যেখানে হোপ সেখানেই আশা
আশা মানে প্রত্যাশা, কিছু ক্ষেত্রে ভরসা বা নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস। ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক শাই হোপের নামের শেষ অংশের অর্থও তা-ই। তবে নামের অর্থের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের মিল খুঁজতে অভিধান ঘাঁটার দরকার নেই। হোপ ব্যাট হাতে ক্রিজে দাঁড়ালেই তো স্বপ্ন দেখে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
সেটাও নতুন নয়, অনেক বছর ধরেই হোপের ব্যাটে আশার ভেলা ভাসাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। দলে তারকাদের আসা–যাওয়ার মাঝে একমাত্র হোপই সব সময় আশার মাস্তুল হয়ে থাকেন। গতকাল ভারতের বিপক্ষে টি-টুয়েন্টি ম্যাচটি এই তালিকার স্রেফ নতুন সংযোজন।
রাঁচিতে ভারতের বিপক্ষে এই ম্যাচে ৪৫ বলে সেঞ্চুরি করেন হোপ। দলকে জিতিয়েছেন ২৫০ রানের লক্ষ্য ছুঁয়ে, যা টি-টুয়েন্টিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল রান তাড়া।
টি-টুয়েন্টিতে হোপ আগেও সেঞ্চুরি করেছেন। গত বছর বাসেটেরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১০২ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন। কালও করেছেন ১০২। তবে দুটোর পার্থক্য আছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে হোপ সেঞ্চুরি করেন ৫৫ বলে, ১৭৮.৯৪ স্ট্রাইক রেটে।
তাঁর দল তুলেছিল ২১৪ রান, উইকেট এতটাই ব্যাটিং–সহায়ক ছিল যে এই রান অস্ট্রেলিয়া ২৩ বল বাকি থাকতে তাড়া করেছিল। ম্যাচ পরিস্থিতি বিবেচনায় হোপের সেই ইনিংসটি ছিল কিছুটা ধীরগতির।
হোপের ব্যাটিং নিয়ে এই প্রশ্ন অবশ্য নতুন নয়। রান করেন, বড় ইনিংসও খেলেন; কিন্তু সেই রান দলের কতটা কাজে আসে, তা নিয়ে আলোচনা আছে অনেক দিন ধরেই। বাংলাদেশের সমর্থকদেরও এ প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে ২০১৯ বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেদিন ৯৬ রান করতে হোপ খেলেছিলেন ১২১ বল।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ তুলেছিল ৩২১ রান, যা বাংলাদেশ পেরিয়ে যায় ৫১ বল হাতে রেখেই। ম্যাচের ফলই বুঝিয়ে দিয়েছিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ যথেষ্ট ছিল না। প্রশ্ন উঠেছিল হোপের ইনিংসের গতি ও কার্যকারিতা নিয়েও।
সেদিক থেকে কালকের ইনিংসটি ছিল একেবারে নিখুঁত। ওপেনিংয়ে নেমে দেখলেন, প্রথম ওভারেই ফিরেছেন আরেক ওপেনার ও তিন নম্বরে নামা ব্যাটসম্যান। অন্য প্রান্তে ভারতীয় পেসার মায়াঙ্ক যাদব একের পর এক গতির ‘বোমা’ ছুড়ছেন। এমন চাপের মধ্যেও নিজের কাজটা করে গেছেন হোপ।
চতুর্থ উইকেটে শেরফেন রাদারফোর্ডের সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল ৫৪ বলে ১২০ রানের। এই জুটিতে হোপের ভূমিকা ছিল সঙ্গীর মতো। জানতেন, রাদারফোর্ড তাঁর চেয়েও ভয়ংকর। তাই এক প্রান্ত আগলে রেখে তাঁকে খেলতে দিয়েছেন। ১২০ রানের জুটিতে রাদারফোর্ড একাই করেছেন ৮৪ রান।
রাদারফোর্ড ফিরতেই বদলেছে হোপের ভূমিকা। রোমারিও শেফার্ডকে নিয়ে মাত্র ২৬ বলে যোগ করেন ৭৪ রান। এবার আর সঙ্গীকে এগিয়ে দেওয়ার পালা নয়, সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন হোপ নিজেই। তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে মাত্র ১৩ বলে ৩৯ রান।
হোপের বিশেষত্বই এখানে। খেলার মেজাজটা ধরতে পারেন। চলতি সফরেই তো ওয়ানডেতে অপরাজিত ১৬২ রানের ইনিংস খেলেছেন। সেদিনের ইনিংসও অনেকের জন্য উদাহরণ হতে পারে।
হোপ সেই ইনিংসটা খেলেছিলেন চোট নিয়ে। কুঁচকিতে ব্যথার কারণে অনেক রান খুঁড়িয়েও নিয়েছেন। ইনিংসও গড়েছেন নানাভাবে। এই যেমন ২৭ থেকে ৪১ ওভারের মধ্যে একটি বাউন্ডারিও মারেননি হোপ। লেগ সাইডে বল ঠেলে সিঙ্গেল নিয়েছেন।
স্ট্রাইক রোটেট করেছেন। নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। তাঁর স্ট্রাইক রেট নেমে গিয়েছিল এক শর নিচে। তারপর সময় বুঝে বড় শট খেলেছেন। দলকে এনে দিয়েছেন ৩৫১ রান তাড়া করে জয়। এর আগের ওয়ানডেতেও করেছিলেন সেঞ্চুরি।
ইনিংস গড়ার ধৈর্য হোপের মধ্যে শুরু থেকেই ছিল। ঘাটতি ছিল শেষটা রাঙানোয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্য ব্যাটসম্যানদের মতো চাইলেই বড় শট খেলে ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারতেন না। সেই দক্ষতাও ধীরে ধীরে নিজের ব্যাটিংয়ে যোগ করেছেন হোপ। ইনিংস গড়ার সঙ্গে এখন ঝড় তোলার ক্ষমতাও তাঁর আছে। আর এই দুইয়ের মিশেলেই হোপ এখন ক্যারিবিয়ানদের সত্যিকারের আশার প্রতীক।
পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট, নিজেকে কতটা বদলানোর চেষ্টা করছেন হোপ। তিন সংস্করণ মিলিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম আট বছরে, অর্থাৎ ২০২৩ সালের আগপর্যন্ত, তাঁর স্ট্রাইক রেট ছিল ৭২.১৪। ২০২৩ সাল থেকে তা বেড়ে হয় ৯১.৩১। ক্যারিয়ারের মোট ২৪৮ ছক্কার ১৭০টিই মেরেছেন এই তিন বছরে। এই সময়ে ব্যাটিং গড়ও বেড়েছে, ৩৯.৭২ থেকে ৪৫.৩১।
উন্নতিটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ওয়ানডেতে। ২০২৩ সালের আগে এ সংস্করণে হোপের স্ট্রাইক রেট ছিল মাত্র ৮০.৮২। ২০২৩ সাল থেকে ব্যাট করছেন ৯৫.৬৮ স্ট্রাইক রেটে। বেড়েছে গড়ও, ৫১.৪৮ থেকে ৫৭.০৫।
হোপ বছরের পর বছর ধরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের পোস্টারবয়। চুক্তি নিয়ে জটিলতা, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেসহ নানা কারণে অনেক বড় নাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে নিয়মিত খেলেন না। সেদিক থেকে হোপ ব্যতিক্রম। ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলেই বড় নাম হয়ে উঠেছেন। এখন সব সংস্করণ মিলিয়ে সেরা ব্যাটসম্যানের আলোচনায় হোপও থাকেন।