ক্রিকেট খেলায় ছেলেকে মারতেন বাবা, সেই ছেলে এখন বিশ্বকাপে, বাবা না–ফেরার দেশে
ক্রিকেট খেলার জন্য একসময় বাবার হাতে মার খেয়েছেন রিংকু সিং। একবার এক স্কুল টুর্নামেন্টের ফাইনালে হলেন ম্যাচসেরা, পুরস্কার পেলেন মোটরবাইক। রিংকুর ভাষায়, ‘বাবা ফাইনাল দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন আমি হয়তো ভালো কিছুই করছি, তারপর ক্রিকেট খেলার জন্য আর কখনোই তিনি আমাকে মারেননি।’
বরং ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন বাবা খানচাঁদ সিং। শেষ পর্যন্ত সফলও হয়েছেন। ছেলের সাফল্য তিনি দেখে যেতে পারলেন। ‘যেতে পারলেন’—কথাটির অর্থ হলো আজ সকালে মারা গেছেন রিংকুর বাবা খানচাঁদ সিং।
মাসে ১২ হাজার রুপি বেতনে এলপিজি সিলিন্ডার ডেলিভারির কাজ করতেন রিংকুর বাবা খানচাঁদ। দীর্ঘদিন রিংকু পরিবারের সঙ্গে গ্যাস কোম্পানির দেওয়া দুই কক্ষের একটি কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে খানচাঁদের জীবনে ত্যাগের শেষ ছিল না। পরিবারকে একটু ভালো রাখতে, রিংকুর ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পথটা আরও সুগম করতে সাইকেলে এলপিজি সিলিন্ডার চাপিয়েছেন ধারণক্ষমতার বেশি। বাবার এমন কষ্টের ভিতে দাঁড়িয়ে রিংকু সাফল্যের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে এখন ভারত জাতীয় দলের হয়ে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে।
রিংকু ক্রিকেটার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই পুরোনো বাড়ি ছেড়েছেন। কাছাকাছিই একটি তিনতলা বিলাসবহুল বাড়িতে উঠেছেন। কিন্তু খানচাঁদ সিং থেকে গেছেন সেই পুরোনো বাড়িতেই। রিংকু বাবাকে তাঁর বাসায় উঠতে অনেক অনুরোধ করলেও কাজ হয়নি। খানচাঁদের যুক্তি ছিল, ‘আমি যদি এই চাকরি ছেড়ে দিই, তাহলে কী করব? আমি তো অযোগ্য হয়ে পড়ব। এখন আমাদের যথেষ্ট টাকাপয়সা ও সব ধরনের আরাম-আয়েশ আছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত, আমরা আমাদের শিকড় ভুলি কীভাবে?’
শিকড় ভুলতে না–পারা সেই খানচাঁদ সিং মারা গেছেন ক্যানসারে ভুগে। আর সেই শিকড়ের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য ফলদ বৃক্ষ হয়ে ওঠা রিংকু বিশ্বকাপ ফেলে ছুটে গেছেন বাবার কাছে—যে বাবা একসময় তাঁকে মারতেন ক্রিকেট খেলার জন্য, সেই বাবাই পরে ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে লেগেছিলেন উঠেপড়ে। বাবারা বুঝি এমনই হয়!
খানচাঁদ জীবনের লড়াইয়ে সফল হলেও চতুর্থ স্তরের ক্যানসারের সঙ্গে আর পেরে ওঠেননি। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গ্রেটার নয়ডার যথার্থ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানকার মুখপাত্র চিকিৎসক সুনীল কুমার তাঁর লিভার ক্যানসারে ভুগে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন, ‘গত কয়েক দিনে তাঁর শারীরিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হয় এবং আজ ভোরে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।’
ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’ জানিয়েছে, বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটার পর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে দল ছেড়ে বাসায় গিয়েছিলেন রিংকু। গতকাল চেন্নাইয়ে জিম্বাবুয়ে-ভারত ম্যাচের আগে দলে ফিরলেও একাদশে ছিলেন না। বদলি ফিল্ডার হিসেবে ফিল্ডিং করেছেন। ২৮ বছর বয়সী এ ক্রিকেটার বাবার মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে শোক ভাগ করে নিতে ফিরেছেন আলিগড়ে।
টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠতে সুপার এইটে আগামী রোববার কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভারতের ম্যাচটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। রিংকু এ ম্যাচে খেলবেন কি না, কিংবা টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপেই তাঁকে আর দেখা যাবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। বিসিসিআই কিংবা ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে অফিশিয়ালি এখনো কিছু জানানো হয়নি। ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, আলিগড়েই খানচাঁদ সিংয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে এবং রিংকু তাতে উপস্থিত থাকবেন।
রিংকুর বাবার মৃত্যুতে শোক জানান ভারতের সাবেক অফ স্পিনার হরভজন সিং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে করা পোস্টে হরভজন বলেন, ‘রিংকু সিংয়ের বাবা খানচাঁদ সিংয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছি। রিংকু ও তার পরিবারের জন্য এটা কঠিন সময়, যদিও সে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজের দায়দায়িত্বের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমার আন্তরিক প্রার্থনা রইল।’
গত বছর খানচাঁদ সিংকে দামি একটি স্পোর্টস বাইক (কাওয়াসাকি নিনজা ৪০০) উপহার দেন রিংকু। খানচাঁদ আবেগে ভেসে তখন ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘আউটলুক’কে বলেছিলেন, ‘আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো সে আত্মসম্মান ফিরিয়ে এনেছে। আগে, গ্যাস এজেন্সিতে আমার বস আমাকে অপমান করতেন, কুৎসিত ভাষা ব্যবহার করতেন এবং আমাকে অন্য শ্রমিকের মতোই দেখতেন। এখন তিনি আমার সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন এবং ‘সাহেব’ বলে সম্বোধন করেন।’
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত ৫ ইনিংসে ব্যাট করে ২৪ রান করেছেন রিংকু। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁর জায়গায় খেলেন সঞ্জু স্যামসন।