নাম রাজাউল্লাহ, রাজত্ব যাঁকে ডাকে
ক্রিকেটের এক খুশবু আছে। কখনো কখনো এর খোসা ছাড়ানোর আগেই নাকে এসে লাগে। মানে অপেক্ষা করতে হয় না। দেখা যায়, টেস্টের প্রথম বল থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুগন্ধে নাক ভুরভুর করে, জাদুর কাজল লাগে চোখে। সেটি দর্শকের প্রশান্তি।
এজবাস্টন টেস্টে প্রথম দিনে রাজাউল্লাহ বোলিং হাতে নেওয়ার আগ পর্যন্ত সেই প্রশান্তি ছিল না। অন্তত পাকিস্তানি ও নিরপেক্ষ দর্শকের জায়গা থেকে কথাটা বলাই যায়। প্রশান্তি নয়, সিরিজে শুরু থেকে জন্মেছিল অশান্তি। প্রথম দুই টেস্টে পাকিস্তানের নিঃশর্ত হারের একপেশে লড়াই, ৭ খেলোয়াড়কে দেশে পাঠানো, জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্তের হুমকি মিলিয়ে ভারসাম্যহীন লড়াইয়ের ‘হরর শো’তে কালশিটে পড়েছিল চোখে।
কিন্তু ২১ বছরের ছেলেটি বোলিং শুরু করতেই ছড়িয়ে পড়ল খুশবু। ব্যাটিংয়ে নামতেই গ্যালারিতে চোখে চোখে জাদুর কাজল। সেই ‘কাজলে’র পুরো নাম রাজাউল্লাহ মাসওয়ানি। মাইকেল আথারটনের ভাষায় ‘রাজবল’।
এজবাস্টনে সেই ‘রাজবল’ দর্শকের চোখের কাজল হয়ে ওঠার পথে কী কী করেছেন, তা এতক্ষণে আপনার জানা। সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে চলুন এক জায়গা থেকে ঘুরে আসি।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়ার আপার দির জেলার শহর নেহাগ দারা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ শহরেই জন্ম রাজাউল্লাহর। সেখান থেকে দুই বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে চলে যেতে হয় মারদানে। রাজাউল্লাহর পেটানো মুখ ও শরীরের মতোই রুক্ষ পাহাড়ি জায়গা; কিন্তু বিপুলা সম্ভারের, যেমনটা ছেলেটির প্রতিভা।
সেই প্রতিভার শিকড় প্যাঁচানো টেপ ও টেনিসে। বাংলাদেশেও অনেকের গল্পও তা–ই। আট ভাই–বোনের সংসারে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যেটা হয়, ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাবা ক্রিকেট খেলতে দেন না। বড় ভাইকে দেখে রাজাউল্লাহকেও সেই বারণের গরাদ ডিঙিয়ে টেপ টেনিস খেলতে হয় চুপিসারে; কিন্তু গায়ে ও কবজিতে জোর থাকলে টেপ টেনিসে নিজেকে বেশি দিন লুকিয়ে রাখা যায় না।
মারদানের আকমল খান ক্রিকেট একাডেমির প্রধান ও পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির সাবেক ক্রিকেটার আকমল খানের চোখে পড়েন। ক্রিকেট বলে দীক্ষাও নিতে শুরু করেন সেখানে। শেখার সে পথে ২০২৩ সালে নেমে পড়েন আন্তজেলা অনুর্ধ্ব–১৯ ক্রিকেটে। তারপর অ্যাবোটাবাদ আঞ্চলিক অনূর্ধ্ব–১৯ দলে। কৈশোরের সেই রাজাউল্লাহকে নিয়ে আকমল খানের স্মৃতিচারণা, ‘অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে নিজের প্রথম ম্যাচেই সে দলের সেরা পারফরমারদের একজন ছিল।’
কুঁড়িতেই সুবাস ছড়ানোয় মারদান জেলা দলে জায়গা করে নিতে রাজাউল্লাহর সময় লাগেনি। তখন হাতের চোটে কিছুদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়; কিন্তু মারদান থেকে রাজাউল্লাহর এজবাস্টন পর্যন্ত গিয়ে ‘রাজবল’ হয়ে ওঠার পুরো গল্প শুনলে বুঝবেন, এই ছেলেকে আসলে কোনোকিছুই ঠেকিয়ে রাখতে পারত না। কথায় আছে না, কপালের লিখন না যায় খণ্ডন!
