এই জিম্বাবুয়েকে সমীহ না করে উপায় আছে?

ক্রেগ আরভিন–সিকান্দার রাজাদের হালকাভাবে নেওয়ার পরিণতি কতটা ভয়াবহ, সেটা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে পাকিস্তান। বাবর আজম–মোহাম্মদ রিজওয়ানরা স্বীকার না করলেও সাবেকদের বিশ্লেষণে সব স্পষ্ট।

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের পর বদলে যাওয়া জিম্বাবুয়ের কাছে শেষ বলে হেরে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার টুয়েলভ পর্ব থেকেই ছিটকে পড়ার দশা পাকিস্তানের। দেয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া বাবরদের এখন তাই গ্রুপের অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডসকেও মনে হচ্ছে কঠিন। পার্থে আগামীকাল দুপুরে ডাচদের কাছে হারলেই যে বিদায়ঘণ্টা বেজে যাবে ২০০৯ টি–টোয়েন্টি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের! তার আগে সেমিফাইনালের পথ আরও দুর্গম হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের। ব্রিসবেনে কাল সকালে সাকিব আল হাসানের দলের প্রতিপক্ষ তো এই জিম্বাবুয়েই।

গ্রুপ ২–এর আরেক ম্যাচে কাল ভারতের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। এ ম্যাচ জিতলেই সেমিফাইনাল প্রায় নিশ্চিত করে ফেলবেন রাহুল দ্রাবিড়ের শিষ্যরা। হারলেও হাতে থাকছে দুটি ম্যাচ। সুপার টুয়েলভ পর্বে শেষ দিনের (৬ নভেম্বর) শেষ ম্যাচে গিয়ে জিম্বাবুয়ের মুখোমুখি হবে ভারত। রোহিত–কোহলিরা যে ছন্দে আছেন, তাতে ভারতীয়দের আগেই শেষ চারের টিকিট পাওয়ার কথা।

তবু জিম্বাবুয়েকে নিয়ে উত্তরসূরিদের আগেভাগেই সতর্ক করে দিচ্ছেন সুনীল গাভাস্কার। সাবধানের মার নেই—গুরুজনদের এ কথাকে সিদ্ধ করতেই ভারতীয় কিংবদন্তি বলেছেন, ‘পাকিস্তানকে হারানোর পর জিম্বাবুয়ে আরও উদ্বুদ্ধ। ওরা ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করবে। ওদের নিয়ে ভারতকে সাবধান থাকতে হবে। টি–টোয়েন্টিতে যেকোনো কিছু হতে পারে।’ টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত সব ম্যাচ জেতা একমাত্র দল হয়েও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ভারতকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন গাভাস্কার। ভারতেই যদি ‘ওয়ার্নিং বেল’ বাজে, তাহলে কাল বাংলাদেশের কী হবে!

তারকা খেলোয়াড়েরা বাধ্য হয়ে অবসরে যাওয়ার পর জিম্বাবুইয়ানদের প্রায় দেড় দশক শাসন করে এসেছে বাংলাদেশ। এ সময়ে দেশের ক্রিকেটের যত অর্জন, বেশির ভাগই আফ্রিকার দেশটির বিপক্ষে। বড় দলগুলোর কাছে হারতে হারতে যখন ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ অবস্থা হতো বাংলাদেশের, তখনই ডাক পড়ত জিম্বাবুয়ের, অথবা বাংলাদেশই হতো আমন্ত্রিত অতিথি। এরপর হেসেখেলে জিম্বাবুইয়ানদের হারিয়ে আগের ‘সাত খুন মাফ’ হয়ে যেত।

কিন্তু সেই দিন আর নেই। বলতে গেলে, জিম্বাবুয়ের দিনবদলের শুরুটা হয়েছে বাংলাদেশকে দিয়েই। জুলাইয়ে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইয়ে জিম্বাবুয়েকে সে অর্থে পরীক্ষা দিতে হয়নি। টানা পাঁচ জয়ে বাছাইয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েই ছয় বছর পর ফিরেছে বিশ্বমঞ্চে। তাতে জিম্বাবুইয়ানদের বুক থেকে শুধু পাথরই সরেনি, বেড়েছে আত্মবিশ্বাস। পেয়েছে পুনর্জাগরণের রসদ। তাতে গত আগস্টে ঘরের মাঠে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে ও টি–টোয়েন্টি সিরিজ জয়ে বিশ্বকেই যেন একটা বার্তা দিতে চেয়েছে জিম্বাবুয়ে।

