ওমান যাওয়া হয়নি, নিয়তি রাকিবের জন্য লিখে রেখেছিল এক রোমাঞ্চকর গল্প
ভাগ্যটা একটু ভালো হলে রাকিব হাওলাদার এখন থাকতে পারতেন ওমানে। গত এপ্রিলে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে ৪ ইনিংসে ১৩ উইকেট নিয়েছিলেন। ডাক পেয়েছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পেও। কিন্তু ওমানে আফগানিস্তানের বিপক্ষে চার ম্যাচের সিরিজের দলে রাকিবের জায়গা হয়নি।
তাঁকে স্বাভাবিকভাবেই তখন ঘিরে ধরেছিল হতাশা। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের রেলগাড়িতে চলতে না পারলে দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে হয়। রাকিব তা জানতেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, নিয়তি তাঁর জন্য লিখে রেখেছিল ভিন্ন এক গল্প।
সমবয়সী সতীর্থরা যখন অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে খেলছেন, বাঁহাতি স্পিনার রাকিবের তখন অভিষেক হয়ে গেছে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। শুধু অভিষেক বললেও ঠিকঠাক বোঝানো যায় না ঘটনাটা, অভিষেকেই তিনি পেয়ে গেছেন ৫ উইকেটও। সেখানেও আবার নাটকীয়তা, তিনি যে ম্যাচে ৫ উইকেট পেয়েছেন, সেই ম্যাচের একাদশেই ছিলেন না!
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। জাতীয় ক্রিকেট লিগে চট্টগ্রামের বিপক্ষে খুলনার একাদশে ছিলেন না রাকিব। দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিংয়ের সময় বাঁহাতি স্পিনার সামিউন বাসীর মাথায় বলের আঘাত পান। তখনই রাকিব প্রথম জানেন, সুযোগ মিলতে পারে তাঁর।
গতকাল মুঠোফোনে তিনি বলছিলেন সেই গল্প, ‘রাতুল ভাই (সামিউন) মাথায় আঘাত পাওয়ার পরও ব্যাটিং করে গেছেন। কিন্তু ড্রেসিংরুমে ফেরার পর ওনার খারাপ লাগতে শুরু করে। পরে যখন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, তখন তুষার (ইমরান) স্যার আমাকে বলেছিলেন যে তোর খেলতে হতে পারে, তৈরি থাক।’
রাকিবের বয়সটা এখনো ১৮ পার হয়নি। বড়দের ক্রিকেটের কোনো সংস্করণেও পা পড়েনি। তাঁরই কিনা একটা ম্যাচের মাঝপথে মাঠে নেমে যেতে হচ্ছে। তখন মনের অবস্থা কেমন? রাকিবের উত্তরে মিশে থাকে কৈশোরের সারল্য, ‘শুরুতে একটু ভয় ভয় লেগেছিল।’
সেই ভয়টা তাঁর কেটে গেছে সামিউনের ‘লাইক টু লাইক’ বদলি হিসেবে মাঠে নামার পর। সবচেয়ে কম বয়সী ক্রিকেটার হিসেবে ড্রেসিংরুমে বড় ভাইদের আদরটা তাঁর জন্য তখন মাঠে হয়ে গিয়েছিল সাহস, ‘মিঠুন ভাই, মেহেদী ভাইরা আমাকে বলেছিল, তুই তোর বোলিংটা করে যা। আমিও বিশেষ কিছু ভাবিনি। নিজের মতো বোলিং করে গেছি।’
রাকিবকে নিয়ে ভেবেছিলেন আসলে তুষার ইমরান। ঘরোয়া ক্রিকেটে সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের ইতি টেনে অনেক দিন ধরেই তিনি কোচিংয়ে নাম লিখিয়েছেন। গত এপ্রিলে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে তাঁর দায়িত্ব ছিল দক্ষিণাঞ্চলের।
তখনই রাকিবকেও প্রথম দেখেন তুষার। এক জায়গায় টানা বল করে যাওয়ার সামর্থ্যের কারণে রাকিবকে পছন্দ হয়ে যায় তাঁর। সেটি এতটাই যে স্বীকৃত ক্রিকেটে পা না পড়া রাকিবকে জাতীয় ক্রিকেট লিগে খুলনা দলে নিতে একরকম লড়াই করেছেন।
তা জাতীয় লিগে খুলনার প্রধান কোচের মুখেই শুনুন, ‘অনেক কষ্ট করে সবাইকে রাজি করাতে হয়েছে। নির্বাচকদের সঙ্গে যে মিটিং ছিল, ওখানে শুধু রাকিবকে নিয়েই ৪৫ মিনিট কথা বলতে হয়েছে। ওরা দিতে চাইছিল না। বলছিল আগে কোথাও খেলে আসুক, তারপর রাখেন। আমি বলেছি না, রাখলে এখনই রাখব।’
দলের সঙ্গে রাখতে পারলেও এত দ্রুত ম্যাচ খেলানোর কথা ভাবনায় ছিল না তুষার ইমরানেরও। এবার দলের সঙ্গে রেখে থিতু করে আগামী মৌসুমে সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য রাকিবের জন্য লিখে রেখেছিল অন্য গল্প।
দীর্ঘদিন ধরে খুলনা যে একজন বাঁহাতি স্পিনার খুঁজে বেড়াচ্ছিল, সেটির সামর্থ্য রাকিবের ভেতর আগেই দেখেছিলেন তুষার। সুযোগ পেয়ে অভিষেকেই ৫ উইকেট নিয়ে তা প্রমাণও করেছেন রাকিব।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে এমনিতে বাঁহাতি স্পিনারের টান পড়েনি কখনো। তাঁদের পথ ধরেই এগোতে চান রাকিব। শুরুটা তো মন্দ হয়নি। এবার তা ধরে রাখার পালা।