এত দ্রুত এমন উত্থানের গল্প ক্রিকেটে খুব কমই শোনা যায়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে জায়গা করে নিতে হলে প্রায় প্রত্যেককেই কিছু সিঁড়ি ভেঙে আসতে হয়। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, না হয় ক্লাব ক্রিকেটের অধ্যায় পার করে তবেই না প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট। নাহিদের যাত্রাটা ছিল অন্য রকম। তাঁর ক্রিকেট শিক্ষার সময়টা কেটেছে টেনিস বল, রাবার বল ও ফাইভ স্টার বলে খেলে। বড় ভাইয়ের কঠিন শর্ত ছিল, যার কারণে ক্রিকেট বলে খেলা হতো না নাহিদের।

শর্তটা কী? মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস না করলে ক্রিকেট বল ছোঁয়া যাবে না। তার আগে পাড়ায় ক্রিকেট খেলেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে নাহিদকে। ২০২০ সালে নাহিদ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উতরে যান। বড় ভাইও কথা রাখেন। নাহিদকে সে বছরই রাজশাহীর এক একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। নাহিদের জন্য ওইটুকুই যথেষ্ট ছিল। পায়ের কাছে সিঁড়ি পেয়ে তরতর করে উঠে গেছেন তিনি।

গল্পটা নাহিদের মুখেই শুনুন, ‘টেনিস, রাবার বলে খুব খেলতাম। সব সময় ইচ্ছা ছিল খেলাধুলা করার। কিন্তু ভাইয়া বলেছিলেন, এসএসসি পাস করলে তবেই খেলতে দেবেন। এর আগে নয়। এরপর এসএসসি পাস করার পর ২০২০ সালে রাজশাহীর এক একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে রাজশাহী বিভাগের ব্যাটসম্যানদের নেট বোলিং করতাম। বলের গতি দেখে আমাকে একটা প্র্যাকটিস ম্যাচে খেলায়। সেখান থেকেই গত বছর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়। এরপর অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের স্ট্যান্ড বাই তালিকায় ছিলাম।’

শুধু গতি নয়, নাহিদ উচ্চতার কারণে যে সহজাত বাউন্স পান, সেটা ব্যাটসম্যানদের জন্য অস্বস্তির, অ্যাকশনও এলোমেলো। বয়সভিত্তিক পর্যায়ের ছকে বাঁধা কোচিং সংস্কৃতিতে বড় হলে এই বোলিং অ্যাকশন নিয়ে টিকে থাকা সহজ হতো না নাহিদের। অ্যাকশনের কারণে লাইন-লেংথেও অধারবাহিক এই তরুণ। তবে উচ্চতা, বাউন্স ও গতির কারণে একবার লেংথ খুঁজে পেলে তাঁকে ভয়ংকর মনে হয়। এবারের জাতীয় লিগে ৩ বার ৫ উইকেট নেওয়া নাহিদকে কিছু কিছু স্পেলে তেমনই মনে হয়েছে।

নাহিদের বোলিং–মস্তিষ্কটা একদম সহজ–সরল। নিজের উচ্চতাটা ব্যবহার করে ভালো লেংথে যত জোরে বল করা যায়, সেটাই তাঁর কাছে পেস বোলিং। নিজেই বলছিলেন, ‘আমার যে অ্যাকশন, সেটা কাউকে দেখে হয়নি। কাউকে তেমন অনুকরণ করি না। নিজের খেলাটা নিয়েই থাকি। আর লেংথ ও উচ্চতাটা নিজের শক্তির জায়গা। আর জাতীয় লিগে আমি যে এবার সব কটি ম্যাচ খেলব, সে চিন্তাও করিনি। ভেবেছিলাম ফিট থাকার চেষ্টা করব, যে কয় ম্যাচ সুযোগ পাব নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। জোরে বল করে যাব।’

নাহিদের ভাবনার সরলতাই হয়তো তাঁকে এবারের জাতীয় লিগে সাফল্য এনে দিয়েছে। দুরন্ত, প্রাণবন্ত ও নির্ভীকও তিনি। এটা হয়তো নাহিদের পারিবারিক শিক্ষারই অংশ। নাহিদের বাবা নিজেদের জমিতে ধান চাষ করেন। ভাইয়ের নিজের দোকান আছে। আরেক ভাই মারা গেছেন। সবচেয়ে ছোট ছেলে নাহিদ পড়াশোনা করে স্বাভাবিকতার পথে হাঁটতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন ক্রিকেটীয় রোমাঞ্চ, ‘পড়াশোনা করে চাকরির পথে যাওয়ার কথা সবাই বলে। আমি এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়েছি, এইচএসসিতে মানবিকে। সহজে পাস করেছি। এখন চেষ্টা করব ঢাকায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে। কিন্তু ক্রিকেটে আমি যে অনুভূতি পাই, সেটা কোথাও পাই না।’

সে অনুভূতিই হয়তো দুরন্ত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে নাহিদকে। মাত্র দুই বছরে এত দূর চলে আসা তো চাট্টিখানি কথা নয়। নাহিদের কাছেও এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। আজ এ নিয়ে নাহিদকে প্রশ্ন করলে উত্তরে ফোনের ওপাশ থেকে শুধু হাসির শব্দই শোনা গেল। ঠিক তাঁর বোলিংয়ের সরলতার মতো।