আইপিএলে যেন ভিডিও গেম খেললেন সূর্যবংশী

এবারের আইপিএলে ৭৭৬ রান করেছেন সূর্যবংশীএএফপি

রাজস্থান রয়্যালস প্রতিভা চেনে। আইপিএলের ইতিহাসে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মতো করে ১৭–১৮ বছর বয়সী খেলোয়াড়কে আর কেউ সুযোগ দেয়নি। রবীন্দ্র জাদেজা, সঞ্জু স্যামসন, রিয়ান পরাগ কিংবা যশস্বী জয়সওয়াল—সবাই উঠে এসেছেন এই পথ ধরেই। তবে এই তালিকায় সবচেয়ে অনন্য এবং বিস্ময়কর নাম ১৫ বছর বয়সী বৈভব সূর্যবংশী। অন্তত এবার আইপিএলে যা করেছেন, তাতে এ কথার সঙ্গে কারও দ্বিমত করার কথা নয়।

২০২৬ আইপিএলে সূর্যবংশী নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা আইপিএলের ইতিহাসে এর আগে কোনো ক্রিকেটার করতে পারেনি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে শুধু রেকর্ডের পর রেকর্ডই ভাঙেননি, বরং টি–টুয়েন্টি নিয়ে দর্শকদের নতুন ভাবনার খোরাকও জুগিয়েছেন।

যেন কোনো ভিডিও গেমস

৩২৭ বলে ২৩৭.৩০ স্ট্রাইক রেটে ৭৭৬ রান! চার-ছক্কাই মেরেছেন ১৩৫টি, যার মধ্যে ছক্কাই ৭২টি! টুর্নামেন্টে ফিফটি+ ইনিংস ৬টি, যার একটি আবার ৩৬ বলের সেঞ্চুরি। ৪টি ফিফটি এসেছে ১৬ বা তার চেয়েও কম বলে। দেখে মনে হতে পারে, যেন কোনো ভিডিও গেমের পরিসংখ্যান!

৭৭৬ ও ২৩৭.৩০ স্ট্রাইক রেট

আইপিএলের গত ১৮টি আসরের মধ্যে মাত্র চারবার কোনো ব্যাটসম্যান এক মৌসুমে এর চেয়ে বেশি রান করতে পেরেছেন। টি টুয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে সূর্যবংশীসহ মাত্র চারজন ব্যাটসম্যান এক টুর্নামেন্টে ২০০–এর বেশি স্ট্রাইক রেটে ৫০০ রানের গণ্ডি পার করতে পেরেছেন। তবে রানসংখ্যার দিক থেকে এই ১৫ বছরের কিশোরের ধারেকাছেও কেউ নেই। এই এলিট ক্লাবে তাঁর ঠিক নিচে থাকা অভিষেক শর্মার (২০২৬ আইপিএলে ২০৪.৭২ স্ট্রাইক রেটে ৫৬৩ রান) চেয়ে সূর্যবংশীর রান ৩৮ শতাংশ বেশি।

তালিকায় বাকি দুজন হলেন আন্দ্রে রাসেল (২০২০ আইপিএলে ২০৪.৮১ স্ট্রাইক রেটে ৫১০ রান) এবং অ্যালেক্স হেলস (২০১৭ টি টুয়েন্টি ব্লাস্টে ২০৪.৪৩ স্ট্রাইক রেটে ৫০৭ রান)। স্ট্রাইক রেটের দিক থেকে সূর্যবংশীর সবচেয়ে কাছাকাছি আছেন শুধু জ্যাক ফ্রেজার-ম্যাগার্ক—২০২৪ আইপিএলে ২৩৪.০৪ স্ট্রাইক রেটে এই অস্ট্রেলিয়ান করেছিলেন ৩৩০ রান।

এগিয়ে শুধু অভিষেক

যেকোনো টি টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে ২০০–এর বেশি স্ট্রাইক রেটে ৩০০ বা তার বেশি রান করার নজির আছে ২০টি। এর মধ্যে সূর্যবংশীর চেয়ে বেশি স্ট্রাইক রেট আছে মাত্র একজনের। ২০২৬ সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে ২৪৭.১৫ স্ট্রাইক রেটে ৩০৪ রান করেছিলেন অভিষেক শর্মা। তবে কোনো টুর্নামেন্টে অন্তত ১০টি ইনিংসে ব্যাটিং করে ২৩০–এর ওপর স্ট্রাইক রেট ধরে রাখার কীর্তি সূর্যবংশী ছাড়া কারও নেই। এই মৌসুমে সতীর্থদের সঙ্গে সূর্যবংশীর স্ট্রাইক রেটের ব্যবধান ছিল রেকর্ড ৮৭.০৩।

