ফিন অ্যালেন, না ‘এলিয়েন’

গেইলের রেকর্ড ভেঙে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করেছেন ফিন অ্যালেনএএফপি

টি–টুয়েন্টিতে ক্রিস গেইল এখনো ব্যাটিংয়ের শেষ কথা। সেই গেইলের কাছ থেকে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ডটি কেড়ে নিয়েছেন। সেটিও ১৪ বলের ব্যবধানে। ২০১৬ আসরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গেইলের ৪৭ বলে সেঞ্চুরিটাই কালকের আগপর্যন্ত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দ্রুততম ছিল। ফিন অ্যালেন সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন ৩৩ বলে সেঞ্চুরি করে।

আরেকটু গভীরে তাকানো যাক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে গেইলের সেঞ্চুরিটি নকআউট ম্যাচে ছিল না। যেখানে অ্যালেনের সেঞ্চুরিটি সেমিফাইনালে, ১৬৯ রান তাড়া করতে নেমে। অ্যালেন–রকেটে চড়ে নিউজিল্যান্ড সেটা কত অবলীলায় করেছে, সেটা তো এখন সবারই জানা। অজানা থাকতে পারে, এমন দু–একটি কথা বলা যাক।

আন্তর্জাতিক টি–টুয়েন্টিতে অ্যালেনের চেয়ে কম বলে সেঞ্চুরি আছে আরও দুটি। কিন্তু সেগুলো আইসিসির সহযোগী সদস্যদলগুলোর মধ্যকার ম্যাচে। দুই টেস্ট খেলুড়ে দেশের মধ্যে ম্যাচে দ্রুততম সেঞ্চুরিটিও অ্যালেনেরই। সেটা করার জন্য এ কিউই ওপেনার যে মঞ্চটি বেছে নিয়েছেন, তাতে তাঁর আত্মবিশ্বাসের মাত্রাটাও বোঝা যায়। সেই মাত্রার আরও গভীরে নামা যাক।

আরও পড়ুন

ম্যাচের যখন ৮ ওভার মানে ৪৮ বল বাকি, নিউজিল্যান্ডের দরকার ছিল ২১ রান। অ্যালেন তখন ৭৬ রানে অপরাজিত। সেঞ্চুরি করতে চাই আরও ২৪ রান। অ্যালেন দুটি সমীকরণই মিলিয়েছেন পরের চার বলে—৪, ৪, ৬, ৬, ৪! এরপর আপনি বলতেই পারেন, লোকটির নাম ফিন অ্যালেন, না ‘এলিয়েন’?

না, অ্যালেন মোটেও ভিনগ্রহের কেউ নয়। আমাদের মতোই রক্তমাংসের মানুষ। ব্যাটিংয়ের দর্শনও পানির মতো সরল; বলটা শুধু মারার জন্য—‘সি বল, হিট বল।’ তবে এ ঘরানার ব্যাটসম্যানদের সঙ্গেও অ্যালেনের সূক্ষ্ম একটা পার্থক্যও আছে। কেউ কেউ টাইমিংয়ের ওপরও নির্ভর করেন। অ্যালেন সেখানে সোজাসাপটা জোরে মারেন। এত জোরে যে কেউ কেউ বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অ্যালেনই এখন ‘হার্ডেস্ট হিটার।’

৩৩ বলে সেঞ্চুরি করার পথে শট খেলছেন অ্যালেন
এএফপি

টি–টুয়েন্টিতে দ্রুততম সেঞ্চুরি হিসেবে তাই অনেকেই ইডেন গার্ডেনে কাল রাতে অ্যালেনের মুঠো শক্ত করে পিঠ বাঁকিয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর ছবিটিই মনে রাখার ভুল করবেন। সেই ভুল হয়তো কাগজে–কলমে, মনের মুকুরে সহযোগী দেশের কারও কীর্তি যে মনে থাকে না! সেখানে অ্যালেনই হয়তো ভবিষ্যৎ থেকে থাকা আসা সেই ব্যাটসম্যান, যাঁর দাঁড়ানো থেকে হাঁকানো বুঝিয়ে দেয় আগামী দিনের ক্রিকেট হতে পারে বেসবলের মতো!

