কেমন কোচ পাইবাস?

চন্ডিকা হাথুরুসিংহের উত্তরসূরি হচ্ছেন কে? এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। একেক উৎস থেকে একেক নাম উঠে আসছে; যাঁদের প্রায় সবাই ডাকসাইটে সব কোচ। তবে একটি নাম যেকোনো ক্রিকেটপ্রেমীকে অবাক করে দিতেই পারে—রিচার্ড পাইবাস!
ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই দক্ষিণ আফ্রিকান বাংলাদেশের কোচ হিসেবে সাক্ষাৎকার দিতে ঢাকায় এসেছেন, এই খবরটাই সবার জন্য বিস্ময়কর। ২০১২ সালে পাইবাসকে যে কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েও ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি); মাত্র সাড়ে চার মাস পরেই তিক্ত স্মৃতি নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন পাইবাস। চলে যাওয়ার আগে বিসিবির বিপক্ষে ছিল তাঁর এন্তার অভিযোগ।
পাঁচ বছর আগে বাংলাদেশ দলের কোচ হিসেবে পাইবাসের দায়িত্ব চালিয়ে না যাওয়ার নেপথ্যে ছিল চুক্তি নিয়ে বিরোধ। চুক্তি ছাড়াই পাঁচ মাস দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। বিসিবি শর্ত দিয়েছিল, জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁকে বছরে ৩২০ দিন থাকতে হবে। এই শর্তই মেনে নিতে পারেননি পাইবাস। এ ছাড়া খুঁটিনাটি নানা বিষয় নিয়ে বোর্ডের ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির সঙ্গে তাঁর খিটিমিটি লেগেই ছিল। কম্পিউটার বিশ্লেষণ-পদ্ধতির পরিবর্তন থেকে খেলোয়াড়দের জন্য অস্ট্রেলিয়া থেকে মাংস আমদানির দাবি করেছিলেন পাইবাস। অপারেশনস কমিটি তাঁর এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল।
বিসিবির সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলাপ-আলোচনা এবং পাইবাসের নানা আপত্তির বিষয়গুলো পরে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর পাইবাস নিজেই গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার বলে দেন, বাংলাদেশের কোচ হিসেবে আর কাজ করবেন না। সেই সাক্ষাৎকারে পাইবাস বলেছিলেন, ‘ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির আচরণ দেখলে মনে হয়, ক্রিকেটটা তারা একজন কোচের চেয়েও ভালো বোঝে।’ শ্রীলঙ্কায় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বোর্ড কর্তারা তাঁর কাজে ‘হস্তক্ষেপ’ করেছিলেন বলে অভিযোগ ছিল তাঁর।
বাংলাদেশের সঙ্গে তিক্ততার ইতিহাস বাদ দিলে পাইবাস কিন্তু ক্রিকেট দুনিয়ায় একজন হাইপ্রোফাইল কোচ হিসেবেই পরিচিত। চোটের কারণে ক্রিকেট ক্যারিয়ার সংক্ষিপ্ত হয়ে পড়ায় তিনি নেমে পড়েছিলেন কোচিংয়ে। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্ট লন্ডনে সেলবোর্ন কলেজের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পাইবাস। তাঁর অধীনেই দুর্দান্ত একজন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন সাবেক প্রোটিয়া তারকা মার্ক বাউচার।
১৯৯৫ সালে বোর্ডার ক্রিকেট একাডেমির কোচ হিসেবে কাজ শুরু করেন পাইবাস। এই বোর্ডার একাডেমিরই ছাত্র ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ফাস্ট বোলার মাখায় এনটিনি। বিভিন্ন সময় দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির দলগুলোয় কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন নিয়মিতই। মিডলসেক্স কাউন্টি দলেও কাজ করেছেন পাইবাস। হালের অনেক প্রোটিয়া তারকা ক্রিকেটারেরই ‘গুরু’ এই পাইবাস। ডেল স্টেইন, মরনে মরকেলরা তাঁর হাত ধরেই দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে উঠে এসেছেন।
পাইবাস ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তান দলের পরামর্শক হিসেবে ছিলেন। পরে তাঁকে নিয়মিত কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হলে পাইবাস বরখাস্ত হন। সেই পাকিস্তানের কোচ হিসেবেই তিনি ফিরে আসেন ২০০১ সালে। কিন্তু ভাগ্য এবারও সুপ্রসন্ন হয়নি। ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে সন্ত্রাসী হামলার পর নিরাপত্তার কারণে পাকিস্তান থেকে সব বিদেশি নাগরিককে চলে যাওয়ার নির্দেশ জারি হলে পাইবাসকেও চাকরি ছাড়তে হয়। কিন্তু পাইবাসের পাকিস্তান অধ্যায়ের তখনো বাকি!
২০০২ সালে এই পাইবাসকেই আবার কোচের পদে ফেরায় পাকিস্তান। সেবারও তিনি বেশি দিন থাকতে পারেননি। আইপিএলে কোচ হওয়ারও সুযোগ এসেছিল তাঁর সামনে। কিন্তু ২০০৯ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্সের কোচ হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি সেই চাকরি পাননি।
হাথুরুসিংহের প্রস্থানের পর এই মুহূর্তে একজন অভিভাবক চরিত্রের কোচ খুঁজছে বাংলাদেশ, যিনি একই সঙ্গে পারফরম্যান্স আর খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলার বিষয়টি দেখবেন। সে ক্ষেত্রে পাইবাস কতটা কার্যকর হতে পারেন, সেটা সময়ই বলে দেবে। আপাতত বিসিবির সঙ্গে সাক্ষাৎকারের কক্ষে তাঁর পুনর্মিলনীটা তো হোক!