‘আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে টেস্ট দলগুলোর মালিকানা দিন’
টেস্ট ক্রিকেটের পুনর্জাগরণে বেশ সাহসী এক প্রস্তাব দিয়েছেন আইপিএলের সাবেক চেয়ারম্যান ললিত মোদি। তাঁর মতে, আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজি দলগুলো টেস্ট দলগুলোর মালিকানা গ্রহণ করলে এই দীর্ঘতম সংস্করণকে বাঁচানো সম্ভব। এতে তরুণ প্রজন্ম আবারও টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি আকৃষ্ট হবে বলে মনে করেন মোদি।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভনের সঙ্গে ‘দ্য ওভারল্যাপ’ পডকাস্টে আলাপকালে এই পরামর্শ দেন মোদি। তাঁর মতে, আইপিএলের দলগুলো টেস্ট দলের মালিকানা নেওয়ার পর এই সংস্করণে দর্শকদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করতে পারে। তবে মোদি পরিষ্কার করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশ বনাম দেশের লড়াইকেই সবার আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মোদি বলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় নিয়ে আমি যা বলতে যাচ্ছি, তাতে হয়তো অনেকেই আমার ওপর চটে যেতে পারেন। আমি এই প্রথম এমন কথা বলছি; আইপিএল দলগুলোকে টেস্ট দলগুলোর মালিকানা দিয়ে দিন। এতে তরুণ প্রজন্মের কাছে খেলার আবেদন বাড়বে, তৈরি হবে দলভক্তি। নিঃসন্দেহে দেশ বনাম দেশের লড়াই বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই সবার ওপরে থাকবে।’
মোদি এরপর যোগ করেন, ‘আমি বলতে চাচ্ছি, প্রতিবছর একটি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ তো চলবেই; তবে এর পাশাপাশি এই সংস্করণকে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মধ্যে প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করতে হবে। তরুণ ক্রিকেটারদের টেস্টে ফেরাতে প্রতিটি মৌসুমে দলগুলোর অন্তত একটি করে ম্যাচ খেলা উচিত। এটি অনেকটা ক্লাব ক্রিকেটের আদলে হতে পারে, যা প্রায় সব খেলাতেই থাকে। তবে দিন শেষে দেশ বনাম দেশের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোকেই প্রাধান্য দিতে হবে।’
তরুণ সমর্থকদের মধ্যে দলভক্তি তৈরির গুরুত্ব তুলে ধরে মোদি বলেন, তাদের শৈশবেই ক্রিকেটের প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে এবং দিতে হবে দারুণ এক অভিজ্ঞতা। তাঁর ভাষায়, ‘যদি আপনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আনুগত্য তৈরি করতে চান, তবে তাদের ছোটবেলাতেই আগ্রহী করে তুলতে হবে এবং অভিজ্ঞতার স্বাদ দিতে হবে।’
ললিত মোদির আশা, টেস্ট ক্রিকেট টিকে থাকে তবে বিশ্বজুড়ে এর বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়েই টেস্টের জনপ্রিয়তা এখন পড়তির দিকে। মোদি বলেন, কেবল ‘অ্যাশেজ’ সিরিজের মতো আসরের কারণে অস্ট্রেলিয়া এবং ইংল্যান্ডে এখনো এই সংস্করণের প্রতি জোরালো আগ্রহ দেখা যায়। অথচ বিশ্বের বাকি অংশে টেস্ট ক্রিকেট প্রায় ‘মৃত্যুপথযাত্রী’।
মোদি বলেন, ‘আমি চাই টেস্ট ক্রিকেট টিকে থাকুক, কারণ আমি এই সংস্করণকে ভালোবাসি। তবে বর্তমান প্রজন্মের দিকে তাকালে এক হতাশাজনক চিত্র দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড বাদে অন্য কোথাও তারা এখন আর টেস্টের সেই আমেজ খুঁজে পাচ্ছে না। কেবল এই দুটি দেশই “অ্যাশেজ” এবং ইংলিশ মৌসুমের কল্যাণে টেস্টের মান ও আভিজাত্য ধরে রেখেছে। কিন্তু বিশ্বের বাকি অংশে টেস্ট ক্রিকেট এখন মৃত্যুপথযাত্রী।’
ললিত মোদি পাঁচ দিনের টেস্টকে ছেঁটে চার দিনের দিবা-রাত্রির ম্যাচে রূপান্তরের পরামর্শও দেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমার এই প্রস্তাব শুনে মানুষ হয়তো আমাকে পাগল ভাববে। কিন্তু আমি ক্রিকেটের ভালো চাই। ২০০৭ সাল থেকেই আমি বলে আসছি, টেস্ট হওয়া উচিত চার দিনের এবং সেটি হতে হবে দিবা-রাত্রির।’
আধুনিক যুগের দর্শকদের হাতে সময় ও ধৈর্যের অভাবের বিষয়টিও মোদি তাঁর যুক্তিতে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, আগের দিনে ক্রিকেট সহজে দেখা যেত না এবং বিনোদনের সুযোগ সীমিত ছিল। তখনকার প্রেক্ষাপট আর এখনকার বাস্তবতা এক নয় বলেই মনে করেন তিনি।
মোদির ভাষায়, ‘আজকের দিনে দর্শকদের সেই বিলাসিতা নেই যে তারা চার দিন ধরে রোদে বসে বিয়ার খাবে আর খেলা দেখবে। আমি দুঃখিত, কিন্তু সেই সোনালি দিনগুলো এখন অতীত। তখন টেলিভিশন চ্যানেল ছিল মাত্র একটি, টেস্ট ম্যাচ ছিল বিরল এবং তা আজকের মিডিয়ার মতো হাতের নাগালে ছিল না। এখন তো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ম্যাচ মুহূর্তের মধ্যেই দেখা যায়।’
২০০৮ সালে শুরু হওয়া আইপিএলের প্রথম চেয়ারম্যান ও লিগ কমিশনার ৬২ বছর বয়সী ললিত মোদি। ২০১০ সাল পর্যন্ত তিনি এ ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ পরিচালনা করেন। নানা অনিয়মের অভিযোগে ২০১৩ সালে বিসিসিআই তাঁকে আজীবন নিষিদ্ধ করে। এর পর থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন মোদি।