টেস্ট অভিষেকে রাজাউল্লাহর প্রথম বলের গতি ছিল ঘণ্টায় ৮৯ মাইল/১৪৩ কিমি। সিরিজে পাকিস্তানি কোনো পেসারের দ্রুততম ডেলিভারি।
ঘরোয়ায় সুনাম বাড়ছিল রাজাউল্লাহর। তাতে অ্যাবোটাবাদ ৩০ জনের দলে থাকলেও ফার্স্ট ক্লাসের জার্সিটা সেখানে তাঁর গায়ে ওঠেনি। ঠিক তখনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় নিয়তি।
পেশোয়ার আঞ্চলিক দলের কোচ রাফাতুল্লাহ অতিথি খেলোয়াড় হিসেবে নিজেদের দলে নেন তাঁকে। এজবাস্টনে তৃতীয় দিনে রাজাউল্লাহ ৯টি ছক্কা মারার যে যৌথ বিশ্ব রেকর্ড গড়লেন, তার সুলুক সন্ধানে ফিরতে হয় এ দলের হয়েই ২০২৫–২৬ মৌসুমে কায়েদে–ই–আজম ট্রফির এক ম্যাচে। ঠিক তার আগের ম্যাচে পেশোয়ার অল্প রানে অলআউট হওয়ার পথে দশে নেমে সর্বোচ্চ রান করেছিলেন রাজাউল্লাহ। পরের ম্যাচেই রাজাউল্লাহ ওপেনার এবং সেঞ্চুরি, আরেক ইনিংসে ফিফটি।
পিএসএলে রাওয়ালপিন্ডিজের হয়ে গত মৌসুমে সেভাবে আলো ছড়াতে না পারলেও ন্যাশনাল ক্রিকেট একাডেমিতে (এনসিএ) অনুশীলনে রাজাউল্লাহর গতি মনে ধরে এইচপি পরিচালক আকিব জাভেদের। গত আগস্টে এনসিএতে পিসিবি আয়োজিত ১২ জনের বোলিং ক্যাম্পের ‘প্লেয়ার অব দ্য ক্যাম্প’ও হন রাজাউল্লাহ। তারপর ঠিক এখান থেকেই তাঁর জীবনটা পাল্টে গেল।
সেই পাল্টে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় পটভূমিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ডে তখন পাকিস্তান দলের অবস্থা তথৈবচ। দলে ১৪০ কিমি গতিতে বোলিংয়ের পেসারও নেই। সেই দুর্বলতা আগেই ঢাকতে এই সিরিজের আগে পাকিস্তানের তৎকালীন কোচ সরফরাজ খান বলে দেন, তাঁর দেশে নাকি গতিময় পেসারের বেশ অভাব। বটে!
প্রথম দুই টেস্টে হারের পর পাকিস্তান যে সাত খেলোয়াড়কে দলে ডাকে, রাজাউল্লাহ তাদেরই একজন। মাত্র ৮টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা এ বোলার এনসিএ থেকে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে গিয়েছিলেন। ওদিকে ইংল্যান্ডে পাকিস্তান দল হাস্যরস ও তির্যক কটূক্তিতে জেরবার। সরফরাজের জায়গা নেওয়া কোচ মাইক হেসন সম্ভবত ডেকে পাঠান রাজাউল্লাহকে। সে ডাকে রাজাউল্লাহর সাড়া দেওয়ার ঘটনাও বেশ নাটকীয়। শুনুন তাঁর মুখে, ‘একদিন সকালে ফজরের নামাজ পড়ার পরপরই (এনসিএর) নাবিল ভাই আমাকে ফোন করে দ্রুত এনসিএতে যেতে বলেন। যখন সেখানে পৌঁছাই, আমার জানাও ছিল না যে ইংল্যান্ডে পাঠানোর জন্য ডাকা হয়েছে।’
বাকিটা আপনার জানা। তবু ফিরে তাকাতে হয় ক্রিকেটীয় সেই খুশবু ছড়ানোর শিকড়সন্ধানে। টেস্ট অভিষেকে মাঠে নেমেই রাজাউল্লাহ আর দেরি করেননি। মহামতি প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ বইয়ে পলিমার্কাসের সেই কথার মতো, ‘যার যা প্রাপ্য তা দিতে’ শুরু করেন।
পাকিস্তান এই সিরিজে ধবলধোলাই হলেও সেই ‘পরিষ্কার’ হওয়ার মাঝেই জন্ম হলো একটি তারকার। নাম তাঁর ‘রাজবল’ কিংবা রাজাউল্লাহ নামে এক জাদুর কাজল।
টেস্ট অভিষেকে রাজাউল্লাহর প্রথম বলের গতি ছিল ঘণ্টায় ৮৯ মাইল/১৪৩ কিমি। সিরিজে পাকিস্তানি কোনো পেসারের দ্রুততম ডেলিভারি। বোলিংয়ে পাকিস্তান যে এই গতির অভাবেই ভুগেছে, সেটা বোঝা গেল চতুর্থ বলে। আবারও ৮৯ মাইল গতিতে বল, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান জো রুট এলবিডব্লু। একপেশে লড়াইয়ে গোটা সিরিজে নাক কুঁচকানো ইংরেজ দর্শকও ততক্ষণে এজবাস্টনের গ্যালারিতে বসে সেই খুশবুটা পেতে শুরু করেছেন—যাকে বলে ‘র ট্যালেন্টের’ সুবাস।