২০২৬ সৈয়দ মুশতাক আলী ট্রফিতে ২৪৭.১৫ স্ট্রাইক রেটে ৩০৪ রান করেছিলেন অভিষেক শর্মা
এএফপি

ছাড়ালেন জয়সওয়ালকে

আইপিএলে প্রথম আনক্যাপড (জাতীয় দলে অভিষেক না হওয়া) ব্যাটসম্যান হিসেবে দুটি সেঞ্চুরির মালিক সূর্যবংশী। তিন বছর আগে যশস্বী জয়সওয়াল আনক্যাপড ব্যাটসম্যান হিসেবে এক মৌসুমে ৬২৫ রান করে রেকর্ড গড়েছিলেন। সূর্যবংশী তাঁর চেয়ে আরও ১৫১ রান বেশি করেছেন।

দ্রুততম ফিফটি ও সেঞ্চুরি

২০২৬ আসরে ১৬ বা তার কম বলে ৪টি ফিফটি করেছেন সূর্যবংশী—যা যেকোনো ব্যাটসম্যানের পুরো আইপিএল ক্যারিয়ারের চেয়ে দুটি বেশি! এর আগে শুধু ট্রাভিস হেড ও নিকোলাস পুরান (দুজনেই ২০২৪ সালে) এক মৌসুমে একাধিকবার এই কীর্তি গড়েছিলেন। এলিমিনেটরে হায়দরাবাদের বিপক্ষে তাঁর ১৬ বলের ফিফটিটি আইপিএল প্লে অফ বা নকআউট পর্বের ইতিহাসের যৌথ দ্রুততম। আর জয়পুরে হায়দরাবাদের বিপক্ষে ৩৬ বলের সেঞ্চুরিটি আইপিএল ইতিহাসের তৃতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি (দ্বিতীয় স্থানেও আছেন তিনি নিজে)।

দ্রুততম ১০০০ রান

এই মৌসুমের শেষ ইনিংসে আইপিএল ক্যারিয়ারের ১০০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন সূর্যবংশী। সবচেয়ে কম বয়সে এবং সবচেয়ে কম বল (মাত্র ৪৪০ বল) খেলে এই কীর্তি গড়লেন তিনি। ভেঙে দিয়েছেন আন্দ্রে রাসেলের রেকর্ড, যার চেয়ে ১০৫ বল কম লেগেছে সূর্যবংশীর। মাত্র ২৩ ইনিংসে এই মাইলফলক ছুঁয়ে তিনি ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দ্রুততম।

সূর্যবংশীর ৭৭৬ রানের মধ্যে ৫২১ রানই এসেছে পাওয়ারপ্লেতে
এএফপি

পাওয়ারপ্লেতে একটু বেশিই ভালো

সূর্যবংশীর ৭৭৬ রানের মধ্যে ৫২১ রানই এসেছে পাওয়ারপ্লেতে! আইপিএলের এক মৌসুমে প্রথম ৬ ওভারে এটিই সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড, যেখানে তিনি ভেঙেছেন ২০১৬ সালে ডেভিড ওয়ার্নারের করা ৪৬৭ রানের রেকর্ড। পাওয়ারপ্লের ভেতরেই ৪ বার ফিফটির গণ্ডি পার করেছেন, যা ২০২৪ সালে হেডের গড়া রেকর্ডের সমান।

ছক্কার হিসাবটা তো আরও অবিশ্বাস্য। পাওয়ারপ্লেতে মাত্র ২২৩ বল খেলে ৪৬টি ছক্কা মেরেছেন সূর্যবংশী, যা এক মৌসুমে যেকোনো ব্যাটসম্যানের জন্য সর্বোচ্চ। এমনকি ২০২৩ সাল পর্যন্ত আইপিএলের কোনো দল পুরো মৌসুম মিলেও পাওয়ারপ্লেতে এত ছক্কা মারতে পারেননি। ২০২৬ সালে সূর্যবংশী একাই পাওয়ারপ্লেতে ছক্কার সংখ্যায় পাঁচটি দলকে টেক্কা দিয়েছেন—চেন্নাই (৩৮), বেঙ্গালুরু (৩৬), কলকাতা (৩৫), গুজরাট (৩৩) এবং দিল্লি (২৮) তার চেয়ে কম ছক্কা মেরেছে।

