২৫০ ম্যাচ পেরোনো সৌম্যর স্ট্রাইক রেটে যেন ‘স্ট্রাইক’টাই নেই
ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা তো কম হয় না। ধরুন, তেমনই এক আলোচনার বিষয়বস্তু হলেন সৌম্য সরকার। প্রশ্ন উঠল, সৌম্যর ব্যাটিংয়ের ধরনটা কেমন? যে কেউ একবাক্যে স্বীকার করবেন, রান করুন আর না–ই করুন—সৌম্যর ব্যাটিং আসলে টি–টোয়েন্টির জন্য। হ্যাঁ, টেস্টে ও ওয়ানডেতে তাঁর সেঞ্চুরি আছে বটে কিন্তু ছন্দে থাকা সৌম্য ভালো বলকে যেভাবে উড়িয়ে মেরে সীমানার ওপাশে ফেলেন, শুধু সেটাও নয়, যেভাবে তিনি এক ওভারে দু–তিনটি ভালো বল মেরে দিতে পারেন—তাতে এমন দাবির বিরুদ্ধে আসলে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই।
অর্থাৎ সৌম্যর ব্যাটিংয়ের ধরন আসলে টি–টোয়েন্টির সঙ্গে বেশি মানানসই। কিন্তু জানেন কি, এই টি–টোয়েন্টিতেই সৌম্য সবচেয়ে বাজে ব্যাটসম্যানদের কাতারে পড়েন। অন্তত পরিসংখ্যানের বিচারে এই নির্মম সত্যটি মেনে নিতেই হয়। হতে পারে সৌম্য যখন দাপটের সঙ্গে ব্যাট করেন তখন এর মতো ভয়াল সুন্দর আর কিছু হয় না, কিন্তু পরিসংখ্যানও দাবি করছে এই ভয়াল সুন্দর মুদ্রার অপর পিঠেই আরও ভয়ংকর সত্য লুকিয়ে।
বিপিএলে গতকাল সিলেটে নোয়াখালী এক্সপ্রেসের হয়ে স্বীকৃত টি–টোয়েন্টিতে নিজের ২৫০তম ম্যাচ খেলেন সৌম্য। স্বীকৃত টি–টোয়েন্টিতে অন্তত ২৫০ ম্যাচ খেলা (আজকের ম্যাচের আগে করা হিসাব) ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে স্ট্রাইক রেটের তালিকায় দুইয়ে সৌম্য (১১৯.৫৮)। শুধু লেন্ডল সিমন্সের স্ট্রাইক রেটই (১১৯.১৯) তাঁর চেয়ে কম। তবে ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ওপেনার সিমন্স এই সংস্করণে সর্বশেষ ম্যাচ খেলেন সে বছরই।
একই শর্ত বজায় রেখে যদি ব্যাটিং গড়ে তাকানো যায় সেখানেও একই চিত্র। স্বীকৃত টি–টোয়েন্টিতে অন্তত ২৫০ ম্যাচ খেলা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সৌম্যর ব্যাটিং গড় (১৯.৮৫) সবচেয়ে বাজে। তাঁর চেয়ে বাজে ব্যাটিং গড় শহীদ আফ্রিদি (১৮.২৫), জেসন হোল্ডার (১৮.০৮) ও ডোয়াইন প্রিটোরিয়াসের (১৯.৬৯)। কিন্তু তিনজনই অলরাউন্ডার।
স্ট্রাইক রেট ও ব্যাটিং গড়—এ দুটি পরিসংখ্যানকে পাশাপাশি রাখলে আরও একটি হতাশার ছবি বেরিয়ে আসে। স্বীকৃত টি–টোয়েন্টিতে অন্তত ২৫০ ম্যাচ খেলা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে শুধু সৌম্যর স্ট্রাইক রেটই ১২০–এর নিচে এবং ব্যাটিং গড়ও ২০–এর নিচে। সিমন্সের ব্যাটিং গড় ২৯.৮৩।
