতো নজরকাড়া নয়। অনেকটাই ব্রেন্ডন টেলরের মতো। এই বয়সে তারা দুজনেই একই রকম।’
বেনেট কেবল ২২ বছর বয়সী। এখনো সামনে অনেক পথ। সেই পথ সামনে রেখে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বেনেট আপাতত অপরাজিত, জিম্বাবুয়েও।