আইসিসি রেটিংয়ে কাঠগড়ায় বাংলাদেশের পিচ

আইসিসি রেটিংয়ে বাংলাদেশের মাঠগুলোর দুর্দশা ফুটে উঠেছে। ছবি ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে তোলাশামসুল হক

মাত্র দুই দিনে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের বক্সিং ডে টেস্ট শেষ হওয়ায় মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডের (এমসিজি) উইকেটের সমালোচনা করেছেন অনেকে। আইসিসি নিযুক্ত ম্যাচ রেফারি এমসিজির পিচকে ‘অসন্তোষজনক’ রেটিং দেওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পিচের আচরণ নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণও শুরু হয়েছে।

যার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লুটিসি) ম্যাচগুলোতে আইসিসির দেওয়া রেটিংয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক হতাশাজনক ছবিই ফুটে উঠেছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদকৃত তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পিচের মান এবং আউটফিল্ড—দুই ক্ষেত্রেই টেস্ট খেলুড়ে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ব্যাটসম্যান এবং বোলার, দুই পক্ষের জন্য ভালো উইকেটের স্বীকৃতি দেওয়া হয় যে রেটিংয়ে, বাংলাদেশ সেখানে সব দলের মধ্যে তলানিতে অবস্থান করছে।

পিচ রেটিং আসলে কী

ক্রিকেটে একটি ম্যাচের ফল নির্ধারণে পিচের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। যেমন ভালো স্পিনার থাকা দলগুলো স্পিনবান্ধব উইকেটে ভালো করে, আবার ভালো পেসার থাকা দল সিম-সহায়ক উইকেটে ভালো করে। কিছু পিচ আবার পুরোপুরি ব্যাটিংবান্ধব। আইসিসি মাঠে খেলোয়াড়দের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং ব্যাট ও বলের মধ্যে ন্যায্য লড়াই বজায় রাখতে রেটিং ব্যবস্থা চালু করেছে।

প্রতিটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের পর মাঠের পিচ ও আউটফিল্ডের রেটিং করে থাকেন ম্যাচ রেফারি, যা আইসিসিতে জমা হয়। ২০২৩ সালের নভেম্বরের আগপর্যন্ত রেটিং দেওয়া হতো ৬ ক্যাটাগরিতে। এগুলো ছিল ‘খুব ভালো’, ‘ভালো, ‘গড়পড়তা’, ‘গড়পড়তার নিচে’, ‘বাজে’ এবং ‘খেলার অযোগ্য’।

২০২৪ সালের ২২ মার্চ শুরু বাংলাদেশ–শ্রীলঙ্কা সিলেট টেস্টের পিচ ও আউটফিল্ড ‘খুব ভালো’ রেটিং পেয়েছিল
প্রথম আলো

তবে দুই বছরের বেশি সময় ধরে চারটি ক্যাটাগরিতে রেটিং দেওয়া হয়—‘খুব ভালো’, ‘সন্তোষজনক’, ‘অসন্তোষজনক’ ও ‘খেলার অযোগ্য’। আইসিসির মতে, একটি ‘খুব ভালো’ পিচে সীমিত সিম মুভমেন্ট, ধারাবাহিক বাউন্স, খেলার শুরুর দিকে গ্রহণযোগ্য মাত্রার টার্ন থাকবে এবং এতে পিচের ক্ষয় হবে স্বাভাবিকভাবে। আবার যে পিচ ব্যাট ও বলের মধ্যে সমান লড়াইয়ের সুযোগ দেয় না, সেটি ‘অসন্তোষজনক’। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপজ্জনক পিচকে দেওয়া হয় ‘আনফিট’ গ্রেডিং।

আরও পড়ুন

আউটফিল্ড গ্রেডিংয়ে ‘সন্তোষজনক’ ধরা হয় যে মাঠের আউটফিল্ডে পর্যাপ্ত ঘাস থাকবে, সমতল হবে, গতি মাঝারি হবে এবং পর্যাপ্ত পানিনিষ্কাশনব্যবস্থা থাকবে। আর ‘অসন্তোষজনক’ হচ্ছে যেখানে অতিরিক্ত ঘাসবিহীন জায়গা, অত্যধিক অনিয়মিত বাউন্স, ধীরগতি এবং পর্যাপ্ত পানিনিষ্কাশনব্যবস্থার অনুপস্থিতি আছে।

প্রশ্ন হতে পারে, এই রেটিংয়ের সুবিধা-অসুবিধা কী?