এরপর ভারতের কাছে হারলেও দারুণ লড়াই করেছে। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে আরেক দফা অস্ট্রেলিয়ায় এসে স্বাগতিকদের একটি ওয়ানডে ম্যাচে হারিয়েও দিয়েছে। বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের গ্রুপ থেকে সেরা হয়ে উঠেছে সুপার টুয়েলভে। আর সর্বশেষ ম্যাচে স্তব্ধ হয়েছে পাকিস্তান।

আগামীকাল বদলে যাওয়া সেই জিম্বাবুয়ের সামনে পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশকে। জিম্বাবুইয়ানদের এই পুনর্জাগরণের পথিকৃৎ সিকান্দার রাজা। ইদানীং জিম্বাবুয়ের জয় মানেই ম্যাচসেরার পুরস্কার তাঁর হাতে ওঠা। আগস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে করেছেন জোড়া সেঞ্চুরি। পেয়েছেন আইসিসির মাসসেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি। ক্রেগ আরভিন–শন উইলিয়ামসদের অভিজ্ঞতা, রায়ান বার্লের ফিনিশিং দক্ষতাও দলটার ভরসার জায়গা।

বোলিংয়েও পিছিয়ে নেই জিম্বাবুয়ে। বিশেষ করে পেস আক্রমণে। সুনীল নারাইনের অ্যাকশন নকল করে রাজাও নিয়মিত স্পিনে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। পার্থে পাকিস্তানের বিপক্ষে বোলাররাই তো জিতিয়েছেন জিম্বাবুয়েকে। পাকিস্তানের শেষ ৩ বলে ৩ রানের সমীকরণ গড়বড় করে ব্র্যাড ইভান্স বুঝিয়ে দিয়েছেন, তারুণ্যেই স্নায়ুচাপ ধরে রাখতে জানেন।

চোটে পড়ায় বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজে খেলতে পারেননি জিম্বাবুয়ের প্রধান দুই পেসার ব্লেসিং মুজারাবানি ও টেন্ডাই চাতারা। তাতে সিরিজ জিততে সমস্যা হয়নি। এবার তো দুই পেসার আছেন। বাংলাদেশের ‘ভয়’ আরেকটা জায়গায়। লড়াইয়ের মঞ্চ ব্রিসবেনের গ্যাবা। এ মাঠে কখনোই খেলেনি বাংলাদেশ। ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটা ঘূর্ণিঝড়ে বাতিল না হলে এই মাঠে খেলার অভিজ্ঞতাটা হয়ে যেত।

গতিময় ও বাউন্সি উইকেটের জন্য বিখ্যাত দুই ভেন্যু কোনটি? নিশ্চয় পার্থ ও ব্রিসবেন। জিম্বাবুয়ের পেসাররা পার্থ থেকে শান দিয়েই ব্রিসবেনে এসেছেন। দৈহিক গড়নের সুবিধা কাজে লাগিয়ে মুজারাবানি–ইভান্সরা গ্যাবার পিচ থেকে সহায়তা নেবেন, সে জানা কথা। এমন পিচে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের অনভিজ্ঞতাও বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে তাঁদের মনোবলে।

চেনা প্রতিপক্ষকে পেয়েও তাই ২ পয়েন্ট প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে পারছে না বাংলাদেশ। আর প্রতিপক্ষদের নিয়ে সতর্কতা তো দূরের কথা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও নেই। ম্যাচের শেষ বল মাঠে গড়ানোর আগপর্যন্ত তাই প্রশ্নটা মুখ ফসকে বেরিয়ে আসছেই—জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কী করবে বাংলাদেশ?