ক্রিকেট ভানতে ফরম্যাটের গীত

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

আপনি যদি জনপ্রিয় সিনেমার ভক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই জানবেন, গরিবের ছেলে আপন পরিশ্রমের গুণে সমাজের উঁচুতলায় উঠে গেলে আপনি আনন্দিত বোধ করেন। স্বাভাবিক হিসাবে যার যেখানে থাকার কথা নয়, সে ওখানে উঠে গেলে আপনি আবেগাপ্লুত হন। এই যে স্ট্যাটাস ভেঙে ফেলা, এটাই আকর্ষণ বাড়ায় যেকোনো ন্যারেটিভের। খেলাও তো একটা ন্যারেটিভই, একটা গল্পই। বিশ্বকাপ খেলা তো আরও বড় গল্প, মাস এন্টারটেনার, থ্রিলার। এটার আর্টহাউস ছবি হওয়ার সুযোগ কম।

মনে আছে বিশ্বকাপ ফুটবলে আইসল্যান্ডের প্রায় পৌরাণিক উত্থানের কথা? মনে আছে কেমন থ্রিল বোধ করেছিলেন আপনি? তাদের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সঙ্গে আপনার চোখও কি ভিজে আসেনি? আপনার মনে হয়নি, ওরা নয়, জিতেছেন আপনি? ঘুমাতে যাওয়ার আগে আপনার কি মনে হয়নি জীবন এত পরিপূর্ণ কেন? যদিও জীবন আপনার মোটেও পরিপূর্ণ ছিল না! পরদিন সকালেই পাওনাদারের তাগাদা, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ এবং আরও বিচিত্র সব চাহিদা আপনাকে পরাজিত করার জন্য আপনার চৌকাঠের বাইরেই অপেক্ষা করছিল।

এই আনন্দ আপনি কেন পান? শুধু কি সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলের জয় বলে? মনে হয় না। সবচেয়ে বড় কারণ বোধ হয় ‘অনিশ্চয়তা’! এই অনিশ্চয়তাই যেকোনো বিশ্বকাপের আসরকে বর্ণাঢ্য করে তোলে, আপনার সব মনোযোগ কেড়ে নেয়।

এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৯ মাত্র কয়টা খেলা হলো। কিন্তু এরই মধ্যে যে জিনিসটা নিয়ে আমার খটকা লাগছে, সেটা হলো এর ফরম্যাট। বড় দেশগুলোকে, নেটফ্লিক্সের হাসান মিনহাজ শো অথবা আরও কিছু নিউজ আউটলেটের মতে অবশ্য মূলত ভারত-ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়াকে, অনিশ্চয়তার ছোবল থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আইসিসি সহযোগী দেশগুলোকে বাদ দিয়ে যে ম্যারাথন রাউন্ড রবিন লিগের আয়োজন করা হয়েছে, সেটা কতটা ভালো হলো, ভেবে দেখার সুযোগ আছে। নকআউট ম্যাচ ছোট দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা মাইন্ডসেট দুইটাই বদলে দেয়। তার মাথায় তখন থাকে শুধু একটা ম্যাচেরই চাপ। সে তার সমস্ত শক্তি ঢেলে পার হতে চায় এক ম্যাচের তরণি। কিন্তু সেই একই দল যখন ৯ ম্যাচের রাউন্ড রবিন লিগ মাথায় নিয়ে একটা ম্যাচ খেলতে নামে, তখন তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, মাইন্ডসেট, অ্যাপ্রোচ সব বদলে যায়। তখন আর তার মন শরীরকে বলে না, এই একটাই ম্যাচ, শেষ শক্তিটুকু ঢেলে দাও, তাহলেই পার হয়ে যাবে এই ভবতরি। নকআউট স্টেজই তাই বিশ্বকাপে প্রাণ আনে।

এমনিতেই ওয়ানডে ক্রিকেট না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থায় আছে। স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শক ছাড়া আর কত শতাংশ দর্শক অন্য দেশের খেলা পুরোটা দেখেন, এটা গবেষণা করে দেখা যেতে পারে। তার ওপর যুক্ত হয়েছে ফরম্যাটের ফোড়া। এটার মাধ্যমে বড় দলগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা হয়তো আইসিসি বাড়াল, কিন্তু তাতে খেলাটার কতটা উপকার হলো, এটা সময়ই বলে দেবে। বিশ্বকাপ ফুটবল গৌরবময় হয়ে উঠেছিল আইসল্যান্ডের রূপকথার মতো উত্থানে। আপনি নিয়মের প্যাঁচ তৈরি করে হয়তো আইসল্যান্ডকে হটাতে পারতেন, বাঁচাতে পারতেন আর্জেন্টিনাকে, বাড়াতে পারতেন ব্যবসায়িক আকর্ষণ, কিন্তু তাতে খেলাটা হারাত থ্রিল, হারাত রূপকথার মেজাজ।