অসুবিধা রেটিংয়ের সঙ্গে থাকা ডিমেরিট পয়েন্টে। যেসব ভেন্যুর পিচ বা আউটফিল্ড ‘অসন্তোষজনক’ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাদের ১টি ডিমেরিট পয়েন্ট দেওয়া হয়। ‘অযোগ্য’ পিচ বা আউটফিল্ডের জন্য সবচেয়ে কঠোর শাস্তি ৩টি ডিমেরিট পয়েন্ট।
যদি কোনো ভেন্যু পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে ৬টি ডিমেরিট পয়েন্ট পায়, তাহলে সেটিতে ১২ মাসের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজন নিষিদ্ধ করা হয়। যদি কোনো ভেন্যু পাঁচ বছর সময়ের মধ্যে ১২টি ডিমেরিট পয়েন্ট পায়, তবে তাদের ম্যাচ আয়োজনের অধিকার দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হয়।

পিচের মানে তলানিতে বাংলাদেশ

২০১৯ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হয়েছে। দুই বছর মেয়াদি প্রতিযোগিতাটির এখন পর্যন্ত তিনটি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৫ সালের আগস্টে শুরু হয়েছে ২০২৫-২৭ চক্রের আসর। চার আসর মিলিয়ে এখন পর্যন্ত হওয়া ৯ দেশের ২২৪টি ম্যাচের রেটিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে উইজডেন ওয়েবসাইট। মোট ৫৮টি ভেন্যুতে হওয়া ম্যাচগুলোর পিচ ও আউটফিল্ড রেটিং বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের অবস্থান সবার শেষে।

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ১৩টি ম্যাচের পিচ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাত্র ১৫.৩৮% পিচকে আইসিসি ‘খুব ভালো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই তালিকায় বাংলাদেশের নিচে রয়েছে শুধু শ্রীলঙ্কা (৫.৫৫%)। দুশ্চিন্তার জায়গা হচ্ছে, বাংলাদেশের পিচগুলোর মধ্যে ৭.৬৯% পিচ পেয়েছে ‘অসন্তোষজনক’ রেটিং, যা শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে শূন্য। মোটের ওপর বাংলাদেশই পিছিয়ে।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে কোন দেশের পিচ কতটা ভালো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

তুলনামূলক বিচারে নিউজিল্যান্ডের ৮১.৮১% এবং অস্ট্রেলিয়ার ৪৩.৭৫% পিচ ‘খুব ভালো’ তকমা পেয়েছে। এমনকি ইংল্যান্ড ও ভারতের উইকেটগুলোও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি ইতিবাচক রেটিং পেয়েছে।

বাংলাদেশের তিন মাঠে যেসব খেলা হয়েছে, তার মধ্যে ‘খুব ভালো’ পিচ রেটিং আছে মাত্র দুটি। দুটিই ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কা দলের বাংলাদেশ সফরের। সে বছরের মার্চ-এপ্রিলে হওয়া সিরিজের প্রথম টেস্ট হয়েছিল সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে, দ্বিতীয়টি চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে।

১৩ ম্যাচের মধ্যে একটি খেলার পিচ পেয়েছে ‘অসন্তোষজনক’ রেটিং। ২০২৩ সালের জুনে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজের ম্যাচটি ছিল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে।

*২০২৪ সালে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের রেটিং পাওয়া যায়নি।

আউটফিল্ডেও নেই স্বস্তি

শুধু ২২ গজের পিচ নয়, বাংলাদেশের মাঠের আউটফিল্ডের মানও অস্বস্তিকর। ১৩টি টেস্টের মধ্যে বাংলাদেশের মাত্র ৪৬.১৫% আউটফিল্ড ‘খুব ভালো’ রেটিং পেয়েছে। অথচ অস্ট্রেলিয়া (৯৩.৭৫%), নিউজিল্যান্ড (৯০.৯০%) এবং ইংল্যান্ডের (৮৫.৩৬%) মতো দেশগুলো আউটফিল্ডের মানে যোজন যোজন এগিয়ে।

বাংলাদেশে মোট ৬টি ম্যাচের আউটফিল্ড ‘খুব ভালো’ রেটিং পেয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে হওয়া বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজের প্রথম টেস্টের আউটফিল্ড পেয়েছিল ‘অসন্তোষজনক’ রেটিং। অন্যগুলো ‘ভালো’ বা ‘সন্তোষজনক’ ক্যাটাগরির।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে কোন দেশের আউটফিল্ড কতটা ভালো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো