অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট এখন ‘আন–অস্ট্রেলিয়ান’, ‘ভয়ানক ও অপরিণত’
‘আন–অস্ট্রেলিয়ান।’
কেপটাউন টেস্টের শেষ দিনে ধারাভাষ্যকক্ষে বসে শব্দটা উচ্চারণ করলেন ডেভিড ওয়ার্নার। ছোট শব্দ। কিন্তু এর ওজন অনেক। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে।
দেড় শ বছরের বেশি আগে শিল্প–সাহিত্যের পরিসরে শব্দটির ব্যবহার শুরু। গত শতাব্দীতে সেটি হয়ে ওঠে রাজনীতিরও অস্ত্র। সোজা বাংলায়, যা অস্ট্রেলিয়ার পরিচিতি, মূল্যবোধ কিংবা সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না, তা-ই ‘আন–অস্ট্রেলিয়ান’।
ওয়ার্নারের মুখে শব্দটির ব্যবহার তাই বাড়তি তাৎপর্য বহন করে। কারণ, সমালোচনাটি তিনি করেছেন নিজের সাবেক ড্রেসিংরুমের দিকে তাকিয়েই। জায়গাটা সেই নিউল্যান্ডস, যেখানে ২০১৮ সালে বল টেম্পারিং কাণ্ডে নিজেই পেয়েছিলেন এক বছরের নিষেধাজ্ঞা।
আট বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম টেস্ট খেলতে গেছে অস্ট্রেলিয়া। ডারবানে প্রথম টেস্ট জিতে টেস্ট র্যাঙ্কিং ও টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষ স্থান আরও পোক্ত করেছিল প্যাট কামিন্সের দল। অথচ গেবেখায় ইনিংস ব্যবধানে এবং কেপটাউনে ১৭৬ রানে হেরে সেই দলই এখন সিংহাসনচ্যুত।
অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসে তিন ম্যাচের সিরিজে প্রথম টেস্ট জিতেও সিরিজ হারার ঘটনা মাত্র চতুর্থবার। এর আগে দুবার উনিশ শতকে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। সর্বশেষ ২০০১ সালে ভারতের মাটিতে। টানা দুই টেস্টে হারও তাদের জন্য বিরল ঘটনা। ২০২৩ সালের বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফির প্রথম দুই টেস্টের পর এই প্রথম। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৩০০ দিনের বেশি সময় পর সিরিজ হারল অস্ট্রেলিয়া।
ট্রলের জবাব মাঠে
ডারবানে অস্ট্রেলিয়ার ২১৪ রানের জয় ছিল টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে টেম্বা বাভুমার প্রথম হার। এর আগে তাঁর নেতৃত্বে ১২ টেস্ট খেলে দক্ষিণ আফ্রিকা জিতেছিল ১১টিতে, ড্র করেছিল একটি।
সেই হারের পর ট্রাভিস হেড ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে এআই-নির্মিত একটি ভিডিও শেয়ার করেন। সেখানে বাভুমাকে নিয়ে ট্রল করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ভালো লাগার কথা নয় সেটি।
পরে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাভুমা বলেছিলেন, ড্রেসিংরুমে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি সেটি গায়ে মাখছেন না।
মাঠে অবশ্য জবাব দিতে দেরি করেনি দক্ষিণ আফ্রিকা। গেবেখায় বাভুমার ১৭৯ রানের অনবদ্য ইনিংসে ঘুরে দাঁড়ায় দল। সিরিজ জয়ের পর দক্ষিণ আফ্রিকা অধিনায়ক এমনও বলেছেন, তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সিরিজ ছিল এটি।
‘কোনো লড়াই নেই’
কেপটাউন টেস্টের শেষ দিনে ওয়ার্নারের মন্তব্যে ক্ষোভের চেয়ে হতাশাই ছিল বেশি। বলেছেন, ‘আমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। এটা ভয়ানক। এটা আন–অস্ট্রেলিয়ান।’ কেন এমন মনে হয়েছে, সেটিও ব্যাখ্যা করেছেন, ‘কোনো লড়াই নেই। এটা লজ্জাজনক।’
২৮৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পঞ্চম দিন লাঞ্চের মধ্যেই ৬০ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ফেলে অস্ট্রেলিয়া। সেই বিপর্যয়ের মধ্যে জস ইংলিস রানআউট হওয়ার পর ওয়ার্নারের খোঁচা, ‘বিকেলে কি কোনো ওয়াইন ট্যুর আছে?’
ধারাভাষ্যকক্ষে থাকা অন্যরাও চুপ করে থাকেননি। মার্ক ওয়াহর ভাষায়, ওই দুই ঘণ্টার ব্যাটিং ছিল ‘ভয়ানক ও অপরিণত’। সাইমন কাটিচের মন্তব্য, ‘টেস্ট ক্রিকেটে পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নেই।’
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ওয়ার্নারের সমালোচনা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল কামিন্সকে। অস্ট্রেলিয়া অধিনায়কের উত্তর, ‘কী বলব, জানি না। কে জানে!’ তবে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি, ‘আমরা যথেষ্ট ভালো ছিলাম না।’
লড়াইয়ের অভাব, নাকি দিশার?
ওয়ার্নারের ‘কোনো লড়াই নেই’ অভিযোগ পুরোপুরি মিথ্যা নয়। তবে পুরো সত্যও নয়। প্রথম সেশনে সাত উইকেট হারানোর পর অস্ট্রেলিয়া ঠিক করেছিল, আর উইকেট দেওয়া যাবে না। ক্যামেরন গ্রিন সামলাবেন পেস, কামিন্স খেলবেন স্পিন। ১৬তম থেকে ৩৯তম ওভার পর্যন্ত ২৩ ওভার ধরে গ্রিনকে সাইমন হারমারের মুখোমুখি হওয়া থেকে আড়াল করা হলো। বাভুমা শুধু হারমারের প্রান্ত বদলালেন। নতুন প্রান্ত থেকে সেই স্পেলের প্রথম বলেই গ্রিন বোল্ড। কিছুক্ষণ পর শূন্য রানে আউট মিচেল স্টার্কও।
ওয়ার্নারের চোখে এটি ‘পরাজিত মানসিকতা’। জেতার চেষ্টা নয়, বরং ড্র করার চেষ্টা। গেরার্ড হোয়াটলির ভাষায়, নিজের ধারাভাষ্য জীবনে দেখা সবচেয়ে ‘লজ্জাজনক’ আউট।
অথচ কামিন্স ও নাথান লায়ন ৪৫ রানের জুটি গড়ে দলকে বিকেল পর্যন্ত টেনেছেন। লায়ন ৩৩ রানে অপরাজিত থেকে হয়েছেন দলের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক। সংখ্যাটারও একটা ইতিহাস আছে। ২০১১ সালে ৪৭ রানে অলআউট হওয়া নিউল্যান্ডস টেস্টেও অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ রান ছিল লায়নের।
সমস্যার শিকড় তাই আরও গভীরে
মার্ক ওয়াহর মতে, দল হিসেবে দুই বছর ধরেই ভালো ব্যাটিং করছে না অস্ট্রেলিয়া। ব্যক্তিগত প্রতিভায় বারবার পার পেয়ে গেছে। ট্রাভিস হেড, স্টিভ স্মিথ ও অ্যালেক্স ক্যারির ব্যাটিং দলীয় দুর্বলতা আড়াল করেছে। সঙ্গে কার্যকর পেস আক্রমণ এবং নিজেদের অনুকূল কন্ডিশন তো ছিলই।
ফক্স স্পোর্টসের হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের শেষ থেকে আটবার ১০০ রানের নিচে ৬ উইকেট হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজেই দুবার।
এই ব্যর্থতার বড় প্রতীক মারনাস লাবুশেন। ২০২৩ সালের জুলাইয়ের পর আর কোনো সেঞ্চুরি নেই। গড় ২৫-এর নিচে। ক্যারিয়ারের প্রথম ৩০ টেস্টে ১০ সেঞ্চুরি করা লাবুশেন পরের ৩৯ টেস্টে করেছেন মাত্র একটি। সেঞ্চুরি ছাড়া ইনিংসের সংখ্যায় ১৪৯ বছরের ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ চার ব্যাটসম্যানের মধ্যে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন তিনি।
দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে লাবুশেনের রান ১৩১, গড় ২১.৮৩। দুই টেস্ট খেলা স্টিভ স্মিথের সিরিজ গড় ২০.৭৫। অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সাত ব্যাটসম্যানের পাঁচজনের গড় ২২-এর নিচে।
এই ব্যর্থতার দায় নির্বাচকদেরও দিয়েছেন কাটিচ। তাঁর মতে, লাবুশেনকে ‘বারবার বাছতে’ গিয়ে তাঁর ক্যারিয়ারই ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে।
সাফল্যের আড়ালে সংকট
অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক অতীত অবশ্য এতটা বিবর্ণ ছিল না। ২০২৩ সালের অ্যাশেজের পর থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ২১ টেস্টের ১৭টিতেই জিতেছিল তারা। ২০২৫-২৬ অ্যাশেজও জিতেছে ৪-১ ব্যবধানে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩-০ ব্যবধানে হারানোর পর মে মাসের আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বরে ছিল অস্ট্রেলিয়া। রেটিং পয়েন্ট ১৩১।
কিন্তু সাফল্যের সেই ছবিতে চিড় ধরেছে। আগস্টে ডারউইনে বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটে হেরেছে অস্ট্রেলিয়া। সেই ম্যাচে দুই ইনিংসে তাদের রান ছিল ১৯৮ ও ২৮৪। ম্যাকাইয়ে পরের টেস্ট জিতে সিরিজ ড্র করলেও দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে আর রক্ষা হয়নি।
দক্ষিণ আফ্রিকায় সর্বশেষ সিরিজ জিতেছিল ২০১৪ সালে। সেই সিরিজে ম্যাচ ও সিরিজসেরা ছিলেন ওয়ার্নার। সেই ওয়ার্নার এখন ধারাভাষ্যকক্ষে। উসমান খাজা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিডনিতে শেষ টেস্ট খেলেছেন। স্মিথের বয়স ৩৮, লাবুশেনের জায়গাও অনিশ্চিত।
নিক ম্যাডিনসন ১৯ মাস পর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ফিরে ১৪ গড়ে করেছেন ৫৬ রান। বেউ ওয়েবস্টারের জায়গা নিয়েছেন কনোলি। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং কাঠামোতেই এখন অস্থিরতা।
সামনে কঠিন পরীক্ষা
পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন কামিন্সও। তাঁর কথায়, ‘এটা হয়তো ধরনে পরিবর্তন, হয়তো খেলোয়াড় বদল।’
৯ ডিসেম্বর পার্থে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চার টেস্টের সিরিজ শুরু করবে অস্ট্রেলিয়া। ডব্লিউটিসির শীর্ষে এখন নিউজিল্যান্ড। এরপর ২১ জানুয়ারি ভারতে পাঁচ টেস্টের সিরিজ। যেখানে কামিন্স, স্মিথ, স্টার্ক, হ্যাজলউড ও লায়নের কেউই কখনো সিরিজ জেতেননি।
এরপর মার্চে এমসিজিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৫০তম বার্ষিকী টেস্ট। সব মিলিয়ে ১৪ সপ্তাহে ১০ টেস্ট। সামনে ২০২৭ সালের জুনে ডব্লিউটিসি ফাইনালের সম্ভাবনা। সেই গ্রীষ্মেই ইংল্যান্ডে পাঁচ টেস্টের অ্যাশেজ।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে তাই প্রশ্নের অভাব নেই। তিন নম্বরে কে ব্যাট করবেন? ওয়ার্নার ও ও’কিফ চান, স্মিথ ওপরে উঠে তিন নম্বরে ব্যাট করুন। এই পজিশনে তাঁর গড় ৬৫.২২। ওপেনিংয়ে রেনশ থাকবেন কি না? পুরো ব্যাটিং লাইনআপে কি ফিরবে নির্দিষ্ট ভূমিকা বুঝে খেলার স্থিরতা?
একসময় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের পরিচয় ছিল লড়াই, সাহস আর হার না মানা মানসিকতা। প্রতিপক্ষের মাঠে দাঁড়িয়েও যারা চোখে চোখ রেখে কথা বলত। সেই অস্ট্রেলিয়াকে এখন খুঁজে ফিরছেন তাদেরই সাবেক ক্রিকেটাররা।
‘আন–অস্ট্রেলিয়ান’ শব্দটি নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু ক্রিকেটে পরিচয়ের পরীক্ষা হয় কথায় নয়, রান আর পারফরম্যান্সে।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে প্রথম পরীক্ষা ৯ ডিসেম্বর, পার্থে। সেখানে শুধু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই নয়, নিজেদের হারানো পরিচয়ের বিরুদ্ধেও লড়তে হবে কামিন্সদের।