টি–টুয়েন্টিতে মার মার কাট কাট দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটা ইতিবাচক অর্থেই বলা। আর সেই ইতিবাচকতার পেছনে আছে এক বিবর্তনের গল্পও।

আন্তর্জাতিক টি–টুয়েন্টিতে অ্যালেনের চেয়ে কম বলে সেঞ্চুরি আছে আরও দুটি। কিন্তু সেগুলো আইসিসির সহযোগী সদস্যদলগুলোর মধ্যকার ম্যাচে।

অ্যালেনের উত্থান মূলত ২০২০–২১ মৌসুমে নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট সুপার স্ম্যাশে ১৯৪ স্ট্রাইক রেটে সর্বোচ্চ ৫১২ রান করে। যেটির সূত্র ধরেই ২০২১ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে টি–টুয়েন্টি অভিষেক। প্রথম ম্যাচেই আরেক অভিষিক্ত বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিনার নাসুম আহমেদের প্রথম বলেই আউট। দ্বিতীয় ম্যাচেও ব্যর্থ। তৃতীয় ম্যাচেই অবশ্য চিনিয়ে দিয়েছিলেন নিজেকে। বৃষ্টির কারণে ১০ ওভারে নেমে আসা ম্যাচে খেলেছিলেন ২৯ বলে ৭১ রানের বিধ্বংসী এক ইনিংস।

এরপর স্বাভাবিকভাবেই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে খেলে বেরিয়েছেন। যেহেতু প্রথম বল থেকেই মারতে পারেন এবং এরপরও ব্যাট চলে একই ধারায়—এমন এক প্রতিভাকে শুধু ধারাবাহিক না হওয়ার কারণে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট আরও যত্ন করে অ্যালেনকে আরও তৈরি হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

ম্যাচ জেতানোর পর রবীন্দ্র ও অ্যালেন
এএফপি

গত বছর অ্যালেনের সঙ্গে ‘ক্যাজুয়াল কন্ট্রাক্ট’ করে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট—যেটা মূলত তাঁর বেশি বেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ খেলার ছাড়পত্র, শুধু বড় ম্যাচ বা টুর্নামেন্টে খেলতে হবে জাতীয় দলের হয়ে। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট বুঝেছে, অ্যালেনরা প্রতিদিন খেলেন না, কিন্তু যেদিন খেলেন, সেদিন আর কারও তেমন কিছু করতে হয় না। আর সেমিফাইনালের মতো ম্যাচে অ্যালেনরা খেললে কী হয়, সেটা জিজ্ঞেস করতে পারেন দক্ষিণ আফ্রিকাকে।

তা অ্যালেন নিজেকে তৈরি করেছেনও। সেটির প্রতিফলন পরিসংখ্যানেও। আন্তর্জাতিক টি–টুয়েন্টিতে ২০২১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত ২৮ ইনিংসে অ্যালেনের গড় ছিল ২২। গত তিন বছরে সেটাই ৩৫ ইনিংসে ৩৩.৯৬! এ সময়ে স্ট্রাইক রেট (১৭৫.৩২) ক্যারিয়ার স্ট্রাইক রেটের (১৭১.০৪) চেয়ে বেশি। সর্বশেষ বিগ ব্যাশেই ভালো বোঝা গেছে, অ্যালেন আসলে ‘এলিয়েন’ হয়ে উঠছেন—সর্বোচ্চ রান (১১ ইনিংসে ৪৬৬) ছিল তাঁর, সর্বোচ্চ ছক্কাও (৩৮)।

আরও পড়ুন

ব্যাটিংয়ের কৌশলগত পরিবর্তন হয়তো হয়েছে। দর্শন থেকে গেছে সেই একই—‘সি বল, হিট বল।’

এভাবে মেরে খেলে কীভাবে বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব? এমন প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক। কাল ম্যাচ শেষে সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে অ্যালেনের উত্তর, ‘আমি ও টিম সব সময় ব্যাটিং খুব সহজ রাখার চেষ্টা করি। বল যেভাবে আসে, সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখাই।’
টিম মানে টিম সাইফার্ট অ্যালেনের ওপেনিং সতীর্থ। প্রথম বল থেকেই মেরে খেলেন বলে দুজনকে একসঙ্গে কেউ কেউ ‘ব্যাশিং ব্রাদার্স’ও বলেন। সাইফার্টের দাবি, গলফ কোর্সে তিনি বল অ্যালেনের চেয়ে জোরে মারেন। কিন্তু ক্রিকেট বলটা তাঁর চেয়ে অ্যালেনই বেশি জোরে মারেন।

ইডেনে কাল অ্যালেনের সেই মার দেখেছেন অনেকেই। তাঁর বাবা–মাও কি দেখেছেন? ভারতে সন্ধ্যায় ম্যাচটি যখন চলছিল, নিউজিল্যান্ডে তো তখন ভোর। তারপরও অ্যালেনের মনে একটা ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই। বলেছেনও তা, ‘আমি নিশ্চিত বাবা–মা জেগে পুরো ম্যাচই দেখেছেন। আশা করি, তারা গর্বিত।’
শেষ কথাটা নিয়ে কারও মনে সংশয়ই থাকার কথা নয়।