এখন তিনটি প্রশ্ন—কেন এমন একজনকে অধিনায়ক করা হলো? বাজে পারফরম্যান্সের কারণে বাদ পড়া সাবেক অধিনায়ককে কেন আবার দলে নেওয়া হলো? নিলেও তাঁকে কেন অধিনায়ক করেই আনা হলো না? অঙ্ক করে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।

একটু বড় অঙ্ক এবং এই অঙ্কের উত্তর পিথাগোরাস সাহেবকে ফিরিয়ে এনেও মেলানো কঠিন বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। বিসিবির পিথাগোরাসরা যদি মেলাতে পারেন, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। অঙ্কের প্রণেতা যাঁরা, তাঁদের কাছে নিশ্চয়ই নোটবইও আছে।

কিন্তু আমি অঙ্কটা কিছুতেই মেলাতে পারছি না। পারছি না, কারণ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের আগেও জানতাম আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত মাহমুদউল্লাহর নেতৃত্বের আসন পাকা। বিশ্বকাপ খেলে তিনি হয়তো টি-টোয়েন্টিকে বিদায় বলবেন।

default-image

বাংলাদেশ দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ যাওয়ার আগে যখন সাকিব আল হাসানকে টেস্ট অধিনায়ক করা হলো, তখন বিসিবির এক নীতিনির্ধারককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহই থাকছেন তো, নাকি বোর্ডের অন্য চিন্তা আছে?

ফোনের অপর প্রান্তে ধপাস শব্দ শুনলাম যেন! আকাশ থেকে পড়ার শব্দ। ইথারে ভেসে সেটি অবশ্য একটু অন্যভাবে আমার কানে এল। যার সারমর্ম—মাহমুদউল্লাহর মতো ‘অল সেট’ একজন অধিনায়কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কীভাবে প্রশ্ন ওঠে? ‘ক্রিকেট ইজ আ ফানি গেম’, তাই বলে এতটা তো নয়!

প্রশ্নটা আসলে মাহমুদউল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিল না। ছিল ক্রিকেট বোর্ডের ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে, যে ভাবনার উইকেটে বাউন্স বড় অসম। এই একটা বল নিচু হলো তো পরেরটা কানের পাশ দিয়ে ধাঁই করে চলে গেল। সে জন্যই মনে প্রশ্নটা এসেছিল। অধিনায়ক বদলের হাওয়ায় নিশ্চয়ই মাহমুদউল্লাহও টালমাটাল হবেন।

টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর ‘নিশ্চিত ভবিষ্যতে’র ওই লো বাউন্স সামলে অপেক্ষায় ছিলাম কখন কানের পাশে ছোবল মারা বাউন্সারটা ওঠে। সেটি উঠল দল জিম্বাবুয়ে যাওয়ার আগে মাহমুদউল্লাহকে ‘ধন্যবাদ’ দিয়ে নুরুল হাসানকে অধিনায়ক করার পর।

default-image

নুরুল সাহসী ক্রিকেটার। বুকের ছাতির চেয়ে কলজে বড়। বিসিবির নতুন নেতৃত্বের দিকে হাত বাড়ানোর মৌসুমে তরুণ টি-টোয়েন্টি দলের নেতা হিসেবে তাঁকে ভুল পছন্দ মনে হয়নি। আর নুরুলকে তো শুধু জিম্বাবুয়ে সিরিজের জন্যই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্বকাপমুখী এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টি থেকে টি-টোয়েন্টি দল পাবে নতুন নেতৃত্ব। সেটা সাকিব আল হাসান বলেই জোর গুঞ্জন চলতি বাজারে। নুরুল হয়ে যাবেন সাকিবের ডেপুটি।

তবে ঘটমান বর্তমানের অঙ্কই যেখানে মিলছে না, সেখানে ভবিষ্যতের গুঞ্জন নিয়ে আলোচনা আপাতত তোলা থাক। তার চেয়ে অঙ্কের প্রথম ভাগের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। মাহমুদউল্লাহ কেন অধিনায়কত্ব হারালেন?

এর সহজ উত্তর হতে পারে ওয়েস্ট ইন্ডিজে টি-টোয়েন্টি দলের ব্যর্থতা এবং তাঁর নিজের বাজে পারফরম্যান্স। ৩-০ তে হারা সিরিজটাতে ভালো খেলেছে কে, সেটা অবশ্য একটা প্রশ্ন। তবে এটাও ঠিক যে এই সিরিজে অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহর কিছু সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

শেষ টি-টোয়েন্টিতে দলের সেরা বোলার সাকিবের ২ ওভার বাঁচিয়ে রেখে ‘অকেশনাল’ মোসাদ্দেককে দিয়ে চার ওভারের কোটা পূরণ যার একটি। দলে, বিসিবিতে এ নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। যার মাশুল দিয়েই হয়তো অধিনায়কত্ব হারিয়ে দল থেকেই বাদ মাহমুদউল্লাহ।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে এ রকম অদল-বদল হতেই পারে। যুক্তিতর্ক দিয়ে অঙ্কের একটা ভাগ হয়তো মিলল। কিন্তু সেটিই যে টেনে আনছে পরের অঙ্কটা—তাহলে মাঝে কিছু না করেই মাহমুদউল্লাহ আবার দলে কেন? কোথায় হলো তাঁর ‘বিশ্রাম’!