আরও পড়ুন

ছক্কার নতুন সংজ্ঞা

২০১০–এর দশকের শুরুতে ক্রিস গেইল যদি টি টুয়েন্টিতে ছক্কা মারার মানদণ্ড তৈরি করে থাকেন, তবে সূর্যবংশী তা পুরো বদলে দিয়েছেন। ২০১২ আইপিএলে গেইলের ৫৯টি ছক্কা এসেছিল ৪৫৬ বলে—অর্থাৎ প্রতি ৭.৭ বলে একটি ছক্কা। আর ২০২৬–এ সূর্যবংশীর ৭১টি ছক্কা এসেছে মাত্র ৩২৭ বলে—প্রতি ৪.৫ বলে একটি ছক্কা!

চলতি মৌসুমে তিনটি ইনিংসে ১০ বা তার বেশি ছক্কা মেরেছেন সূর্যবংশী, যা ইতিহাসের প্রথম। এক মৌসুমে একাধিকবার এই কীর্তি গড়েছেন শুধু ফিন অ্যালেন (তা–ও এই ২০২৬ সালেই)। আইপিএলে সব মিলিয়ে সূর্যবংশীর এমন ইনিংস এখন ৪টি, যা ক্রিস গেইলের সমান। এই মৌসুমে দুবার এক ইনিংসে ১২টি করে ছক্কা মেরেছেন তিনি, যা আইপিএল ইতিহাসে ভারতীয় ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ।

সেঞ্চুরির পর সূর্যবংশী
এএফপি

জয়পুরে হায়দরাবাদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করার পথে আইপিএলে দ্রুততম ৫০টি ছক্কা মারার রেকর্ডও গড়েন তিনি। মাত্র ১৫ ইনিংস ও ২৫০ বল খেলেই ৫০টি ছক্কা মারেন তিনি।

আগের রেকর্ড দুটি ছিল যথাক্রমে গেইল (২১ ইনিংস) ও প্রিয়াংশ আর্যর (৩৬১ বল)। মাঠের কাউ কর্নার অঞ্চলটিই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়, ওই অঞ্চল দিয়ে মেরেছেন ১৮টি ছক্কা। সব মিলিয়ে ৭২টি ছক্কার মধ্যে ৫০টিই এসেছে লেগ সাইডে; যার মধ্যে স্কয়ার লেগ ও মিডউইকেট দিয়েই হয়েছে ৩৪টি ছক্কা।

প্রথম বলেই বাউন্ডারি

যশপ্রীত বুমরা, প্যাট কামিন্স, জশ হ্যাজলউড, ম্যাট হেনরি, মিচেল স্টার্ক, লুঙ্গি এনগিডি—সবাই দারুণ বোলার। কিন্তু এই আইপিএলে তাঁদের করা ম্যাচের প্রথম বলেই বাউন্ডারি মেরে স্বাগত জানিয়েছে এই কিশোর!

পেস বোলারদের বিপক্ষে তিনি ২৩৯.১১ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ৬৪৮ রান, যেখানে প্রায় প্রতি দ্বিতীয় বলেই বাউন্ডারি এসেছে। এমনকি স্পিনের বিপক্ষেও তার স্ট্রাইক রেট ছিল ২২৮.৫৭ (৫৬ বলে)।

২০২৬ আইপিএলে ৪৬ জন বোলারের মুখোমুখি হয়ে ৩৪ জনের বলেই ছক্কা মেরেছেন সূর্যবংশী। যে ১২ জন বোলার ছক্কা খাওয়া থেকে বেঁচেছেন, তাঁদের মধ্যে মাত্র চারজন তাঁকে ৩টির বেশি বল করতে পেরেছেন—মহসিন খান (১২), কার্তিক তিয়াগী (৯), প্রসিধ কৃষ্ণা (৮) এবং বৈভব অরোরা (৬)।

লক্ষ্ণৌর মহসিন খান তাঁকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছেন, ১২ বলে দিয়েছেন মাত্র ২ রান। মহসিন ছাড়া কেবল সুনীল নারাইন একাধিক ওভার বল করে তাঁর স্ট্রাইক রেট ১০০-এর নিচে রাখতে পেরেছিলেন (৮ বলে ৭ রান)।

আরও পড়ুন