কোহলিকে ছাড়িয়ে ‘প্লুটো’ থেকে ‘বুধ’ হওয়ার অপেক্ষায় বেনেট
ছোট দলের বড় তারকা এখনো হয়ে ওঠেননি। তবে সে পথেই আছেন বলা যায়। আর সমস্যাটাও ঠিক এখানেই। ছোট দলের বড় তারকা হয়ে গেলে সংবাদ সম্মেলনে তো সবাই তাঁকে চিনতেনই। ব্রায়ান বেনেটের কপাল খারাপ। চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক তাঁকে চিনতে পারলেন না।
বেনেটকে সেই সাংবাদিকের প্রশ্ন, ‘বেনেটের সেঞ্চুরির সুযোগ ছিল। আপনাদের ব্যাটাররা কেন তাঁকে সেঞ্চুরির সুযোগ দিল না?’
বেনেট একটু হতচকিত—কিছুক্ষণ আগেও যশপ্রীত বুমরাকে খেলার সময়ও তাঁকে এমন লাগেনি। তবে মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘দুঃখিত। আমিই বেনেট।’
সেই সাংবাদিকের তখন কী মনে হয়েছিল, সেটা তো আর জানা সম্ভব নয়। তবে এ ঘটনা থেকে একটি সিদ্ধান্তে আসা যায়। এই বিশ্বসংসারের মতো বৈশ্বিক ক্রিকেটের সংসারও আসলে তারকামুখী। মাটিতে থাকা বেনেটদের তাই নিজেকে চেনাতে কষ্ট হয়।
কিন্তু বেনেট চেষ্টা করেছেন সাধ্যমতো—যতটা করতে পারেনি সম্ভবত তাঁর দল জিম্বাবুয়েও। হ্যাঁ, গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কাকে তাঁরা হারিয়েছে, পরশু ভারতের বিপক্ষেও সামর্থ্যের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছে। কিন্তু এই তিন ম্যাচে বেনেটই তো জিম্বাবুয়ের শীর্ষবিন্দু। বলতে পারেন, মাটিতে থাকা জিম্বাবুয়ের সামর্থ্যের সীমানা ফুঁড়ে বেনেট এখন ক্রিকেটের আকাশে তারকা হয়ে উঠছেন।
নক্ষত্রের নিজস্ব আলো আছে। বেনেট–আলোর রূপটা এমন—৫ ইনিংসে ১৩৫.৭৮ স্ট্রাইক রেটে ২৭৭ রান, ৩ ফিফটি। এর মধ্যে ৪ ইনিংসেই অপরাজিত থাকায় গড় ২৭৭! ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার বাঘা বাঘা বোলাররা তাঁকে আউট করতে পারেননি এবং ফিফটি আছে এ তিন ম্যাচেই। এই আলোতেও যদি চোখ ধাঁধিয়ে না যায় তাহলে তুলনা করতে পারেন, ক্রিকেট–আকাশের এক বৃহস্পতির সঙ্গে। বিরাট কোহলি!
২০১৬ টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে তিনটি অপরাজিত ইনিংসে ২২৬ রান করেছিলেন কোহলি। এবার বেনেট নামের ‘প্লুটো’ আবির্ভূত হওয়ার আগে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের এক আসরে অপরাজিত ইনিংসে এত দিন কোহলির রানই ছিল সর্বোচ্চ। বেনেটের এই চারটি অপরাজিত ইনিংসে রান ২৭২। আগামীকাল সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের শেষ ম্যাচ। বেনেটও ‘প্লুটো’ থেকে ‘বুধ’ হয়ে ওঠার সুযোগ পাবেন।
কাব্য থাক। বাস্তবে ফেরা যাক। বিশ্বকাপ আসলে শক্তিতে ছোট দলগুলোর জন্য নিজেদের সামর্থ্য দেখানোর মঞ্চ। দল হিসেবে জিম্বাবুয়ে পরশু তা পারেনি; কিন্তু বেনেট পেরেছেন। সেটা শুধু স্কোরবোর্ডে নয়, সেই স্কোর করার পথে যশপ্রীত বুমরাকে মারা ছক্কায়ও। শটটি নিশ্চয়ই দেখেছেন? বিশ্বের অন্যতম সেরা পেসারকে ছোট দলের কোনো ওপেনার যখন ওভাবে অবলীলায় ছক্কা মারেন, তখন কেউ কেউ ভাবতে পারেন, এই দুনিয়া শুধুই বড়দের নয়।
ছোটরাও যে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে, বেনেটই তো তার প্রমাণ! তবে বেনেটের বেড়ে ওঠা একটু দ্রুতই। বুমরাকে প্রথম সাক্ষাতে কিছুই মনে না করে ভালো বলে ওভাবে ছক্কা মেরে ফিফটি তুলে নিতে সবাই পারেন না। অথচ বেনেটের বিনয় দেখুন, ‘বুমরার মুখোমুখি হওয়া সব সময়ই কঠিন।’
বুমরাকে ভুলে যান। অক্ষর প্যাটেলের ১২ বলে ২২ রান নেন বেনেট। অক্ষরকে এগিয়ে গিয়ে মারা খুব কঠিন। বেনেট সেটাও মেরেছেন। অথচ ছেলেটির বয়স মাত্র ২২ বছর, ৪ বছর আগে খেলেছেন অনূর্ধ্ব–১৯ বিশ্বকাপে, তারও বেশ আগে বাড়িতে বাবার তৈরি করে দেওয়া নেটে ক্রিকেট যমজ ভাইয়ের সঙ্গে। কিন্তু এখন কী পরিণত! এতটাই যে সিকান্দার রাজা ও শন উইলিয়ামসদের টপকে বেনেট এখন টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে জিম্বাবুয়ের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। সেটাও ক্যারিয়ারের প্রথম টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপেই!
হ্যাঁ, ছোট দলের আকাশে বড় তারকারই জন্ম হচ্ছে। নাকি হয়ে গেছে!