টেস্টে রাজাউল্লাহর সেই প্রথম ওভার মনে রাখবেন অনেকেই। পাকিস্তান কোনো পেসারকে নিকট অতীতে এতটা ভয়ংকর লাগেনি। ভয়ংকর সেই গতিময় সৌন্দর্যের সুবাসেই পরে ঝুলিতে জমা পড়ল আরও ৩ উইকেট। বিশ্লেষকেরা ততক্ষণে হামলে পড়েছেন। স্লিঙ্গিং অ্যাকশন, গতি এবং সুইংয়ে ওয়াকার ইউনিসকে মনে পড়েছে সবার।
‘বুরেওয়ালা এক্সপ্রেসে’র সম্মান এতটুকু হানি না করে বলা যায়, রাজাউল্লাহর শুরুটা অন্তত সুইংয়ে ওয়াকারকেও ছাপিয়ে গেছে। শুধু বড় বড় ইনসুইং ছিল ওয়াকারের শুরুতে, রাজাউল্লাহর দুটোই আছে। সরাসরি বলেছেনও বোলিংয়ে তাঁর ব্লু–প্রিন্ট ওয়াকারকে দেখেই, ‘শুরু থেকেই ওয়াকার ভাইকে অনুসরণ করি। তার মতো হওয়ার চেষ্টা করি।’
মজার বিষয়, ক্যামেরার সামনে রাজাউল্লাহকে দেখে মনে হয় গাঁয়ের সেই ছেলেটি, যে লেন্সে তাকিয়ে এমনিতেই হেসে ফেলে। মাঠেও ১৪৫ কিমি গতি তুলে স্ক্রিন দেখে ভেবেছিলেন ১৩৫ কিমি! এই সারল্যটুকু বুঝে এবং ব্যাটিং দেখে আন্দাজ করে নেওয়া যায়, তাঁর উইলোবাজির ‘ব্লুপ্রিন্ট’ কোত্থেকে নেওয়া?
টেপ টেনিস!
পেছনের পায়ে ভর করে একে একে মেরেছেন জফরা আর্চার এবং গাস অ্যাটকিনসনদের। বড় বড় ছক্কা। সামনের পা লেগ সাইডে একটু সরিয়ে লং অন ও মিড উইকেটের ওপর দিয়ে ‘হিটিং থ্রু দ্য লাইনে’ টেপ টেনিসের ব্যাটসম্যানরা ওভাবে মারেন; কিন্তু এ ব্লুপ্রিন্টের ভেতরকার ব্লুপ্রিন্ট আবার অন্যকিছু। তারুণ্যের ভয়ডরহীন সাহস!
তা না হলে পাকিস্তান ইনিংস হার এড়ানো থেকে মাত্র ২ রান দূরে থাকতে নয়ে নামা একজন ব্যাটসম্যান ছক্কা মারার সাহস পান কীভাবে! তার ওপর অ্যাটকিনসনকে এক ওভারেই মেরেছেন তিন ছক্কা। আর শটগুলোর কী ‘সাউন্ড’! সাধারণত হার্ড–হিটার ব্যাটসম্যানদের ব্যাটের ‘সু্ইট স্পটে’ বল লাগলেও সংঘর্ষের শব্দ একটু মিষ্টি হয়; কিন্তু রাজাউল্লাহর ব্যাট যখন ছক্কা মারতে বলে লেগেছে, সেটা অনেকটা কাঠ ভাঙার মতো ‘কড়াৎ’ কিংবা ‘মড়াৎ’ শব্দের মতো। আর্চারকে তো লেংথের বলে ছক্কা মেরেছেন শুধু ব্যাট চালানোর স্পিডে ভর করে, যেটা টেপ টেনিসে দেখা যায়।
পাকিস্তানের ড্রেসিংরুমে রাজাউল্লাহর ছক্কা মারার শব্দ যত পৌঁছেছে, বাবরদের মুখের হাসিও ধীরে ধীরে তত চওড়া হয়েছে। সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত সম্ভবত রাজাউল্লাহ আউট হওয়ার আগে রিভিউ নিয়ে এলবিডব্লু থেকে বেঁচে যাওয়ার সময়। পাকিস্তানের ড্রেসিংরুম যেভাবে হাততালিটা দিয়েছে, দেখে মনে হতে পারে এজবাস্টন টেস্টই জিতে নিয়েছে!
না, শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। পাকিস্তান এজবাস্টনেও হেরেছে; কিন্তু তৃতীয় দিনে রাজাউল্লাহর ৬৩ বলে সেই ৮১ রানের ইনিংস শেষ হওয়ার পর এজবাস্টনের গ্যালারি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছে। যেটা গোটা পাকিস্তান দলও পায়নি। আজ তাঁর ৫ ওভার বোলিংয়ের সময়ও বৃষ্টি ঝরেছে করতালির। সেই তালির আওয়াজে একটি বিষয় বোঝা গেল পরিষ্কার।
পাকিস্তান এই সিরিজে ধবলধোলাই হলেও সেই ‘পরিষ্কার’ হওয়ার মাঝেই জন্ম হলো একটি তারকার। নাম তাঁর ‘রাজবল’ কিংবা রাজাউল্লাহ নামে এক জাদুর কাজল।