গত মাসে জাতীয় ক্রিকেট লিগে (এনসিএল) ১৪ ইনিংসে ৪৫.২১ গড় ও ৭৬.৪৪ স্ট্রাইক রেটে সর্বোচ্চ ৬৩৩ রান করেন সৌম্য। কিন্তু পারফরম্যান্সটা চার দিনের ম্যাচের সংস্করণে বলেই হয়তো এবার বিপিএলে আজকের ম্যাচসহ মাত্র তিন ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলেন এই বাঁহাতি ওপেনার। বৈপরীত্যটা খেয়াল করুন—সৌম্যর ব্যাটিং টি–টোয়েন্টি সংস্করণে সবচেয়ে মানানসই ভাবা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি রান করেছেন বড় দৈর্ঘ্যের এনসিএলে, আর টি–টোয়েন্টি সংস্করণের বিপিএলে নেমেই নিখোঁজ! নোয়াখালীর হয়ে আগের দুই ম্যাচে তাঁর স্কোর ৬ বলে ১ ও ৫ বলে ৬।
অন্তত ২৫০ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়দের মধ্যে পাকিস্তানের পেসার সোহেল তানভীর কিংবা ইংল্যান্ডের স্পিন বোলিং অলরাউন্ডার লিয়াম ডসনের স্ট্রাইক রেটও সৌম্যর চেয়ে ভালো। তাঁদের সঙ্গে এই তুলনাটা দেওয়ার কারণ তানভীর (১৬.৭৮) ও ডসনের (১৭.৭৬) ব্যাটিং গড়ও সৌম্যর প্রায় কাছাকাছি।
স্ট্রাইক রেটে সৌম্য মাহমুদউল্লাহ, তামিম ইকবাল, গৌতম গম্ভীর কিংবা জেপি ডুমিনিকে আশপাশে দেখে কিছুটা কষ্ট লাঘব করতে পারেন। ২৫১ ম্যাচ খেলা ভারতের বর্তমান কোচ ও বিশ্বকাপজয়ী গম্ভীরের স্ট্রাইক রেট ১২০.৫৮ এবং ব্যাটিং গড় ২৮.৯৬। ৩৫৩ ম্যাচ খেলা মাহমুদউল্লাহর স্ট্রাইক রেট ১২১.০৫ এবং ২৮১ ম্যাচ খেলা তামিমের ১২১.১৬ স্ট্রাইক রেট। ব্যাটিং গড়ে দুজনই সৌম্যর চেয়ে বেশ এগিয়ে।
অন্তত ২৫০ ম্যাচ খেলা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ব্যাটিং গড়ে সবার ওপরে পাকিস্তানের বাবর আজম (৪২.৫৮)। দুইয়ে পাকিস্তানেরই মোহাম্মদ রিজওয়ান (৪২.৫৬) এবং তিনে ভারতের বিরাট কোহলি (৪১.৯২)। টি–টোয়েন্টিতে যেহেতু ব্যাটিং গড় অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাই স্ট্রাইক রেটে তাকানো যায়।
স্ট্রাইক রেটে ক্যারিবিয়ান আন্দ্রে রাসেল সবার ওপরে (১৬৭.৭১)। এরপর অস্ট্রেলিয়ার টিম ডেভিড (১৬২.৪৫) এবং তিনে নিউজিল্যান্ডের কলিন ডি গ্র্যান্ডহোম (১৫৫.৬২)। একমাত্র ডেভিড (৩০.৯৮) ছাড়া রাসেল (২৬.২৫) ও গ্র্যান্ডহোমের (২২.৯৬) ব্যাটিং গড় তেমন আহামরি কিছু না। সৌম্যর জন্য খারাপ লাগছে? হ্যাঁ, গড় যেখানেই নামুক, শীর্ষ স্ট্রাইক রেটের এ তালিকায় সৌম্য থাকতেই পারতেন। সেই সামর্থ্যও তাঁর আছে। কিন্তু?
এই ‘কিন্তু’র সম্ভবত কোনো ব্যাখ্যা কিংবা নেই। তবে সমাধানের পথ আছে। আজ বিপিএলে যেমন নোয়াখালীর হয়ে ফিফটি (৫৯) পেয়েছেন সৌম্য। তাই পথ আসলে একটাই। রান করতে হবে, যে সংস্করণ যেমন ব্যাটিংয়ের দাবি রাখে, সেই দাবি মেনে।