সুপার কম্পিউটারকে যদি বলা হয় এমন একজন ক্রিকেটার বানিয়ে দাও, মাঠে নেমে যে সবকিছু করতে পারবে। সুপার কম্পিউটার যা বানিয়ে দেবে, সেটির কী নাম দেবেন? উত্তরটা খুব সহজ—গ্যারি সোবার্স। অথচ ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান এই অলরাউন্ডার সুপার কম্পিউটারের বানানো কোনো কল্পনার ক্রিকেটার ছিলেন না, ছিলেন রক্তমাংসের মানুষই। যদিও মাঠে তাঁকে দেখে এ নিয়ে কারও সন্দেহ জাগতেই পারত।
কী করতে পারতেন না সোবার্স! ব্যাটসম্যান হিসেবে সর্বকালের সেরাদের ছোট্ট তালিকাতেও রাখতে হয় তাঁকে, পেস–স্পিন দুই রকম বোলিংয়েই ছিলেন প্রায় সমান পারদর্শী, অর্থোডক্স স্পিনের সঙ্গে করতে পারতেন রিস্ট স্পিনও। মাঠের যেকোনো জায়গায় ছিলেন দুর্দান্ত ফিল্ডার, ক্লোজ ইন পজিশনে দাঁড়ালে ক্যাচ যেন চুম্বকের মতো আটকে যেত তাঁর হাতে। প্রায় অলৌকিক এক ক্ষমতা নিয়ে এসেছিলেন পৃথিবীতে। তারপরও রক্তমাংসের মানুষই তো! যে কারণে পৃথিবী ছেড়ে চলেও যেতে হলো। সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে যাঁর প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য স্বীকৃতি, সেই স্যার গ্যারি সোবার্সের জীবনের ইনিংস শেষ হয়ে গেছে গতকাল। বার্বাডোজে নিজের বাড়িতেই ফেলেছেন শেষনিশ্বাস। পৃথিবীতে তাঁর বিচরণ ৮৯ বছর। ক্রিকেট ইতিহাসে অনন্তকাল।
ক্যারিয়ারের পড়ন্ত বেলায় ওয়ানডে খেলেছেন মাত্রই একটি। টেস্ট ক্রিকেটারই তাই সোবার্সের আসল পরিচয়। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত প্রায় দুই দশকের ক্যারিয়ারে টেস্ট খেলেছেন ৯৩টি। তাতে ৫৭.৭৮ গড়ে ৮০৩২ রান, ২৬টি সেঞ্চুরি। বোলিংয়ে ৩৪.০৩ গড়ে ২৩৫ উইকেট। ক্যাচ নিয়েছেন ১০৯টি। কিন্তু এসব সংখ্যার সাধ্য কি সোবার্সকে বোঝায়! নিছক পরিসংখ্যানের বিচারে দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাক ক্যালিসকেই তো হয়তো একটু এগিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু মাঠে যা খুশি তা–ই করার সামর্থ্যে, খেলাটিতে প্রভাব বিস্তারে ক্যালিস কেন, স্যার গ্যারি সোবার্সের সঙ্গে আর কারোরই তুলনা চলে না। তাঁর মতো কেউ আসেনি, আর কোনো দিন আসবে বলেও বিশ্বাস হতে চায় না।
জন্ম হয়েছিল বার্বাডোজের এক হতদরিদ্র পরিবারে। জন্মের সময় দুই হাতেই ছিল একটি করে বাড়তি আঙুল। একদিন ক্রিকেট মাঠে অতিমানবীয় সব কাণ্ড করবেন, সেটিরই ইঙ্গিত ছিল কি না, কে জানে! বাড়তি সেই দুটি আঙুল নিজেই নাকি ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছিলেন। অবিশ্বাস্য এই গল্প সোবার্সের আত্মজীবনীতে লেখা আছে, শুনেছি তাঁর নিজের মুখেও। ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্বাডোজের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। সেটিও সফরকারী ভারতের বিপক্ষে। প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়ে ভারতকে ফলোঅন করানোয়ও বড় ভূমিকা ছিল তাঁর। এক বছর বোলার হিসেবেই টেস্ট অভিষেক। জ্যামাইকায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট। ব্যাটিংয়ে দুই ইনিংসে ১৪ ও ২৬ রান। এর চেয়ে বেশি করবেন কীভাবে! ব্যাটিং করেছেন যে ৯ নম্বরে।
ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেতে পেতে ওপেনিংও করেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি ব্যাটিং করেছেন ৬ নম্বরে। ইতিহাস গড়া প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিটি করেছিলেন অবশ্য ৩ নম্বরে খেলে। ২১ বছর বয়সী সোবার্সের সেটি ১৭ নম্বর টেস্ট। পাকিস্তানের বিপক্ষে কিংস্টনের স্যাবাইনা পার্কে ৩৬৫ রান করে লেন হাটনের সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংসের রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার পর দর্শক নেমে যায় মাঠে। উইকেট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেদিন আর খেলা হয়নি। পরদিন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংস ঘোষণা করে না দিলে কত রানে থামতেন কে জানে!
তারপরও টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রানের এই রেকর্ড টিকে ছিল ৩৬ বছর। ১৯৯৪ সালে ব্রায়ান লারা যখন তা ভেঙে দেন, তাঁকে অভিনন্দন জানাতে মাঠে নেমে যান সোবার্স। ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই একজন ভেঙেছেন বলে রেকর্ড হারানো নিয়ে বিন্দুমাত্র খেদও ছিল না তাঁর।
সেই ট্রিপল সেঞ্চুরির এক দশক পর ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে আরেক কীর্তি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম ওভারের ৬ বলেই ছক্কা। সোয়ানসিতে যা করে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে খেলা সোবার্স গ্ল্যামরগনের বাঁহাতি বোলার ম্যালকম ন্যাশকেও ইতিহাসে অমর করে দেন। যদিও এই রেকর্ডটি নিয়ে সোবার্সের মোটেই কোনো উচ্ছ্বাস ছিল না। ২০০৯ সালে বার্বাডোজে সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় এই রেকর্ড নিয়ে কথা বলতে বরং পরিষ্কার অনাগ্রহই প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ছয় বলে ছয় ছক্কা কোনো ভালো ক্রিকেট নয়। কোনো তরুণ ক্রিকেটারকেই আমি তা করতে বলব না।’
যদিও ক্রিকেট ইতিহাস আরও অনেক কিছুর মতো এ কারণেও মনে রেখেছে। আইসিসির বর্ষসেরা পুরুষ ক্রিকেটারের পুরস্কারের নামটি যে স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি—এটাও কিছুটা বলে দেয় সোবার্স–মাহাত্ম্য।
তবে পরিসংখ্যান নিয়ে যা বলা হয়েছিল, তা বলা যায় এখানেও। সোবার্সকে এতেও বোধ হয় পুরোটা বোঝানো যায় না। ক্রিকেটার হিসেবে তিনি ছিলেন ‘একের ভেতরে অনেক’। ওই যে সুপার কম্পিউটারকে বললে যেমন বানাত আর কী!