default-image

প্রশ্নটাকে আরও বেশি উসকে দিচ্ছে জিম্বাবুয়েতে দল সূত্রে পাওয়া একটা তথ্য। কোচ রাসেল ডমিঙ্গো নাকি শেষ টি-টোয়েন্টিতে মাহমুদউল্লাহকে খেলাতে চাচ্ছেন না। টি-টোয়েন্টি সিরিজটি তিনি খেলতে গিয়েছেন তারুণ্যের ঝান্ডা উড়িয়ে। আজ সিরিজের শেষ ম্যাচেও সেই ঝান্ডাই হাতে রাখতে চান।

বিসিবিও এই সিরিজে জয়-পরাজয়ের চিন্তা ভুলে পণ করেছিল তারুণ্যের শক্তি পরীক্ষার। নুরুল-মোসাদ্দেক-লিটনরা যখন সেই পরীক্ষায় ভালো ফল লাভের সম্ভাবনা তৈরি করে ফেলেছেন, তখন ফিনিশিং টাচটাও তাঁরাই দিন না! হঠাৎ সেখানে কেন মাহমুদউল্লাহর সংযুক্তি, সেটি বোঝা আসলেই কঠিন।

মাহমুদউল্লাহকে খেলানোর ব্যাপারে কোচের অবস্থান বলে দিচ্ছে দলের চাহিদাও সে রকম ছিল না। তবে কি শেষ বেলায় নিজেদের চিন্তা থেকে সরে এল বিসিবি? মাহমুদউল্লাহর মধ্যে খুঁজে পেল টি-টোয়েন্টির সম্ভাবনা!

সেটিই যদি হবে, মাহমুদউল্লাহ অধিনায়ক নন কেন? অন্যভাবে বললে—শেষ ম্যাচের নেতৃত্ব কেন দেওয়া হলো মোসাদ্দেককে?

এমন তো নয় যে সিরিজের মাঝপথে নুরুলকে সরিয়ে মাহমুদউল্লাহকে নেতৃত্ব দেওয়া হতো। নুরুল চোটে পড়ে সিরিজের বাইরে চলে গেছেন। পারফরম্যান্সের দোহাই ভুলে তাঁর জায়গায় সাবেক অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহকেই যদি দলে নেওয়া হবে, শেষ ম্যাচে অধিনায়কও তিনিই হতে পারতেন।

default-image

অথবা লিটন দাস। টেস্টের সহ-অধিনায়ক হয়ে লিটন এরই মধ্যে নেতৃত্বের বলয়ে ঢুকে গেছেন। আর আপৎকালীন পরিস্থিতিতে টি-টোয়েন্টি দলকেও নেতৃত্ব দিয়েছেন এর আগে। নুরুলের জায়গায় তিনিই হতে পারতেন সেরা পছন্দ।

কিংবা মেহেদী হাসান মিরাজই নন কেন? বিসিবির নতুন অধিনায়ক খোঁজার রাডারে অনেক আগেই ‘ইউরেকা’ সংকেত বাজিয়েছিলেন তিনি। হতে পারে মিরাজ পরবর্তী সময়ে সম্ভাবনাটা ধরে রাখতে পারেননি, তবে সাম্প্রতিক ধারাবাহিক পারফরম্যান্স যে তাঁর আত্মবিশ্বাসে জ্বালানি হতো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মোসাদ্দেককে অধিনায়কত্ব দিতে গিয়ে বিসিবি সেটাকেই বিবেচনায় নিয়েছে কি না, কে জানে। আগের ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়ে দলকে সিরিজে ফেরানো পারফরম্যান্সে হয়তো এমন কোনো বিদ্যুৎস্ফুলিঙ্গ আবিষ্কৃত হয়ে গেছে, যেটা তাঁর নেতৃত্বগুণকে আলোকিত করে তুলেছে। ঘরোয়া ক্রিকেটের সাফল্য এবার আন্তর্জাতিক সিরিজ জয়ে অনুদিত হওয়ার অপেক্ষা।

অথবা জাতীয় দলেও কেউ আবাহনীর অধিনায়ক মোসাদ্দেককে আবিষ্কার করতে চাচ্ছেন। কেন জানি মনে হচ্ছে, গোঁজামিল দিয়ে হলেও শেষ অঙ্কটা মেলানোর সূত্র এটাই। কলম কামড়ে, মাথা চুলকেও যখন অঙ্ক মিলবে না তখন গোঁজামিলই তো ভরসা!

default-image

সমস্যা হলো এটা মনে করিয়ে দিচ্ছে আরও একটা অঙ্কের কথা। তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক। থাক, এক দিনে বেশি অঙ্ক করে কাজ নেই। তার চেয়ে অধিনায়ক মোসাদ্দেকের সাফল্য কামনা করা যাক।

অধিনায়ক মোসাদ্দেক যদি সিরিজ জয়ের অঙ্ক মেলাতে পারেন, বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রবণতা মেনে তো তখন বাকি অঙ্কগুলো বই থেকেই মুছে যাবে।

ক্রিকেট থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন